Tareq Samin Ten Short Story

Tareq Samin Ten Short Story (7)

দশ গল্প - তারিক সামিন

[ এই গল্পটি হিন্দু উগ্রপন্থীদের দ্বারা নিহত ভারতীয় সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশ ও লেখক এম এম কালবুর্গীকে উৎসর্গকৃত - তারিক সামিন। ] 

 

বিপ্লবী চুনি লাল দত্তের বাড়ী চট্টগ্রামের পাহারপুড়ে। অবিভক্ত ভারতীয় উপ-মহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে অসংখ্যবার জেল খেটেছেন। অহিংস আন্দোলনে মহাত্মা গান্ধী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের অনুসারী ছিলেন। বেতের সোফার উপর পা তুলে, আরাম করে বসে, কথা বলছিলেন তিনিঃ-

“সময়টা ১৯১৩ সাল। আমি তখন কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের শেষ বর্ষের ছাত্র। আমার ভাইয়ের মেয়ে ‘ইন্দু’র নয় বৎসর বয়সে বিয়ে হলো। ইন্দু তখনও নাবালিকা, দেখতে পাতলা গরনের, মাথায় খাটো চুল, মুখটা শিশু সুলভ, আচরণেও শিশু।

আমাকে বলতো, ‘ছোট কাকু আমার পুতুলের বিয়ে। কলকাতা থেকে শাড়ী কিনে এনো পুতুলের জন্যে।’

ওর ছবি আকার দারুন ঝোক। মাটিতে, গাছের পাতায়, কাগজে সুন্দর সব ছবি আঁকে সে।

বিয়েতে ব্যাপক উৎসব হল। আলোক বাতি আর পটকার শব্দ, অতিথির শোরগোল আর দাদা-বৌদির ব্যস্ততা। আমি অনেকটা হতভম্ভের মতো, যা বলা হচ্ছে, তাই করছি। বাল্যবিবাহ তখনকার সামাজিক রীতি। আবহমান কাল থেকে তা হয়ে আসছে।

আমাদের পরিবার গোড়া ব্রাহ্মণ। শাস্ত্রের একটু নড়চড় হলে, তা নিয়ে লংকা কান্ড বাধে। কৈশোরে আমিও সনাতন হিন্দু ধর্মের মহত্ব ও আদর্শ রক্ষায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলাম। যৌবনের শুরুতে গল্প, উপন্যাস, কবিতা, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, ইতিহাস, রাজনীতি, দর্শন। মানে যা বই পেতাম, তাই পড়তাম। পড়তে পড়তে নিজের ভেতর একটা আত্ম-দর্শন, মানব ধর্ম জেগে উঠলো। আস্তে আস্তে নিজের, সমাজের দুর্বল দিকগুলো চোখে ফুটে উঠলো।

বাল্য বিবাহটা আমার কাছে নোংরামি মনেহয়। একটা শিশু তার আবার বিয়ে, সংসার, দাম্পত্য জীবন! ইন্দু আমার নিজের মেয়ে নয়, উপরন্ত বিষয় সম্পত্তি দাদা, মানে আমার বড় ভাই দেখা শোনা করে। আমার পড়ার খরচ চালায়। তাদের উপর কথা বলা চলে না।

রাগে, অভিমানে কলকাতা ফিরে এলাম। মনের মধ্য শুধু একটা কচি মুখ। পুতুলের দোকানের সামনে দিয়ে গেলে বুকটা ব্যাথায় টনটন করে উঠতো ।

এমন সময় চিঠি এলো, মাদ্রাজ যেতে হবে পার্টির কাজে।

 

মাদ্রাজ থেকে দু'শো মাইল দুরে ‘পেরামবুর’ একটি গ্রাম। ওখানকার মানুষের গায়ের রং আমাদের বাঙ্গালীদের থেকে বেশ কালো। গ্রামে আদিবাসী আর কিছু হিন্দু পরিবারের বসবাস। তখনও সেখানকার নারীরা উর্ধ্ব-অঙ্গে কোন কাপড় পড়তো না।

