Literary Editor

Three POEMS By Gorka Lasa

GORKA LASA (Panamá 1972)

Poet, writer and visual artist with over five published books – poetry, essays and short stories – among them, Aldebarán, The Edge of Eternity (Poetry 2016), The Equilibrium of the Hemispheres (Poetry 2013), The Clarity, Tales, Dreams and Memories of the Awakening (Narrative 2011) among others. His literary work has been included in many anthologies and collective poetry books of Latin America and Europe, published in specialized international magazines, internet pages, and translated to English, French, Portuguese, Rumanian and Russian. Mr. Lasa studied humanistic and behavioral sciences, with ongoing studies of literature, symbolism, mythology and philosophy. Also has been selected as jury in literary and poetry contests and received various awards and honorific mentions for his work. As a result of his distinctive and critically acclaimed poetry, he has been invited to present his work in many international literary forums, congresses and festivals. To learn more about Gorka Lasa and his work, please visit his personal page: www.gorkalasa.com.

 

 

 

Salt

 

I’ve returned to the horizon,

the ancient silence,

the forgotten shores

the mortal sphere.

 

I’ve returned in the wind,

like a rebel sun,

burying in the sand

my sin of salt

 

 

Solar tear

 

What Ion has perished in solar tear of my sadness?

what happened to that ocher and scented fluid of God?

that sacred emptiness without form,

after burning in the eternal fire.

 

In intimate secret, the symbol is born,

dance of the attempt,

the wild flight,

the magic night,

seal of the equator.

 

Galactic balance of the hemispheres,

the lonely temple of the harmonics,

ancient sentinel of my eternal pain.

 

We raise our cry in the darkness of the stars,

we define with fire the stationary circles,

the secret keys that defeated time.

 

I think, I have been around this distant cluster, for eons.

after the ritual, the sorrow,

the wisdom broke my soul,

imploding in me, supernova.

 

Lucid vastness in which he drank,

far and pilgrim,

my indomitable spirit.

 

Only for love I’ve taken this route,

only out of compassion,

burns in me,

the sunset.

 

 

Cosmically exhausted

 

Exhausted of wandering the route of the cyclic night,

horizon which expands in endless swirls,

eternity which waits holding the supposed myself.

 

Impossible duality,

empty generator of fire storms,

solar wind which wears off the barriers of my soul.

 

Exhausted of the vision which slowly fades away,

dense fog of death over the shape and its sphere.

 

Tears of blood germinate eternal poems in my hands,

destined to get lost in the human abyss of indifference.

 

Deeply exhausted,

my thoughts draw the shape of the essence,

I walk lifelessly to the non-existent memory,

again, wandering on the axis of the nothing.

 

Recurrent, sullen, moody.

I won't come back in the old dormant way,

Cosmically exhausted.

- সুপম রায়

 

 

চাঁদের মুখোমুখি আগুনের উত্তাপ ।
ততক্ষণে তেলে ভাজা হয়ে গেছে 
কতকগুলো স্বপ্নে জাগা মানুষের কাঁচা শরীর ।

 

এখনও হোয়াটঅ্যাপ আর ফেসবুক নিয়ে তুমি ! 
তোমার বাড়ির মানুষগুলো জেগে আছে 
টিভি সিরিয়াল আর সিনেমায় মগ্ন আসনের কোল ঘেঁষে!

 

দূর থেকে উড়ে আসা বাতাসের ডানায় 
আর সেই স্বতঃস্ফূর্ত উল্লাস নেই ।

 

ফাইয়ার ব্রিগেড আসে, হেলিকপ্টার আসে,
মিডিয়া আসে ।
মানুষেরা বাঁচতে চায়, ঘরে ফিরে যেতে চায়,
মিডিয়ারা খবর বেচতে চায় ।

 

মরতে চায় না কেউ ।

 

তবু যেন দূরে ইলেকট্রিক চুল্লি আর শ্মশান বেঁধে
আমরা কয়েকজন কর্মী অপেক্ষা করে থাকি ।
ছিঃ!

 

ঈশ্বর, ওরা সবাই আগুনের মতো বেঁচে ফিরুক ঘরে,
ঠাণ্ডা করো না কোনও শরীর ।

 

 

 

হিলাল কারাহান: তুর্কি কবি, লেখক, অনুবাদক, মা চিকিৎসক। জন্ম: ১৯৭৭ সাল গাজ়িয়ান্তেপ, তুরস্ক। তিনি ২০০০ সাল থেকে লিখছেন। তার ছয়টি কবিতা তিনটি গদ্য বই আছে এবং তার অনেক নির্বাচিত কবিতার বই বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। অনেক আন্তর্জাতিক যৌথ বই, দ্বিভাষিক কবিতা বর্ষপঞ্জি প্রকাশনায় তিনি যোগদান করেছেন। বিশ্ব কবিতা উৎসব সংগঠনের আন্তঃ মহাদেশীয় পরিচালক হিসেবে তিনি অনেক আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসবের সংগঠন কমিটিতে অংশ নেন। সম্প্রতি তিনি তুর্কি পেন, তুর্কি লেখক সমিতি তুর্কি ভাষা সমিতির সদস্য হয়েছেন। তিনি রাইটার্স ক্যাপিটাল ফাউন্ডেশন এর সাধারণ সম্পাদক এবং বিশ্ব শান্তি ইনস্টিটিউট এর তুর্কি রাষ্ট্রদূত, গুলো ইউনেস্কোর সাথে যুক্ত। প্রতি বছর তিনি ফেমেনি ইস্তাম্বুল ভূমধ্যসাগরীয় কবিতা উৎসব এর আয়োজন করেন। তিনি অনেক গুলো জাতীয় আন্তর্জাতিক কবিতা পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১৭ সাল থেকে তিনি আন্তর্জাতিক দ্বিভাষিক কবিতা পত্রিকা এ্যাবসেন্ট, রোসেত্তা ওয়ার্ড লিটেরাতুরা সাহিত্য আনন্দ (সাহিত্যা আনান্দ) এর প্রকাশনা পরিষদের একজন সদস্য।

 

বাংলা অনুবাদ: তারিক সামিন

 

মধ্যপ্রাচ্য

 

এখানে ইতিহাস নিজের পায়ের কাছে নতজানু হয় যেহেতু সে তার জন্ম দিয়েছিলো,

এখানে চুল থেকে উকুন মারা হয় মানুষের হাড়ের তৈরী চিরুনি দিয়ে

 

 

/

শহরগুলির আব্রু মরুভূমির বাতাসে অসংহত হয়ে উঠে

পাথরের আঙ্গিনায় উপর, মসজিদ, প্রাচীন খোলা মাঠ,

খিলানযুক্ত রাস্তাগুলো যারা সবসময় একে অপরের পথ দেখায়

মাটিতে কফি, মসলা এবং বারূদের গন্ধ

ঝলসানো হচ্ছে একই কয়লার উপর

 

: বালি রক্ত ঢেকে দেয়, কিন্তু ধুতে পারে না...

 

 

/

ঈশ্বরের নাম গুলো মরুভূমিতে লেখা

হয় বর্বরতা, অজ্ঞতায়

শিশুগুলো জন্মায় এবং মরে যায়

দুর্ভিক্ষ তাদের ভবিতব্য, ডায়রিয়া তাদের পরিণতি

 

: হিংসা একটি অভিলাষও অবশিষ্ট রাখে না

 

/

মরুভূমির রাতে

ঠান্ডা, ধর্মমত পারিবারিক ঐক্য

উষ্ণ করে পরস্পরের সর্মথন

 

:এমনকি যদি তাদের হত্যা করা হয়, বেদুইনের পুরু পোষাকে

রক্ত প্রবেশ করে না

 

/

নারী কেনা-বেচা হয়

উটের বিনিময়ে

জীবনের থেকে তারা লিঙ্গাগ্রচর্মছেদন করে

 

: তাদের মুখমন্ডলে পুরুষদের জন্য উল্কি আঁকা হয়,

হৃদয়গুলো ফসল কাটার যন্ত্র...

 

 

 

 

Middle East

 

1/

It lulls the history on its feet since it gave birth to it,

it combs louse from its hair with human ribs

 

 

 

2/

Skirts of the cities are scattered by desert winds

over stone courtyards, mosques, ancient squares,

vaulted streets which always lead to one another

Smell of ground coffee, spice and gunpowder

roasts on same coals

 

: Sands cover the blood, but cannot wash…

 

 

 

3/

Names of God written to the desert

are savagery, ignorance

Children are born and die

famine is their destiny, diarrhea is their fate

 

: Grudge does not make a wish…

 

 

 

4/

In the desert night

cold, belief and family consensus

warm up backing in one another

 

:Even if they are killed, Bedouin felt

does not penetrate blood ...

 

 

5/

The women are bought and sold

in exchange for camel

They are circumcised from life

 

: Their faces are tattooed to men,

hearts are harvester…

 

 

যোনির যন্ত্রণাদায়ক আকস্মিক সংকোচন চিকিৎসা

 

বাসর রাত্রে,

দরজার পিছনে অপেক্ষারত মানুষেরা যখন

রক্ত মাখা চাদরটি নিতে পারিনি,

পরিবারের কর্তা একটি সিন্ধান্ত নিলেন:

নববধূ এখনো যৌন উপযুক্ত নয়...”

তারা মেয়েটিকে একজন পীরের কাছে নিয়ে গেল

তার পেটের উপর তাবিজ লিখতে,

নববধূকে যৌন উপযুক্ত করতে

তিন দিন তিন রাতের জন্য ...

 

চতুর্থ দিন সকালে,

তারা মেয়েটিকে নিতে এসেছিল

এবং তাবিজের দাম দিতে

সাথে একটি মোরগ

 

অসহায় মেয়েটি পুরো জীবনেও বলতে পারে নি

তাবিজ লেখার পরিবর্তে,

সেই ভন্ড পীর কি করেছিল (তার সাথে)

তিন দিন এবং তিন রাত ধরে...

 

 

Vaginismus Treatment

 

At nuptial night,

When people waiting behind the door

 

could not take the bloody sheet,

the consul of family made a decision:

Bride is locked…”

They took the girl to a sorcerer

to write amulet on her belly,

to unlock the bride

for three days and night…

 

In the fourth morning,

they came to take the girl

and pay the money

of amulet with a cock.

 

The helpless girl could not say whole life

instead of writing amulet,

what that faithless man did

for three days and nights…

 

 

 

Poet: Hilal Karahan (Turkey)

English Translator: Hilal Karahan

Spanish Translator: Malak Sahioni Soufi

Spanish Redactor: Marina Fernández Martín

Three poems of Esteban Moore

Esteban Moore (Buenos Aires, 1952). Poet, translator and essayist. He has published ten volumes of poetry, among them Partes Mínimas -uno/dos- (2006, Alción, Córdoba, Argentina); El avión negro y otros poemas 2007, Buenos Aires, Fondo Metropolitano de las Artes y las Ciencias), Veinte años no son nada (2010, Alción, Córdoba, Argentina) y Poemas 1982-2007 (2015, Alción, Córdoba, Argentina). His essays have been gathered in Versiones y apropiaciones (Alción, Córdoba, 2012).

He has translated the work of Lawrence Ferlinghetti, Jack Kerouac, Allen Ginsberg, Gregory Corso and Raymond Carver. In 2012 for his work he was awarded the Alejo Zuloaga Order, Universidad de Carabobo, Valencia Venezuela.

 

 

Translated from Spanish by JoAnne Engelbert

 

 

 

At an Inn on the Way to Quirama, Medellín

 

 

Men with tan skin

drink in silence --rum brandy or beer

Blaring music 

--electrifies bodies

 

Around the bar a group of women talk

and laugh

and practice dance steps

to the rhythm of their -elegant  -seductive movements

they toss their black hair

which shines beneath the halo of  fluorescent light

reflecting undulating shimmers  -glints

lightning bolts     -voltaic snakes

 

..............above the bar from a giant poster

Marilyn in the apogee of peroxide

.............presides over the party

 

 

 

 

Remembering

 

 

You're standing on the corner waiting for a bus

and ------it's as if you were not there

but back on the dark side of your memory

in last night's nightmare

 

a whirlwind of confused images --

a gravestone --with no inscription and no date

and a black bird with a gold beak

straining

to tell you something

--in a language you don't understand

you close your eyes --the bus goes by --and now

you're sitting on the edge of your bed --watching

the bluish light

which filters through the Venetian blinds

kindle the infinite particles --that float in the air

 

....you open your eyes ---and don't know what to think

 

 

 

 

Paper Trail

 

 

One Saturday morning

going through old stuff in the attic

In an cardboard box I found a package

      wrapped in brown paper

          tied with hemp twine

   ----darkened by time

 

I opened it

and found some of my grandmother's letters -- recipes

yellowed bills  from businesses that no longer exist

medical reports

               newspaper clippings

                             -mainly obituaries

     --  holy cards

[along with many other records

   of her orderly domestic universe]

and several notebooks

from her final years

    in which she kept a record of her expenses

    in countless columns  --- from week to week

        in the market -- the bakery

             --for the newspaper

for her medicines

     --for a pedicure

    -- for new glasses  -- her doctor bills

 

Also recorded were the amounts she gave regularly

      to the Parish of San Patricio

and after them, this entry:

     "I left a bottle of whisky for the parish priest"

            and beside it the price she paid for it

Hard evidence of a personal strategy

     for assuring herself a place in heaven

 

-শুক্তি রায়

 

অজিতদা, আর কিন্তু দেরি করা যাবে না,’ একটু কেজো ভাবেই বলে মন্দিরা‘না না আর এক সপ্তাহের মধ্যেই হয়ে যাবে,’ একটু লজ্জিত মুখে উত্তর দেন অজিত গুহ‘এক সপ্তাহের মধ্যে প্লীজ। নইলে আমাদের বইমেলার পুরো স্কেডিউল ঘেঁটে যাবে আর রাহা স্যার আমার উপর প্রচণ্ড রেগে যাবেন,’ মন্দিরা বলে। ‘আই অ্যাম সরি,’ লজ্জায় কানের পাশে কী যেন ভোঁ ভোঁ করে অজিতের, ‘আমি অবশ্যই এক সপ্তাহের মধ্যে দিয়ে দেব’, কোনো মতে কথাগুলো বলেই উঠে পড়েন তিনি। ‘ওকে স্যার, গুড বাই অ্যান্ড গুড লাক’, মন্দিরা জবাব দেয় খুবই কেজো ভঙ্গিতে

রাস্তায় নেমে মোবাইল থেকে উবের বুক করার উপক্রম করতে যাবেন, এমন সময় ফোন বেজে উঠল অজিতের। সন্দীপের ফোন। সন্দীপ সেই কলেজ জীবন থেকে অজিতের বন্ধু। এখন প্রতিষ্ঠানে পরিণত প্রতিষ্ঠান বিরোধী নাম করা পত্রিকার সম্পাদক, অনেকগুলি সাহিত্য সংস্কৃতি কমিটির কর্ণধার। ‘হ্যাঁরে, বল,’ অজিত ফোন ধরে বলেন। ‘কী বলব অজি ! তুইই বল, আমি কী বলব তোকে !’ বেশ উত্তেজিত শোনায় সন্দীপের কণ্ঠস্বর। ‘কেন ? কী হল আবার ?’ অজিত একটু বিরক্ত হয়েই প্রশ্ন করেন। ‘তুই কি আজকাল মদের সঙ্গে গাঁজা টাজাও খাচ্ছিস নাকি ? এ রকম থার্ড ক্লাস লেখা তোর কলম দিয়ে কী করে বেরোয়, আমি তো ভাবতেই পারছি না !’ সন্দীপ সমস্ত অভিযোগ সোজাসুজি উগরে দেয়। ‘কোন লেখাটার কথা বলছিস ?’ অজিত জিজ্ঞাসা করেন। ‘কোন লেখা মানে ? আমার পত্রিকা ‘নাগরিক’-এ তোর যে লেখাটা ধারাবাহিক বের করতে গিয়ে লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছে। প্লট বলতে কিচ্ছু নেই শুধু ইয়েতে সুড়সুড়ি দেওয়া লেখা এখন পাবলিক এসব খায় না বস ! গল্প চাই, গল্প। নইলে এ সব লেখার জন্য বটতলার কাগজ খোঁজ, ভাই,’ সন্দীপের রাগ যেন গনগনে আগুনের মতো দাউদাউ জ্বলে ওঠে। ‘আচ্ছা দেখছি,’ একটু মিয়োনো গলায় অজিত বলেন, ‘আসলে এখন তো সবাই বাস্তবধর্মী লেখা চায়...’ ‘বাস্তবধর্মী আমাকে বোঝাতে আসিস না, গান্ডু ! বাস্তবধর্মী মানে শুধু নোংরামো ? হয়তো তোর বাস্তবটা তাই কিন্তু সবার তা নয়, বুঝলি ?’ অজিতের কথার মাঝখানেই রাগে ফেটে পড়তে পড়তে উত্তর দেয় সন্দীপ। হয়তো সন্দীপের রাগের চোটেই অজিতের ফোনটা ঠক করে মাটিতে পড়ে যায় আর তার ব্যাটারি ইত্যাদি খুলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায় চারদিকে