গ্রামের বেশীর ভাগ বাড়ীই খড় বা মাটির তৈরী। সারি-সারি নারিকেল গাছ। বন, ঝোপ-জঙ্গল, চারিদিকে সবুজের সমারোহ। পুকুর, নদী-নালাও প্রচুর। প্রথম দর্শনেই গ্রামটা খুব ভালো লাগলো।

আমরা চারজন, আমি, আমার বন্ধু সত্যানন্দ, মুকুর রায় আর সারাভানান।

সারাভানান মাদ্রাজের ছেলে। তখন ওর বয়স ২৮ বৎসর। কৃষ্ণ বর্ণ, মাঝারী উচ্চতা, মোটা পেটানো শরীর, কালো কোঁকরানো চুল। হেসে হেসে ইংরেজীতে কথা বলতো সে । হিন্দি বা বাঙলা জানতো না। মাদ্রাজ মেডিকেল কলেজের ডাক্তার। তার অনুরোধেই সেখানে যাওয়া। সারাভানান পার্টির মাধমে আমাদের ডেকেছে, উদ্দেশ্য সহমরণ বন্ধ করা।

গ্রামের মানুষগুলোকে দেখে খুব বদরাগী মনে হলো। তাদের বিশাল বপু শরীর, মোটা ভুরু, চওড়া কাধঁ । উচ্চ স্বরে কথার ধরণ দেখে কিছুটা আতঙ্ক হল। কিন্তু সারাভানান এর ডাক্তার হিসাবে খুব সুনাম। দুর-দুরান্তে অনেকেই তাকে চেনে । আমরা অবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মী। তাই ব্রিটিশ উপনৈবেশিক প্রশাসন বা পুলিশের সাহায্য পাওয়া দূরহ।

সারাভানানকে বললাম, ‘আমাদের স্থানীয় মানুষের সাহায্যে নিয়েই এগুতে হবে’।

সারাভানান বললো, ‘স্থানীয় যুবকেরা অশিক্ষিত, কুশিক্ষিত, কুসংস্কার আচ্ছন্ন’।

আমি বললাম, ‘কৈশোরে আমিও সেরকমই ছিলাম। এদের আঘাত করে নয়। ভালবেসে পরিবর্তন করতে হবে।’

আমাদের অপর সহযোদ্ধা-বন্ধু মকুল রায়। তরুণ ব্যারিষ্টার। বিলাত ফেরত উকিল। সে বললো, ‘ভারতীয় উপমহাদেশই বলো, আর ইউরোপ, আমেরিকা যাই বলো। যে কোন সমাজে গোঁড়ামির বিরুদ্ধে কথা বলা আর গোখরা সাপের ন্যাজ দিয়ে কান চুলকানো একই কথা’

সত্যানন্দ বললো- ‘সহমরন কিন্তু হিন্দু ধর্মের অবিছেদ্দ অঙ্গ। কেউ স্বেচ্ছায় সে পথ বেছে নিলে, তাতে বাধা দিলে পরিনতি কি হয়, সে আমি জানি!’

তারপর সে আমাদের যে গল্প শোনালো তা মনে হলে, এখনো গায়ে কাটা দেয়।

সত্যানন্দ বলেছিলঃ ‘১৮৯৬ সাল। আমর তখন বয়স নয় বৎসর। সে সময়, একবার সতীদাহ দেখতে গিয়েছিলাম। যে মেয়েটি সহ-মরণে রাজী হয়েছিল। তার বয়স উনিশ-কুড়ি হবে। গোলগাল চেহারা, গায়ের রং ফর্সা, মাঝারী উচ্চতা, ভরাট শরীর। বড় বড় টানা টানা চোখ। মাথা ভরা কালো ঘন চুল। সিঁথিতে সিঁদুর, গায়ে গহনা, হাতে সোনার বালা, গলায় হার, পায়ে আলতা। ঠিক নতুন বউয়ের মত দেখতে।

একটা কাঠের খাটিয়ায় বসে পুরোহিত মন্ত্র পড়ছিল। পাশেই মেয়েটির স্বামীর মৃত দেহ। বেটা জমিদার ছিল। ৫৯ বছর বয়সে মারা যায়। মেয়েটির বিয়ে হয়েছিল দশ বছর আগে। জমিদার লম্পট স্বভাবের ছিলেন। বহু রোগে ভূগছিলেন। গ্রামে রটেছিল সে গনোরিয়া আক্রান্ত। এমন পুরুষের অমন অপরূপ স্ত্রী। তাও তাকে জীবন্ত পোড়ানো হবে। ভেবে তখনই অবাক হচ্ছিলাম আমি।

দুটি খাটিয়া। একটিতে মৃত জমিদার, অন্যটিতে তার রূপসী স্ত্রী। খাটিয়া দু’টি তুলে আট-দশ জন যুবক গ্রামের পথ ধরে নদীর পাড়ে, বিশাল অশ্বথ গাছের নীচের শশ্মান ঘাটের দিকে চললো। তারপর মেয়েটিকে পুকুর পাড়ে গোসল করিয়ে; একটু আড়াল করে সাদা বিধবার কাপড় পড়ানো হল।

দু’টি কাঠের স্তূপ। পাশে জ্বালানি তৈল, ঘি, চন্দন কাঠ আরো বিবিধ বস্তু। শ্মশান বেদীতে উঠার সিড়িটা কাঠের তৈরী, উচু মাচার মতো,  সামনে পর্দা দেওয়া। আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলে, পর্দা সরিয়ে মেয়েটি তাতে ঝাপ দিল। তার ভয়ার্ত চেহারা! আগুনের লেলিহান শিখা মুহুর্তে গ্রাস করলো তাকে। কিছু লোক দ্র্বত তার দেহের উপর ভারী ভারী কাঠ চাপিয়ে, তাতে জোড়ে জোড়ে আঘাত করতে লাগলো। তাদের লাঠিতে রক্তের চিহ্ন। আমার মনে হল ঢাকের শব্দে আর পুরহিতের উচ্চারিত সুলোলিত মন্ত্রের মোহে কেউ মেয়েটির চিৎকার শুনতে পেল না।

আমি মূহুর্তে জ্ঞান হারালাম ।

তারপর মুখে ভাত তুলতে পারিনি অনেক দিন। সে কথা মনে হলেই বমি করতাম।

বলে একটু থামলো সত্যানন্দ। তার চেহারায় তখন দারুণ বিষন্নতা দেখে, আমরা সবাই চুপ করে ছিলাম। সত্যানন্দ ফের বললো, ‘এরপর একজন যুবক যুক্তি দিয়ে সমাজ পতিদের কাছে সতিদাহ বন্ধের আকুল আবেদন জানালো। ধর্ম অবমানোনার দায়ে সেই যুবকে প্রকাশ্য পিটিয়ে হত্যা করলো গ্রামবাসী। পুলিশ এসে তার মৃত দেহ সৎকারের বাবস্থা আর দোষীদের গ্রেফতার করাতে, ভীষন মারামারি বাধে সে বার। পুলিশের গুলিতে যে তিনজন মারা গেল। তাদের বীরের মত সৎকার করলো গ্রামবাসী। দুর-দুরান্ত থেকে হাজার হাজার লোক আসে, সেই শহীদের শ্রদ্ধা জানাতে! 