প্রায় আধ ঘণ্টা থম মেরে ল্যাপটপের সামনে বসে আছেন অজিত গুহএকটা লাইনও এগোয়নি। একটা সময় ছিল যখন অজিত ওঁর গল্প বা উপন্যাসের চরিত্রদের চোখের সামনে দেখতে পেতেন। সাতদিনের মধ্যে নেমে যেত একটা মাঝারি মাপের উপন্যাস। স্কুলের খাতা বাড়িতে নিয়ে আসতেন তিনি, দেখে দিত নির্মলা। শুধু সই করাটুকু কাজ ছিল অজিতের। নির্মলা কোনো দিন রাগারাগি করে নি ওই অকারণ খাতার চাপের জন্য। চুপচাপ দেখে দিত। বড় নিখুঁত ছিল ওর কাজ। অনেকবার অজিত বলেছেন যে ভুল বানানের নিচে দাগ দিলেই হবে, ঠিক বানান লিখে দেওয়ার দরকার নেই কিন্তু নির্মলার সেই একই জেদ। সে ঠিক বানান লিখে দেবে, ভুল বাক্য ঠিক করে লিখবে। এই নিয়ে সহকর্মীদের তো বটেই ছাত্রদেরও তির্যক মন্তব্য কানে এসেছে অজিতের। অজিত স্যার যখন স্কুলে খাতা দেখেন তখন সেটা কাটা গোল্লা খেলা হয় আর যখন বাড়ি থেকে দেখে আনেন তখন কমেন্ট লেখেন মুক্তোর মতো মেয়েলি হাতের লেখায় !

সত্যিই মুক্তোর মতোই হাতের লেখা ছিল নির্মলার। ফুলশয্যার রাতে সেই মুক্তাক্ষরে লেখা একটি কবিতা কাঁপা কাঁপা হাতে নির্মলা তুলে দিয়েছিল অজিতের হাতে। অজিত সেই লেখা না পড়েই রেখে দিয়েছিলেন বালিশের তলায়। আসলে তখন তাঁর শরীর অন্য কিছু চাইছিল নির্মলার কাছে এবং খুব প্রকট ছিল সেই চাহিদাটানির্মলা অভিমান করেনি বা করলেও তা বুঝতে দেয়নি অজিতকে। পরের দিন অজিত ওই কাগজটা খুঁজে পাননি বালিশের তলায়। মনে মনে হেসেছিলেন খুব। নিশ্চয় নির্মলা বুঝতে পেরেছিল যে ওর ওই বোকা বোকা রোম্যান্টিক কবিতা অজিত গুহর মতো নামজাদা লেখকের হাতে তুলে দেওয়াটাই চূড়ান্ত বোকামি এবং সে কারণেই সকালে উঠেই লেখাটা সরিয়ে ফেলেছিল। নির্মলার কাছে তিনি জানতেও চাননি যে ফুলশয্যার রাতের ওই ভালোবাসার উপহারটা গেল কোথায়। নির্মলা বয়সে অজিতের থেকে পনেরো বছরের ছোট। বিয়ের মাত্র কিছুদিন আগে বাংলা সাহিত্য নিয়ে সদ্য এম এ পাশ করেছে সে। অজিত বিয়ে করেছিলেন কিছুটা বেশি বয়সেই। সরকারি স্কুলের চাকরি পেয়ে, বোনের বিয়ে দিয়ে, বাবা মার দায়িত্ব ছোট ভাই অমিতকে বুঝিয়ে দিয়ে, নিজের জন্য একটা ছিমছাম ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করে তবে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিলেন তিনি। তাঁর দরকার ছিল দুটো জিনিস... অনুগত বৌ আর লেখার জন্য সম্পূর্ণ নিভৃতি। দুটোই তিনি পেয়েছিলেন ঠিক যেমনটা ওঁর প্রত্যাশা ছিল।

নির্মলার মতো অনুগত এবং কর্মিষ্ঠ মানুষ খুব কমই দেখা যায়। একা হাতে সংসারের সব কাজ সামলে নিপুণভাবে অজিতের প্রতিটি বইয়ের তিনটে করে প্রুফ দেখে দিয়েছে ও। কোনো দিন কোনো ইচ্ছার জোর চাপাবার চেষ্টা করেনি অজিতের উপর। অজিতও অবশ্য প্রথম রাতেই বেড়াল মারার পন্থা অবলম্বন করেছিলেন। নির্মলাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে ওঁর কথাই বাড়িতে শেষ কথা। নির্মলা বিনা বাক্যব্যয়ে সেটা মেনেও নিয়েছিল। না মেনে উপায়ও তো ছিল না ওর। ওর বাপের বাড়ির ক্ষমতাই ছিল না ওর অবাধ্যতাকে ইন্ধন দেওয়ার।

নির্মলা স্কুলের চাকরির পরীক্ষা দিতে চেয়েছিলএক কথায় নাকচ করে দিয়েছিলেন অজিত। অবাক হয়েছিল নির্মলা। জিজ্ঞাসু চোখ তুলে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘কেন ?’ ‘কারণ আমি তোমার স্বামী এবং আমি তোমায় চাকরি করতে দিতে চাই না, তাই,’ শুকনো গলায় উত্তর দিয়েছিলেন অজিত। নির্মলার চোখদুটো বুঝি এক মুহূর্তের জন্য ছলছল করে উঠেছিল। ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল সে। অজিতের আশংকা ছিল যে তারপর ঝামেলা বা মান অভিমান চাপান উতোর হবেই। কিন্তু অজিতকে অবাক করে নির্মলা সে পথে হাঁটেই নি।

সে বছর সাহিত্য সভায় কলকাতার বাইরে গিয়েছিলেন অজিত। সেই সময় দিল্লি থেকে কলকাতায় এসেছিল ওর বোন অঞ্জলি তার দুই ছেলে মেয়েকে নিয়ে। বাড়ি ফিরে অজিত দেখেন বাচ্চারা তো বটেই এমনকি ওর বোনও নির্মলার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। নির্মলা অসাধারণ রান্না করে, নির্মলা খুব ভালো গল্প বলে, নির্মলা মজার মজার ছবি আঁকা শেখাতে পারে ইত্যাদি কত কথা যে বলে গেল সবাই মিলে। অজিতের খুব রাগ হয়ে গেল হঠাৎঅঞ্জলির উপর না নির্মলার উপর না নিজের উপর কে জানে ! রাতে খেতে বসে সামান্য অছিলায় প্রচণ্ড অপমান করলেন নির্মলাকে। অঞ্জলি বার বার দাদাকে বোঝাবার চেষ্টা করল যে ও রকম ব্যবহার করা উচিৎ নয়। কিন্তু অজিত কোনো মতেই নিজের ব্যবহারে কোনো পরিবর্তন আনার কথা ভাবতেই পারলেন না। ওঁর বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে ওঁর ভাই বোনরা ওঁকে চিরদিনই স্বার্থপর এবং অভদ্র মনে করে এবং এখন তাদের ওই ভাবনায় ইন্ধন দিচ্ছে নির্মলা। অঞ্জলি এতটাই আহত হয়েছিল যে পরের দিনই হঠাৎ প্ল্যান করে ফেলে সপরিবারে শান্তিনিকেতন যাওয়ার। বাচ্চারা বারবার আবদার করছিল নির্মলাকে ওদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য। নির্মলা রাজি হয়নি। অঞ্জলিও আর ফিরে আসেনি। অজিতও সাধেন নি বোনকে। অত হৈচৈ ওঁর পোষায় না।