আর হতভাগ্য সেই যুবক, যে সতি-দাহ বন্ধের অনুরোধ জানিয়েছিল। তার মৃতদেহ গ্রহনে অস্বীকৃতি জানায় তার পরিবার।’ এই ঘটনা শোনার পর, সে রাতে আমাদের চারজনের কারোই ঘুম হল না।

 

সকাল বেলা সারাভানানকে বললাম, গ্রামের কর্তা ব্যাক্তিদের সাথে আলোচনা চালিয়ে যেতে।

মুকুল রায়, সারাভানানকে বললো, ‘সর্তক থেকো! মূর্খ, র্নিবোধ ও কুসংস্কারপন্থীরা,  পরকালে স্বর্গের লোভে এহেন হীন কোন কাজ নেই, যা করতে পারে না। কিন্তু প্রকৃত র্ধামিক কখনো ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি করে না। আর দৃঢ় বিশ্বাস রেখো, ইশ্বর কখনোই সত্যাআশ্রয়ীদের পরাজিত করেন না।’

আমি কায়মনে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলাম আমাদের সাহায্য করার জন্য। ঘন্টা দুয়েক পরে সারাভানান এলো মন ভারী করে। গ্রামের লোক সতিদাহ বন্ধে আগ্রহী নয়। অগ্যতা, মন খারাপ করে বসে রইলাম সবাই।

পরদিন সকালে সারাভানানের পরিচিত এক পল্লী চিকিৎসক, আমাদের তার নৌকায় ভ্রমনের প্রস্তাব দিল। মন চাঙ্গা করতে সবাই একসাথে বেড়িয়ে পরলাম তার সঙ্গে।

গ্রামের পথ ধরে কিছু দুর এগুলেই নদী। নদীর তীরে দেখা মিলল অপূর্ব সুন্দর নৌকার। লম্বায় প্রায় ত্রিশ ফুট। আমাদের গ্রাম বাংলায় বড় মালবাহী গুদারা নৌকার সমান, দোতলা; সুন্দর দরজা জানালা তাতে। পুরোটাই কাঠ আর বেতের তৈরী। ভেতরটা পালিশ করা চকচকে। ঠিক যেন একটা রাজ হাঁস ভেসে বেড়াচ্ছে পানির উপর। ভিতরে শোবার, গোসল করার সব বাবস্থাই আছে। নৌকার জানালায় বসে ছিপ দিয়ে মাছ ধরলাম আমি আর সারাভানান। কেটে-বেছে, বাহারি সব মসলা আর নারিকেল দুধ দিয়ে রান্না হলো,। সাদা ভাত, নারিকেল দিয়ে গলদা চিংড়ি আর আমাদের ধরা মাছ ভাজা দিয়ে, ভালই খেল সবাই। আড্ডা, গান-বাজনা হলো। সন্ধ্যায় ফিরলাম আমরা।

নদীর ঘাঠে দেখা হলো গ্রামের পঞ্চায়েত প্রধান ভেন্‌কটেশ লিংগেস সারানের সাথে। লম্বা স্বাস্থ্যবান পুরুষ। প্রশস্ত গ্রীবা ও কাধের অধিকারী। তার কপালে তিনটে সাদা চুনের দাগ, হাতে বালা, মোটা গোঁফ, ভূরু আর কোকরানো চুল। সাদা শাট, সাদা লুঙ্গি হাটুর উপর অর্ধেক ভাজ করে পরা । এবার, অত্যন্ত বিনীত ভাবে সারাভানানের সঙ্গে কথা বলেছিল সে। সারাভানান আমাদের জানালো পঞ্চায়েত প্রধান ভেক্টেশনের এক ছেলে, এক মেয়ে। মেয়েটি ছোট, বয়স সাত। ভীষণ অসুস্থ। তাই পঞ্চায়েত প্রধানের সঙ্গে শিশুটির চিকিৎসার জন্য তাকে গ্রামে যেতে হবে । গ্রাম্য ডাক্তার নিশানতন, এতক্ষণ আমরা যার অতিথি ছিলাম; সেও চললো তার সাথে। ঘাঠের কাছেই গরুর গাড়ী বাধা ছিল,গরুর গাড়ীতে উঠে বসলো সবাই। সারাভানানকে একা ছাড়তে মন চাইছিল না। আমরা সবাই যেতে চাইলাম। কিন্তু  সেই বারন করলো।

সারাভানান সে রাতে ফিরলো না। কেউ কোনও সংবাদও নিয়ে এলো না। অজানা আশংঙ্কায় আমরা সবাই উদ্বিগ্নের মধ্যে রইলাম ।

 

সকালে সারাভানান আর তার কমপাউন্ডার কাম পল্লী চিকিৎসক নিশানতন ফিরলো। চোখে-মুখে রাত জাগায় ক্লান্তি। জানা গেল, পঞ্চায়েত প্রধানের মেয়ের পেটের অসুখ, বমি আর জ্বর ছিল। বার বার জ্ঞান হারাচ্ছিল মেয়েটি। সম্ভবত ফুড পয়জনিং। এখনো দুর্বল। তবে দ্র্বত সেরে উঠছে মেয়েটি। এর আগে একই অসুস্থতায় পঞ্চায়েত প্রধানের আরেকটি মেয়ে মারা যায়। গ্রামের বৈদ্য-ওঝারা ভূত ধরার চিকিৎসা দিয়ে, নির্মম ভাবে পেটায় ছোট মেয়েটিকে, দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো সারাভানান।

এক মহৎ চিকিৎসকের  ক্লান্তিহীন মানবসেবা, আন্দোলিত করলো আমার হৃদয়।

বিকালে পঞ্চায়েত প্রধান আরো পনের-বিশজন লোক নিয়ে এসে, খুশি মনে জানালো,  সতিদাহ প্রথা বন্ধ করতে রাজী হয়েছে গ্রামের সব কর্তা ব্যক্তিরা। একখানা স্কুল আর হাসপাতাল স্থাপনে সারাভানান আর আমাদের সাহায্য কামনা করলো তারা।

খুশি আর আবেগে সবাই সবাইকে জড়িয়ে ধরলাম আমরা।

এখন ১৯৬৬ সাল। ৭৮ বৎসরের জীবনে অহিংস আন্দোলনের সেই রকম আনন্দ আর দ্বিতীয় পাইনি।” বলে একটু সবার দিকে চোখ বুলালেন মহান এই বিপ্লবী। একটু উদার গলায় বললেন, ”অস্ত্র দিয়ে সব লড়াই হয় না আবার কিছু লড়াই অস্ত্র ছাড়া জেতা যায় না। জীবনে মাঝে মাঝে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়। কতদুর এসেছি আমরা। বিজ্ঞান আর শিল্প-সাহিত্যের অগ্রগতি কিভাবে পরিবর্তন এনেছে আমাদের মনে। এখন আর সংক্রামক রোগ যক্ষ্মা, বসন্ত, ম্যালেরিয়ায় মারা যায় না লক্ষ লক্ষ মানুষ। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে যোগাযোগ হচ্ছে। বাল্য বিবাহ, বহু বিবাহ আর সহ মরণ বিলুপ্ত হয়েছে। তবুও মানুষের চরিত্র এই, সে নতুনত্বে ভয় পায়। চারিদিকে কুসংস্কারের শক্ত বর্ম তৈরী করে, পরিবর্তনকে উপেক্ষা করতে চায় সে। একমাত্র সু-শিক্ষাই পারে আলোকিত মানুষ তৈরী করতে। ডাঃ সারাভানানদের তৈরী করতে।”

 

 

ছবি : ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত

 

-তারিক সামিন।

 

জন অ্যাডামস। বয়স ৩০ বৎসর। দীর্ঘকায় শরীর হালকা পাতলা গড়ন। মাথা ভরা সোনালী চুল। লম্বাটে মুখমণ্ডল। লালচে-সাদা গায়ের রং। সবুজ রং এর চোখ তীক্ষ্ণ চোখা নাক। হাফ হাতা জামা, জিন্স প্যান্ট, আর বুট জুতা পরে থাকে বেশির ভাগ সময়।