নির্মলার কিন্তু কোনো ভাবান্তর হয়নি। অজিতকে ভালো মন্দ কোনো কিচ্ছুই সে বলেনি। কখনো আবদার করেনি, সরাসরি সমালোচনাও করেনি কোনো দিন। অজিতও নির্মলাকে কোনো দিন ভালোবাসা দূরে থাক, ভালো চোখে দেখতে পারলেন নাপ্রথম দেখা হওয়ার একটা অদ্ভুত কটু স্মৃতি ওঁকে সারাজীবন তাড়া করে বেড়াল। নির্মলার সঙ্গে সম্বন্ধ করেই বিয়ে অজিতের। নির্মলার বাবা মনোহর বাবু একাত্তর সালে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা এক সর্বস্ব হারানো মানুষ। স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে ছেলে মেয়েদের ছোট বেলাতেই। তিনটি সন্তানকে উনি প্রতিপালন করেছিলেন যথেষ্ট অনটনের মধ্য দিয়ে। নির্মলার বোন সুবর্ণা আর নির্মলা আড়াই বছরের ছোট বড়। সবার বড় নির্মলা আর সবার ছোট ওদের ভাই মনোজ যে মানসিক প্রতিবন্ধী ছিল অভাবের মধ্যেও সাহিত্য চর্চার স্বভাব যায়নি ওদের পরিবারের। নির্মলা আর সুবর্ণা দুজনেই সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেছে। নির্মলা বাংলা আর সুবর্ণা ইংরেজি। এম এ পাশ করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দিল্লিতে একটা সংবাদপত্র অফিসে কাজ পেয়ে চলে যায় সুবর্ণা। নির্মলাও চাকরি করছিল পাড়ার নার্সারি স্কুলে। অজিতের সঙ্গে নির্মলার বিয়ের সম্বন্ধ এনেছিলেন অজিতের ফুলপিসি। ওঁদের বাড়িতে সামান্য টাকায় ভাড়া থাকত নির্মলারা। নিঃসন্তান ফুলপিসি এবং পিসে খুব স্নেহ করতেন ওদের। পিসি নিজে অজিতকে বলেছিলেন, ‘আমার কথা শোন অজি, এই মেয়েটিকে বিয়ে করে তুই সুখী হবি। শান্ত, ঘরোয়া আর এমন বুদ্ধিমতী মেয়ে দেখা যায় না সচরাচর।’ অজিতের মনেও তখন সংসার করার ইচ্ছা জেগেছেঅজিতের কাছে অবশ্য বিয়ে করা মানে সেবা যত্ন করা এবং সাংসারিক দায়ঝক্কি সামলাবার জন্য একটি মানুষ পাওয়াপ্রথম দিন বাড়ির বড়রা মেয়ে দেখে গ্রীন সিগনাল দেওয়ার পর সন্দীপকে নিয়ে অজিত গেলেন নির্মলার সঙ্গে নিজে কথা বলতে।

অতি সাধারণ একটি মেয়ে মনে হয়েছিল নির্মলাকে। কালো না হলেও চাপা রং, ছোট্ট কপালে একটা কালো টিপ ছাড়া কোনো সাজ নেই। অজিত তখন কবি হিসেবে বেশ কিছুটা সুনাম অর্জন করে ফেলেছেন। বাংলার ছাত্রী নির্মলাকে জিজ্ঞাসা করলেন যে সে অজিতের নাম শুনেছে কিনা, মানে কবি অজিত গুহ হিসেবে অজিত নির্মলার কাছে পরিচিত কিনা। হ্যাঁ বুঝিয়ে ঘাড় নেড়েছিল নির্মলা। ‘আমার সদ্য প্রকাশিত বইটা তুমি পড়েছ ? “কাকচক্ষু জল” ?’ অজিত জিজ্ঞাসা করেছিলেন। ‘হ্যাঁ’, ছোট্ট করে উত্তর দিয়েছিল নির্মলা। ‘ভালো লেগেছে ?,’ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানতে চেয়েছিলেন অজিত। একটু ইতস্তত করে নির্মলা বলেছিল, ‘ভালোই তো...’ ‘ভালোই তো ? ভালোই তো মানে ?’ অজিত একটু উত্তেজিত হয়েই জিজ্ঞাসা করেছিলেন। একটুখানি সময় চুপ করে থেকে নির্মলা বলেছিল, ‘আপনার সব কটা বইই পড়েছি আমি। আপনার ভাষা অসাধারণ কিন্তু...’ ‘কিন্তু কী ?’ অধীর হয়ে জানতে চেয়েছিলেন অজিত‘কিন্তু এক এক সময়... না, থাক !’ থেমে গিয়েছিল নির্মলা। ‘কেন ? থাকবে কেন বলো,’ অজিত জোরই করেছিলেন। নির্মলা উত্তর দেয় নি। কোনো মতেই নির্মলাকে দিয়ে উত্তরটা দেওয়াতে পারেন নি অজিত। সেদিন তো নয়ই পনেরো বছরের গোটা দাম্পত্য জীবনেও নয়।

মনোহর বাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে অজিত গুহ ঠিকই করেছিলেন যে নির্মলার সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধটা উনি ভেঙে দেবেন। ওইটুকু মেয়ের এত জেদ ! কোনো ভাবে ওকে দিয়ে বলানো গেল না যে ‘কিন্তু’ টা কী ! তারপর ওঁর মনে হয় উনি নির্মলাকেই বিয়ে করবেন আর কিছু না হোক, ওই ‘কিন্তু’র পরের কথাগুলি শোনার জন্য। ওর এই জেদের যোগ্য জবাব উনি দিয়েই ছাড়বেন। বাড়ি এসেই উনি জানিয়ে দিলেন যে নির্মলাকেই উনি বিয়ে করবেন এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।

অজিতের বাবা মা অজিতের মতেই মত দিয়েছিলেন। আসলে ওঁদের বাড়িতে সবাই অজিতকে একটু সমঝেই চলত। ঠাকুমা দাদুর কাছে বাড়ির বড় ছেলে হিসেবে যথোচিত গুরুত্বের চেয়ে একটু বেশিই অজিত পেয়ে এসেছেন চিরকাল। তার ফলে বাবা মা ভাই বোনের সঙ্গে অজিত নিজেকে এক করে দেখতেই শেখেন নি। দাদু সরিৎরঞ্জন ছিলেন খুব নাম করা হোমিওপ্যাথি ডাক্তার আর ওঁর বাবা শান্ত লাজুক মানসরঞ্জন সারা জীবন নিজের বাবার কম্পাউন্ডারি করেই কাটিয়ে দিলেন কিন্তু দাদুর মৃত্যুর পরে ওই পসার তিনি ধরে রাখতে পারলেন না দাদু মারা গেলেন ক্যান্সারে ভুগে, পরিবারকে ধনে প্রাণে শেষ করে। বাড়িটা যেন তখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াল। আজ এখানে ভাঙে তো কাল ওখান দিয়ে জল পড়ে। সারাবার ক্ষমতাও নেই, যাবার উপায়ও নেই। অবশেষে দাদু মারা গেলেন খুব কষ্ট পেয়ে। দাদুর পর ঠাকুমার পালা। কিডনির অসুখে তিন বছর ভুগে যখন তিনি শেষ পর্যন্ত সাধনোচিত ধামে প্রয়াণ করলেন তখন কিছুটা অনটনই দেখা দিল সংসারে। কিন্তু তা অল্প দিনের জন্যই। অজিত এম এ পাশ করে সরকারি স্কুলে পড়ানোর চাকরি পেয়ে গেলেন আর সঙ্গে সঙ্গে পেতে থাকলেন সাহিত্য জগতের সম্মান এবং পুরস্কার যার অনেকখানিই অবশ্য তৎকালীন শাসক দলের কাছাকাছি থাকার সুবাদে। এদিকে অমিতও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শেষ করার পর পরই চাকরি জুটিয়ে ফেলল। চাকরি করতে করতেই সন্ধেয় ক্লাস করে এম বি এ টাও করে ফেলল। ফলে আরও ভালো চাকরি, মাইনে বাড়ল চড়চড়িয়ে। নিজের পছন্দ করা পাত্রীকে বিয়ে করে পুনেতে গিয়ে থিতু হল অমিত কিন্তু বাবা মায়ের দায়িত্ব এড়িয়ে গেল না। অমিতের বৌ সুমনা রূপে লক্ষ্মী গুণে সরস্বতী। অজিত অমিতের বোন অঞ্জলি ছিল তার স্কুল জীবনের প্রাণের বন্ধু। ফলে ওই পরিবারের সঙ্গে ও ছোট থেকেই স্বচ্ছন্দ। বিয়ের পর মাঝে মাঝেই শ্বশুর শাশুড়িকে নিজের কাছে নিয়ে গিয়ে যথেষ্ট যত্ন আত্তি করত। তার ফলও অমিত আর সুমনা পেয়েছিল। বিশাল সাবেকি বাড়িটা প্রোমোটারকে দিয়ে ভালো অংকের টাকা আর একটা তিন কামরার ফ্ল্যাট পেয়েছিলেন মানস। সেই টাকার সিংহভাগই ফিক্স করে দেওয়া হয়েছিল অমিতের মেয়ে স্নেহার জন্য, অজিত যা পেয়েছিলেন, তাতে একটা ভদ্র সভ্য ফ্ল্যাটও কেনা যায় না। অজিত কোনো ঝামেলায় যাননি। বাবা মায়ের দায়িত্ব থেকে হাত গুটিয়ে নেওয়ার সুযোগটা ছাড়েননি উনি। সরে এসেছিলেন চুপচাপ। ওই টাকাকে মূলধন করে বাকিটা ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে কিনেছিলেন নিজের মনের মতো ফ্ল্যাট। এই সব করতে গিয়ে বিয়েটা করে ওঠা হল না সময় মতো। আটত্রিশ বছর বয়সে নিজের চেয়ে পনের বছরের ছোট নির্মলাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলেন শেষমেশ।