কারো সাথে দেখা হলেইআসসালামু-আলাইকুমবলে মিষ্টি হেসে করমর্দন এর জন্য হাত বাড়ায় সে। অদ্ভুত শিশুসুলভ তার বাংলা বলার ধরন। জন এদেশে এসেছে আট মাস। এরই মধ্যে এই দেশটিকে আর এদেশের মানুষগুলোকে দারুণ ভাল লাগতে শুরু করেছে তার।

কখনো কখনো তাকে দেখা যায় গ্রামের পথে আম-কাঁঠালের ডাল ভেঙ্গে গরু-ছাগলের বাচ্চাগুলোকে খাওয়াচ্ছে। সাইকেল চালিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাচ্ছে। কখনো অসুস্থ শিশুদের পাশে দাড়িয়ে তাদের মাথায় হাত বুলায়। পরিবার পরিজন কে সান্ত্বনা দেয়। গামছা কাঁধে পুকুরে গোসল করতে যায়।

এদেশের ইলিশ মাছ ভাজা, ভুনা খিচুরি আর দেশী মুরগীর মাংসের ঝোল তার দারুণ পছন্দ। এরই মধ্য সে শিখে ফেলেছে চামচ ছাড়াও, হাত দিয়ে, সুন্দর পরিচ্ছন্ন ভাবে খাবার খাওয়া যায়।

জন একটি আন্তর্জাতিক এন.জি. অফিসের প্রোগ্রাম ম্যানেজার। স্বাস্থ্য জনসংখ্যার উপর গবেষণা আর্থিক সাহায্য দেয় তাদের প্রতিষ্ঠান। প্রায়শই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত সংগ্রহে ঘুরে বেড়ায় সে।

দেড় মাস হলো, বগুড়া সরকারী হেলথ কমপ্লেক্সে মেডিকেল অফিসার হিসাবে কাজ করছে লিজা। ওর পুরো নামক সালেহা পারভিন লিজা। মাঝারী উচ্চতা, গায়ের রং শ্যামলা। খুব হাসি-খুশি আর সপ্রতিভ মেয়েটি। একটা কালো আর সবুজ রং এর ঢাকাই জামদানী; তার উপর সাদা অ্যাপ্রোন পড়ে রোগী দেখছিল লিজা। এদেশের শ্যামল বরন মেয়েদের চোখে-মুখে সবুজ ফসলের মাঠের মত স্নিগ্ধতা থাকে। এদের হাসি নদীর ঢেউয়ের মত আন্দোলিত করে জীবনকে। লিজার মত একটি মেয়েকে বিয়ে করে এদেশে থেকে যাবার ইচ্ছে জনের।

গণতান্ত্রিক সুশাসন, ন্যায় বিচার, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্নীতি রোধ এবং সমাজ ধর্মীয় কুসংস্কার মুক্ত হলে, বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ জাতি হয়ে উঠবে ...... এসব ভাবতে ভাবতে গ্রামের পথ ধরে অফিসে যাচ্ছিলো জন।

হঠাৎ একটা মটর সাইকেল থেকে তিনজন যুবক খুব দ্রুত নেমে আসলো জনের দিকে। প্রথম আগুন্তক যুবকে দেখে হাস্যজ্জল মুখে জন বললো, ‘আসসালামু-আলাইকুম, কেমন আছেন?’