বিয়ের দিন সকালে নির্মলার বাড়ি থেকে আশীর্বাদ করতে এল ওই বাড়ির অভিভাবকরা। আশীর্বাদ করে যাওয়ার সময় অজিতকে ডেকে নির্মলার বাবা বললেন, ‘বাবা, এ মণিকাঞ্চন যোগ। তুমি যেমন লেখালিখি করো, আমার মেয়েও কিন্তু খুব ভালো লেখে। অনেক প্রাইজ পেয়েছে ও...’ হঠাৎ অজিতের মনে পড়ে গেল ওই ‘কিন্তু’র কথা। নির্মলা কি অজিতের লেখার সমালোচনা করার চেষ্টা করছিল ? অজিতের ভিতরটা হঠাৎ করে কেমন যেন কঠোর হয়ে উঠল। ও বলল, ‘সে ভালো কথা, কিন্তু বিয়ের পর ওকে পুরোদস্তুর সংসার করার প্রস্তুতি নিয়ে পাঠাবেন। দুজনেই যদি লেখালেখি করি, সংসারের হালটা ধরবে কে ?’ শুনে কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল নির্মলার বাবার মুখটা। ‘সে তো নিশ্চয়ই, বাবা,’ কোনো ক্রমে বলে বাথরুমের দিকে চলে গিয়েছিলেন দ্রুত পায়ে।

আজ ডালটা কি ধরে গিয়েছিল ?’

হ্যাঁ’

হ্যাঁ মানে ? একটা ডাল রাঁধতে পারো না তুমি ? উনুনে রান্না বসিয়ে করছিলে টা কী ?’

বই পড়ছিলাম।’

কী বই ?’

সীতা থেকে শুরু।’

হুম ! মল্লিকা সেনগুপ্ত ? পুরুষ বিরোধী লেখিকা ?’

এই প্রথম এবং শেষ নির্মলা অজিতের মুখের উপর উত্তর দিয়েছিল, ‘পুরুষ বিরোধী নয় তো, নারীর সপক্ষে...’

আরিব্বাস ! তুমি তো অনেক কিছু জেনে বসে আছ ! কিন্তু ডালটা তোমার হাতে পুড়ে যায় !’

............

ওই সব নারীবাদী কবিতা পড়ে তোমার লাভ হবে না। ডালটা ঠিক করে রান্না কোরো,’ কী এক অকারণ ক্রোধে ফেটে পড়েছিলেন অজিত। নির্মলা যথারীতি নীরব ও নির্বিকার।

আর এক দিনের কথা। বাবুন তখন ক্লাস সেভেনে পড়ে। নির্মলা বাজারে গেছে সেদিন। অজিত নিজের ঘরে বসে লিখছিলেন মন দিয়ে। হঠাৎ বাবুন ঘরে ঢুকে জিজ্ঞেস করে, ‘উৎসর্গ মানে কী, বাবা ?’ ‘উৎসর্গ... মানে...’ উৎসর্গ কথাটার কি কোনো প্রতিশব্দ আছে ? ভাবতে ভাবতেই কানে আসে বাবুনের গলা, ‘থাক, ছেড়ে দাওমা এলে জিজ্ঞেস করে নেব।’ আপাদমস্তক জ্বলে উঠেছিল অজিতের। ‘তোর মা কি আমার থেকে বেশি জানে ?’ কথাটা বলার আগেই নির্মলার প্রত্যাবর্তন আর বাবুন ঘর থেকে উধাও।

নির্মলা বাজারের ব্যাগ উপুড় করে ফেলেছে ততক্ষণে। দরজায় দাঁড়িয়ে অজিত চ্যালেঞ্জের মতো ছুঁড়ে দেন তাঁর প্রশ্ন, ‘উৎসর্গ’ মানে কী ? নির্মলা একবার মাথা তুলে তাকায়। এক মুহূর্ত সময় নিয়ে বলে, ‘সম্পূর্ণভাবে দিয়ে দেওয়া।’ ‘হল না’, চাপা গর্জনে বলে ওঠেন অজিত, ‘প্রতিশব্দ চাই, প্রতিশব্দ !’ আবার এক মুহূর্তের নীরবতা। তারপর আলু পেঁয়াজ গুছিয়ে ঝুড়িতে তুলতে তুলতেই নির্মলা উত্তর দেয়, ‘নিবেদন !’ ‘থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ’, বলে ছুটে বেরিয়ে যায় বাবুন। থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকেন অজিত। সব্জি গুছোতে গুছোতে নির্মলা একবার চোরা চোখে তাকায় অজিতের দিকে। তারপর ওর স্বাভাবিক ঠাণ্ডা গলায় বলে, ‘চা খাবে ?’

কী জোরে গান চালিয়ে গাড়িটা গেল সামনের রাস্তা দিয়ে ! যেন কেঁপে কেঁপে উঠল অজিত গুহর একতলার ফ্ল্যাটটা। আজকাল ছেলেগুলো কী সহজে হাতে পেয়ে যায় গাড়ির চাবি। বাবুন অবশ্য খুব অন্য রকম ছিলও আসলে একেবারে ওর মায়ের আদলে গড়াসাত কিলোমিটার দূরের স্কুলে যেত সাইকেল চালিয়েশরীর চর্চার দোহাই দিত বটে, কিন্তু অজিত জানেন তেরো বছরের জন্মদিনে নির্মলার কাছ থেকে ওই সাইকেলটা উপহার পেয়েছিল বাবুন। নির্মলা কী ভাবে টাকা জমিয়েছিল তা অজিতের জানা নেই। সম্ভবত সংসার খরচ থেকে একটু একটু করে সরিয়ে রেখেছিল। টাকা পয়সার ব্যাপারে অজিত চিরদিনই বেশ হিসেবি। ব্যাংকের লোন শোধ হয়েছে মাত্র বছর পাঁচেক হল। তারপরই মন্দিরা এবং তার নানা আবদারনামকরা প্রকাশকের মেয়ে। এখন তো ‘সাঁঝবাতি প্রকাশনা’র পুরো দায়িত্বটাই ওর কাঁধে। মজা করে নিজের বাবাকে রাহাবাবু বলে উল্লেখ করে আর নিজেকে বাবার কর্মচারী হিসেবে। কিন্তু আজকাল মন্দিরা কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে ! বড্ড তাচ্ছিল্য করছে অজিতকে। অজিতের কোনো কিছুই যেন পছন্দ হচ্ছে না ওর। বিশেষ করে নির্মলা চলে যাওয়ার পর অজিত বিয়ে করতে চেয়েছিলেন মন্দিরাকে। মন্দিরা শুকনো হেসে বলেছিল, ‘ সংসার তো অনেক বছর করেছ অজিতদা, এবার ঝাড়া হাত পা হয়ে মন দিয়ে লেখো। তোমার লেখার হাত পড়ে যাচ্ছে কিন্তু...’

চোখ তুলে ঘড়ির দিকে তাকান অজিত। রাত দেড়টা বাজে। আর ল্যাপটপের সামনে বসে থেকে লাভ নেই। কিন্তু হাতের ফাঁক দিয়ে সময় যে গলে যাচ্ছে। এক সপ্তাহের মধ্যে তিনটে লেখা দিতেই হবে। পরের সপ্তাহের মাঝামাঝি চলে আসবে প্রি টেস্ট-এর খাতা। তার আগে প্রাইভেট ছাত্রদের খাতাগুলো দেখে ফেলতেই হবে। আজকাল আর প্রাইভেট পড়াতে ভালো লাগে না অজিতের। ছেলেমেয়েগুলোও কেমন যেন তেরিয়া টাইপের হয়ে গেছে। বিশেষ করে ওই থার্ড ইয়ারের ব্যাচটা। ওরা আড়ালে ওদের গুহ স্যারকে বলে ‘গু স্যার’। অজিত তা ভালোই জানে। আসলে নির্মলার ওই ভাবে চলে যাওয়াটা ওরা যেন নিতে পারেনা। ওদের চোখে অজিত যেন ভিলেন। আচ্ছা, নির্মলা কি কখনো কিছু বলেছিল ওদের ? ওদের সঙ্গে কি অজিতের আড়ালে কোনো যোগাযোগ ছিল নির্মলার ? কে জানে ! পরের বছর থেকে আর প্রাইভেট পড়ানোরই দরকার নেই। অত টাকা লাগবে কোন কাজে ! অজিত শুধু লিখতে চান। সাহিত্য জগতের কোনো পুরস্কারই যেন অধরা না থাকে ওঁর।

 

এই ব্যাগটা ব্যবহার করে চাও ?’

কোনটা ?’

এই ব্যাগটা ? এটা “বাংলা সাহিত্য দিগন্ত” আমায় সংবর্ধনায় দিয়েছে।’

ভালো দেখতে কিন্তু আমার তুলনায় অনেকটা লম্বা হয়ে যাবে।’

আমার সব কিছুতেই তুমি খুঁত খুঁজে পাও, না ?’

.........

আমার বই তুমি পড়ো ?’

হু’

এনি কমেন্টস ?’

.........

আমার লেখা ভালো লাগে না তোমার ?’

.........

বুঝেছি। আমার চেয়ে ভালো লিখে দেখাতে পারবে আমায় ?’

না। আমি তো লেখক নই।’

মানে নিজের লেখার মুরোদ নেই। শুধু খুঁত ধরবে ? রাবিশ !’

.........

লম্বা একটা হাই তুলে, আড়মোড়া ভেঙে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান অজিত গুহ। আজকে আর কিছু হবে না। শুয়ে পড়াই ভালো। কাল বরং সকাল সকাল উঠে... হঠাৎ নাকটা কুঁচকে চারদিকে চেয়ে দেখেন অদ্ভুত একটা গন্ধ ! বেশ চেনা চেনা কিন্তু কীসের সেটা ঠিক মনে আসছে না।

 

এগুলো কী ?’

কবিতা।’

সে তো দেখতেই পাচ্ছি। কার লেখা ?’

নীলার।’

নীলাটা কে ?’

.........

কী হল ? কে নীলা ?’

............

কথাটা কানে ঢুকছে না ?’

নির্মলা চোখ তুলে তাকায়। ওর চোখে একটা শান্ত অবাধ্যতা যাকে প্রতিবাদও বলা যায়।

দেখি, কাগজগুলো দেখি’, অজিতের আদেশ পালন করে নির্মলা। ‘রান্না কি হয়ে গেছে ?’ অজিত জানতে চান। ‘হু’, নির্মলা উত্তর দেয়। ‘যাও, ভাত বাড়ো। আমি যাচ্ছি। বেরোতে হবে,’ অজিত বলেন। নির্মলা ইতস্তত করে যেতে। সম্ভবত কাগজগুলো নিয়ে যেতে চায়। ‘কী হল ? যাও...’ এবার হুকুমের সুরেই বলেন অজিত। নিঃশব্দে পিছন ফিরে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় নির্মলা।

কম্পিউটারে লেখা খান পঁচিশ কবিতা। একটা বেশ দীর্ঘ অন্যগুলো এক পৃষ্ঠার চেয়ে বড় নয়। সম্ভবত একটা কবিতার বইয়ের পাণ্ডুলিপি ‘নীলার কবিতা’ দ্রুত চোখ বোলান অজিত। মানতেই হবে পাকা হাতের লেখা। নীলা... নীলা বলে কোনো কবির নাম তো মনে পড়ছে না। মন্দিরাকে একবার জিজ্ঞাসা করতে হবে। দেরাজের মধ্যে কবিতার কাগজগুলোকে ঢুকিয়ে রেখে হাত ধুয়ে খেতে বসেন অজিত।

বাবুন কোথায় ?’

আঁকার ক্লাসে’

আজ ওর আঁকার ক্লাস নাকি’

হু’

বাবুন কি কবিতা লেখে ?’

জানিনা’

তুমি মা আর জানো না ছেলে কী করে না করে ?’

............

নীলা কে ? তোমার বন্ধু ?

হুম...

তোমার সঙ্গে নিয়মিত দেখা হয় ?

.........

কী হল ? নীলার সঙ্গে তোমার দেখা হয় ?

............

এই রকম জ্যান্ত লাশের সঙ্গে ঘর করা যায় ? মনে মনে গজগজ করেন অজিত। আজকাল বাবুনও ওই নীরবতার সাধনায় নেমেছে। দশটা কথা খরচ করলে একটা কথার উত্তর পাওয়া যাবে। ছেলেটাকে ঠিক ভাবে মানুষ করতে হলে এই কবরখানায় রাখলে হবে না। দূরে কোথাও পাঠাতে হবে। ওকে সায়েন্স নিয়েই পড়াতে হবে। মনে মনে ভাবেন অজিত।

রাত হয়ে গেছিল সেদিন। অনেকটা রাত। মন্দিরার সঙ্গে সিনেমা দেখার পর খেতে গিয়েই বিপত্তি। এত দেরি করে দিল খাবার দিতে ! তাও মন্দিরা গাড়ি করে অনেকটা দূর এগিয়ে দিয়ে গেল। দূর থেকে দেখতে পেলেন ফ্ল্যাট অন্ধকার। শুধু বাবুনের ঘরে আলো জ্বলছে। আজকাল নির্মলাকে রাতে জেগে থাকতে বারণ করেছেন অজিত। নিজের কাছে ডুপ্লিকেট চাবি থাকে। নির্মলা ভিতর থেকে লক করে শুয়ে পড়ে। অজিত বাইরে থেকে লক খুলে ভিতরে ঢোকেন। ফ্ল্যাটে ঢুকেই চমকে ওঠেন অজিত। নির্মলা আর একটা পুরুষ কণ্ঠ ! নেশাটা চটকে যায় এক্কেবারে।

ধীরে ধীরে উঁকি মারেন বাবুনের ঘরে ঘরের মধ্যে অকারণে জ্বলছে একটা মোমবাতি। নির্মলা আর বাবুন মেঝেতে বসে। দরজার দিকে পিঠ ওদের। খাটের উপর ছড়িয়ে খান দশেক কবিতার বই। ওরা কবিতা পড়ছে ! নিজের ছেলের গলাই যেন অচেনা লাগে অজিত গুহর। নির্মলা এত ভালো কবিতা আবৃত্তি করে ! কী চমৎকার ওর স্বরক্ষেপণ ! চুপ করে মিনিট দশেক দাঁড়িয়ে থাকেন অজিত। মুগ্ধ হতে থাকেন মা ছেলের কবিতার বোঝাপড়া দেখে।

পর মুহূর্তেই মাথাটা ঝাঁ করে তেতে ওঠে অজিতের। নির্মলার কবিতা পড়াকেও মনে হয় অপরিসীম ঔদ্ধত্ব। ওই যে অতগুলো বই ছড়িয়ে আছে খাটের উপর, তার মধ্যে একটা বইও তো অজিত গুহর নয়। এ তো পরিকল্পিত ভাবে ছেলেকে প্ররোচিত করা তার বাবার সৃষ্টিকে অমর্যাদা করতে। গলা খাঁকারি দেন অজিত। নির্মলা আর বাবুন দুজনেই চমকে ওঠে। নির্মলা যেন মুহূর্তের মধ্যে ওই জ্যান্ত লাশের খোলসের মধ্যে ঢুকে পড়ে। আর বাবুন গুছিয়ে তুলতে থাকে বইগুলোকে। অজিত যে নেশায় টলোমলো সে নিয়ে ভ্রূক্ষেপ নেই মা ছেলে কারোরই।

নির্মলার বয়স চল্লিশ পেরিয়ে গেছে। কিন্তু ওকে অনেক কম বয়সী মনে হয়। সাজলে গুজলে এখনো ওকে সাত আট বছর কম দেখাবে। কিন্তু তার মুখে কী এক জেদের কাঠিন্যলিপস্টিক লাগাবে না, কায়দা করে চুল কাটাবে না, পার্লারে যাবে না। অজিত যা বলে চুপচাপ শোনে কিন্তু করে সেটুকুই যেটা তার কর্তব্য। অথচ তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করার জো কিন্তু নেই। যা যা করার সব কাজ নিখুঁত ভাবে করে রাখে। কিন্তু সে করে রাখা রোবটের করে রাখা। তার মধ্যে প্রাণ নেই। অজিতের মনে হয় তার সংসারটা যেন রোবটের সংসার। সব কিছু নিখুঁত, সব কিছু নিষ্প্রাণ !

এত কাক ডাকছে কেন এই মাঝরাতে ? অজিত বিরক্ত হয়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ান। নিম গাছটায় ঝটাপটি করছে কাকগুলো। হঠাৎ একটা রাত চেরা তীব্র ডাক। কোথা থেকে একটা পেঁচা এসে পড়েছে কাকেদের আস্তানায়। পেঁচাটা আবার ডেকে উঠল। কোন এক অজানা কারণে শিরদাঁড়ার মধ্যে সিরসির করে উঠল অজিতের। বাবুন খুব পেঁচা ভালোবাসত। ওর ঘর ভর্তি ছিল নানা জায়গার পুতুল পেঁচায়। নির্মলা কোথা কোথা থেকে পেঁচা জোগাড় করে আনত ছেলের জন্য। বাবুন চলে যাওয়ার পর সেই পেঁচাগুলোকে কোথায় রেখেছিল নির্মলা ? তখন তো এই প্রশ্নটা মাথায় আসেনি অজিতের।

বাতাসে একটা অদ্ভুত গন্ধ। একটু আগে কম্পিউটারের সামনে বসে ওই গন্ধটাই নাকে আসছিল অজিতের। বারান্দার দরজাটা বন্ধ করে ঘরে ফিরে আসেন তিনি। আলো জ্বালিয়ে কাচের শো কেসটার সামনে এসে দাঁড়ান। তিনটে থাক বোঝাই শুধু পুরস্কার আর সম্মান স্মারকে। সবার সামনে ঝলমল করছে এবারের কবিতা উৎসবে পাওয়া ‘বছরের কবিশ্রেষ্ঠ পুরস্কার’। যে পুরস্কার অজিত গুহ পেয়েছিলেন ‘সাঁঝবাতি প্রকাশনী’ থেকে প্রকাশিত তার সাম্প্রতিকতম বই ‘নীল কবিতাগুচ্ছ’ র জন্য। এই পুরস্কারের স্বপ্ন কিশোরবেলা থেকে দেখে এসেছেন অজিত গুহ।

অজিত সন্তর্পণে পুরস্কার ফলকটার সামনে গিয়ে দাঁড়ান। লাল হরফে ফলকটার বুকে জ্বলজ্বল করছে অজিত গুহর নাম। হঠাৎ অজিতের মাথায় ঝলসে উঠল ওই আঁশটে গন্ধটার পরিচয়। রক্তের গন্ধ, রক্তের গন্ধ ওটা। ঠিক যে গন্ধটা অজিত পেয়েছিলেন ‘কবিশ্রেষ্ঠ পুরস্কার’ নিয়ে বাড়িতে ঢুকেইনিজের কবি মহলের কোনো সভা সমিতিতে নির্মলাকে কোনো দিনই সঙ্গে নিয়ে যাননি অজিত। প্রথম প্রথম কয়েকবার ও ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল অজিতের কবি বন্ধুদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার। অজিত আমল দেননি মোটেও। আর অন্য কবি এবং লেখকদের সঙ্গে বৌকে সঙ্গে নিয়ে আড্ডা মারার মতো হৃদ্যতাও ছিল না অজিতের। ফলে অজিতের সাহিত্য জগতে কোনো প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল না নির্মলার।

মায়াবনের মরীচিকা’ বইটা নির্মলাকে উৎসর্গ করবেন ভেবেছিলেন অজিত। প্রুফ দেখার সময় উৎসর্গপত্রটি চোখে পড়ে নির্মলার। ও সোজা এসে অজিতকে অনুরোধ করে বইটি ওকে উৎসর্গ না করতে। অজিত বারবার জিজ্ঞাসা করার পরও কোনো কারণ ও দেখায় নি। চূড়ান্ত অপমানিত বোধ করে উৎসর্গপত্র থেকে নির্মলার নাম সরিয়ে দেন অজিত। দীর্ঘ দিন বাক্যালাপ বন্ধ রেখেছিলেন নির্মলার সঙ্গে। তাতে নির্মলার দিক থেকে অবশ্য কোনো ভাবান্তর ছিল না।

ছোটবেলা ভারি মিষ্টি দেখতে ছিল বাবুনকে। ওর ভালো নাম ছিল অর্চন। অজিতই ওই নাম রেখেছিলেন। খুব চঞ্চল ছিল বাবুন। অজিত মাঝে মাঝেই খুব বিরক্ত হতেন ওর উপর। অজিতের লেখার সময়ই ঝুড়ি ঝুড়ি প্রশ্ন নিয়ে সে হাজির হত। অজিত সে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ওঠার আগেই ছুটে পালিয়ে যেত। কী অদ্ভুত ক্ষমতায় ওকে বশ করেছিল নির্মলা। বাবুনকে ছোট্ট বেলা থেকে কবিতার গল্পের বইয়ের নেশা ধরিয়েছিল ও। বইই শান্ত করল বাবুনকে। কী সুন্দর কবিতা আবৃত্তি করত ছেলেটাএকবার ওদের স্কুলের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলেন অজিত। বাবুন তখন সিক্স না সেভেনে পড়ে। ওই অনুষ্ঠানে একটা ছোট্ট কবিতা আবৃত্তি করেছিল বাবুন। আবৃত্তির শুরুতে বলেছিল যে কবিতাটি ওর মা নির্মলা গুহর লেখা। গাছপালা, জল, পাখপাখালি নিয়ে লেখা একটা মাঝারি মাপের ছবি ছবি কবিতা। মন্দ নয়। কিন্তু মন্দ লেগেছিল অজিতের। নির্মলা কেন ওই অনুষ্ঠানের জন্য বাবুনকে ওই কবিতাটাই শেখাল ? অজিতের কবিতাও তো বাবুন আবৃত্তি করতে পারত। অজিতকে বললে একটা ছোটদের কবিতা কি লিখে দেওয়া যেত না ? নির্মলাকে বাড়ি ফিরে এসে বেশ উষ্মার সঙ্গেই কথাটা বলেছিলেন অজিত। ততোধিক শান্ত ভাবে নির্মলা বলেছিল যে বাবুন কোন অনুষ্ঠানে কোন কবিতা বলবে, সেটা ও নিজেই ঠিক করে। বিভিন্ন কবির প্রচুর কবিতা ওর মুখস্থ। নির্মলা আলাদা করে ওকে কোনো অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুত করে না। অজিত আর কিছু বলেন না। শুধু নির্মলাকে বলে যান ছেলেকে যত রাবিশ কবিতা না শেখাতে। কবিতা অনেক সাবালক হয়েছে এখনফুল পাখি গাছ নদী... এ সব আর চলে না ! রাবিশ !

উফ ! এই কাকগুলো আর পেঁচাটা তো মাথা খারাপ করে দিচ্ছে ! যেমন ডানা ঝটপটানি আর তেমন কর্কশ চিৎকার ! সারা রাত কি এমনটাই চলবে নাকি ?

অজিতদা !’

হ্যাঁ, বলো’

গল্পটা রেডি তো ?’

হ্যাঁ হ্যাঁ...’

তাহলে কাল যাব ?’

কাল না মুক্তেশ। তুমি সামনের সপ্তাহে এসো। আমাকে একটু এডিট করার সময় দাও।‘

অজিতদা, তাহলে আমি পরে আসব। আপনি ভালো করে এডিট করে রাখুন। পরের সংখ্যায় যাবে আপনার গল্পটা’

পরের সংখ্যা ? পরের সংখ্যা তো ছ মাস পরে বেরোবে মুক্তেশ ! আরো দেরিও হতে পারে। আমার গল্পটা তো একেবারে কারেন্ট সময়কে নিয়ে

মুক্তেশ হাজরা যেন হাসি চাপল একটু।

ছ মাস তো খুব দূরের ভবিষ্যৎ নয়, অজিতদা। অসুবিধা হবে না

অসুবিধা হবে না ? কার অসুবিধা হবে না ?’

পাঠকের...’

হবে মুক্তেশ, হবে। আমার গল্পটা একটা সাম্প্রতিক বধূ নির্যাতনের ঘটনাকে নিয়ে...’

তাহলে তো আরও নিশ্চিন্ত অজিতদা। আপনি গুছিয়ে লিখুন। বধূ নির্যাতন পুরোনো হওয়ার বিষয় নয়।’

কিন্তু আমি চাই আমার গল্পটা এই সংখ্যাতেই যাক

আমিও তাই চাই কিন্তু সেক্ষেত্রে ম্যাক্সিমাম পরশুর মধ্যে লেখাটা আমার চাইই আপনার লেখার জন্য গোটা একটা মাস আমরা অপেক্ষা করেছি। আর পারা যাবে না।’ মুক্তেশ ফোন রেখে দেয়।

উত্তেজিত হয়ে বিছানায় উঠে বসেন অজিত গুহ। মুক্তেশ ! শেষ পর্যন্ত মুক্তেশ ! যে মুক্তেশ অজিতের কায়দা করা একটা অটোগ্রাফ পেলে বর্তে যেত ! ওর ‘জললিপি’ পত্রিকাটা একটু নাম করেছে, ব্যস ! সম্পাদকের রোয়াব দেখাচ্ছে ! হাত বাড়িয়ে ফোনটা টেনে নেন অজিত। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করেন মুক্তেশকে... আমি ‘জললিপি’ তে লেখা দিতে অনিচ্ছুক... প্রায় সঙ্গে সঙ্গে টিং করে বেজে ওঠে ফোন। জবাব আসে... আচ্ছা...

আচ্ছা ! আচ্ছা মানে ? ‘জললিপি’র কাছে আর গুরুত্ব রাখেনা অজিত গুহর গল্প ? সন্দীপের কাছে অজিত গুহর উপন্যাস আবর্জনা... ট্র্যাশ ! মন্দিরা কেজো ভাবে কবিতা চায় অজিত গুহর কাছে ! মাত্র একটা বছর ! তার মধ্যেই এত পরিবর্তন ! অজিত উঠে আলো জ্বালেনবাথরুমে যান। চোখে মুখে ভালো করে জল ছেটান। ‘আমার শেষ বইটা যেন কী ?’ নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলেন অজিত। ‘নীল কবিতাগুচ্ছ !’ অজিতের মধ্য থেকেই কে যেন বলে ওঠে আর সঙ্গে সঙ্গে বাইরে শোনা যায় পেঁচাটার তীক্ষ্ণ চিৎকার যেটা অজিতের কানে বাজে নির্মলার অট্টহাসি হয়ে।

নির্মলা আর অট্টহাসি শব্দটা একসঙ্গে যেতেই পারেনা। অট্টহাসি দূরে থাক, কোনো দিন নির্মলাকে জোরে হাসতে শোনেননি অজিত। কিন্তু অজিতের মনে হয় সেদিন একা বাড়িতে দিঘার সমুদ্র তীরে দাঁড়িয়ে থাকা বাবুনের শেষ ছবিটার সামনে ওর প্রিয় চন্দনগন্ধী ধূপ জ্বেলে দিয়ে যখন নিজের হাতের শিরা ব্লেড দিয়ে কেটেছিল নির্মলা, তখন নিশ্চয়ই উন্মাদিনীর মতো হাসছিল ও। যে হাসির শব্দ বাবুনের ফুলে ওঠা, মাছে খুবলোনো মরা শরীরটার সামনে দাঁড়িয়ে জান্তব চিৎকারে কান্নার মতো। স্বপ্নের পুরস্কার জিতে অজিত ফিরে এসে দরজায় কয়েকবার ঘণ্টা বাজিয়েছিলেন। কেউ দরজা খুলে দিতে আসেনি। বাইরে ঠিক এমন ভাবে চিৎকার করে উঠেছিল রাতচরা পেঁচাটা। অজিত খুব বিরক্ত হয়েছিলেন পুষ্প স্তবক, মানপত্র, চেক এবং স্মারক সামলে চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলতে। দরজা খুলেই দেখতে পেয়েছিলেন সারা ঘর ভেসে গেছে রক্তে আর তার মধ্যে যেন ফুলের মতো ফুটে আছে কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ফেলা কবিতার খাতার পাতা। একটা নামই পড়া যাচ্ছে তার মধ্যে... ‘নীলার কবিতা’... যার প্রত্যেকটি কবিতা রয়েছে অজিতের সদ্য পুরস্কারপ্রাপ্ত কবিতা সংকলন ‘নীল কবিতাগুচ্ছ’তে।

শক্ত করে চোখ বন্ধ করে ফেলেন অজিত গুহ। বাইরে থেকে তীক্ষ্ণ স্বরে পেঁচার ডাকটা ঘরের মধ্যে এসে ঢুকে পড়ে।

Tareq Samin é um poeta do Bangladesh, autor e editor, nascido em Tangail, em 1977. É ainda editor e responsável da Revista Literária de Bengali “Sahitto”, e também autor de contos e romances.

É autor da antologia poética “O Poeta Perdido”, que reune 49 poemas; dos contos intitulados “Revolucionários não Violentos” (14 contos) e do romance “Shahrin-Suja’ e também do livro “Poemas escolhidos de tareq samin”, publicado na Índia. Encontra-se também traduzido para inglês, alemão, eslovaco e húngaro.

Os temas centaris da sua obra são a Natureza, o Amor e o Humanismo.

 

Tareq Samin is a Bangladeshi Poet, Author and Editor, born in Tangail, in 1977.  He is the Editor and Publisher of Bengali Literary Magazine ‘Sahitto’.  He also wrote short stories and Novel.

He is the author of the poetry collections ‘The Lost Poet’, a collection of 49 poems, ‘Nonviolent Revolutionaries’ is a collection of 14 Short Stories and  Novel ‘Shahrin-Suja’. Also his book ‘Selected poems of Tareq Samin’ published from India. Some of his poems are translated in English, German, Slovak and Hungarian Languages.

Nature, Love and humanism are central to his work.

 

 

Translated by Rui Cóias

 

  

 

Porque escrevo

 

Quando as pessoas se apaixonam

por algo deste mundo;

Elas vivem para essa chama

elas morrem por isso.

 

Hoje vou desvendar meus pensamentos mais profundos

então mata-me; não me importo!

Pois isso é a morte, quando tu morres bravamente

porque viver cobardemente!

 

Quando tu é o escolhido

para isto.

Então não receies nada

pois condidera-te abençaodo por Deus.

 

Quando tens uma paix~\ao

porquê viver temendo, ó alma!

vive para ela

ou morre por ela

Que mais podias ser

sem ela?

Why I write

 

When people fall in love

with something in this world.

They live for that burden

They die for that.

 

Today I will unveil my deepest thoughts 

Slay me; I do not care!

Death is that, when you die bravely

Why live a cowardice life!

 

When you are the chosen one 

for this.

Do not be fearful of anything

Consider it a God gifted blessing.

 

When you have a passion

why frightened, O soul!

live for it

Or die for it

What else you could be

without it?

Exílio

 

Tantas mulheres belas

Têm os homens para lhes segurar a mão

Têm os homens para as beijar

Têm os homens que as amam

Eu contudo não sou ninguém

numa terra de ninguém. 

 

Life in Expatriation

 

So many beautiful women

Have their men to hold their hand

Have their men to kiss them

Have their men to love them

I am no one’s man

-in a no-mans-land.

 
 

Mensagem da alma

 

Tu és humano,

o mundo inteiro é a tua casa,

não importa a raça, religião ou etnia

todos os homens são irmãos,

tua religião é a humanidade.

 

Tu humano

filho de Deus

através do mundo vês teus templos

tu és o amante do amor.

 

Amor, compaixão e afeição estão onde

lá tu estarás.

Ódio, orgulho e

pensamentos de degradação

habitam também o teu coração;

Porém, não os acarinhes

(Tu) reina neles.

 

Message Of the Soul

 

You're a human,

The whole world is your homeland,

Regardless of race, religion and ethnicity

All human are relatives,

Your religion is humanity.

 

Thou human,

Gods representative

Throughout the world is your temples

You are the worshipper of love.

 

Love compassion affection are where

be there.

Hatred, pride and

pollution spreading thoughts

those are in your heart too;

However, do not cherish those

(You) reign them.

 
   

 

Page 8 of 19

লেখা পাঠাবার নিয়ম

মৌলিক লেখা হতে হবে।

নির্ভুল বানান ও ইউনিকোড বাংলায় টাইপকৃত হতে হবে।

অনুবাদ এর ক্ষেত্রে মুল লেখকের নাম ও সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি দিতে হবে।

আরো দিতে পারেন

লেখকের ছবি।

সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি।

বিষয় বস্তুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অঙ্কন চিত্র বা ছবি। 

সম্পাদক | Editor

তারিক সামিন

Tareq Samin

This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

 

লেখা পাঠাবার জন্য

ইমেইল:

This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

 

We use cookies to improve our website. Cookies used for the essential operation of this site have already been set. For more information visit our Cookie policy. I accept cookies from this site. Agree