আল্লাহু আকবরবলে, নির্মম নির্দয় ভাবে জনের মাথা, হাত আর কাঁধে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে পালিয়ে গেল যুবক-ত্রয়।

 

[ এই গল্পটি বাংলাদেশে উগ্রপন্থীদের দ্বারা নিহত সকল বিদেশী নাগরিকদের স্মৃতির প্রতি উৎসর্গীকৃত। ]

 

*পুনঃ প্রকাশিতঃ প্রথম প্রকাশ ১৯ নভেম্বর‘ ২০১৮

 

 

 

-তারিক সামিন

 

মশার বীরত্ব ও শৌর্য-বীর্যের কাহিনী অতি পুরাতন। এই সামান্য(?) মশার কাছেই পরম শক্তিমান নমরুদ পরাস্ত হয়ে ইহলোক ত্যাগ করেছিলেন।

রক্ত পিপাসু আর কানের কাছে ভন্‌-ভন্‌ শব্দে বিরক্ত উদগ্রীবকারী এই প্রাণীটি, আমার কাছে অসহ্য! লোকে বলে, ‘যেথা বাঘের ভয়, সেথা রাত্রি হয়’। সেই জন্যই মশার প্রাতরাশ, মধ্যাহ্ন ভোজ বা রাত্রিকালীন আহার, সর্বত্র আমার রক্ত তাদের প্রিয়।

চীনা জাতি সত্যই বড় মানব হিতৈষী। তা না হলে আমার মত সামান্য লেখকের এত বড় উপকার করবে কেন? যেখানে যাই, বসি-দাড়াই-ঘুমাই সর্বত্র আমার সঙ্গী চায়নার তৈরি একখানা ব্যাডমিন্টন ব্যাট। ভাবছেন আমি খুব ভাল ব্যাডমিন্টন খেলি! আজ্ঞে মোটেও না। আসলে ব্যাটখানা মশার মরণাস্ত্র। আস্ত একখানা কামান। মুড়ি ভাজার মত ফট্‌-ফট্‌ শব্দে মশার দগ্ধ-অর্ধদগ্ধ দেহ সৎকার হয় এই মহান যন্ত্রের সাহায্যে। মশা মারতে এই কামানের জুরি-মেলা-ভার। সকাল-সন্ধ্যা মশা মারতে কামান দাগাই আমার এখন মুখ্য কাজ। লেখা-লেখি গৌণ, মাঝে মাঝে নগণ্য।

মশার জীবন চক্র বড়ই কৌতূহল উদ্দীপক! মাত্র দিন সাতেক আয়ু, এর মধ্যই অগণিত বংশ বিস্তার করে। এদের জীবনে আর কোন ভাল কাজ নেই! ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু আরো সব প্রাণঘাতী রোগ সৃষ্টি করে, জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি অন্যের ক্ষতি করাই এ জীবের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

বিজ্ঞানী ডারউইন সাহেবের দাবী মানুষের পূর্ব পুরুষ বানর ছিল। কিন্তু একালের কতিপয় মানব সন্তানের কর্মকাণ্ড দেখে আমার উর্বর মস্তিষ্কে এখন এ ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে। তাহাদের পূর্ব-পুরুষগন মশা হইতে বিবর্তিত হয়ে নিশ্চয় মানুষ হয়েছে!!!

বুঝলেন না! একটু বুঝিয়ে বলি। ধরুন, আপনি যদি আপনার শরীরের সমস্ত রক্ত মশাদের অনায়াসে খেতে দেন; এরা সানন্দে পুরোটাই শুষে নেবে। আপনি মরলেন কি বাঁচলেন তাতে এদের কি! মানুষের মধ্যে দুর্নীতিবাজ ও ঘুষখোর সম্প্রদায়য়ের লোকেরাও ঠিক তেমনি। দেশ ধ্বংস হয়ে যাক, মানুষ না খেয়ে মরে যাক, এদের শোষণ বন্ধ হয় কি?

দু’বেলা না খেয়ে আছেন বললে, সরকারি অফিসের কর্তা ঘুষ না খেয়ে ফাইল ছেড়ে দেবে কি?

পরিবারে আয় করার দ্বিতীয় কেউ নেই, এটা শোনার পরও মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করা পুলিশের মনে কোন দিন কোন দয়া হয়েছে কি?

তাছাড়া মশারা যেমন দলবেঁধে চলে, দুর্নীতিবাজ-ঘুষখোরেরা তেমনি দলবদ্ধ। রাজনীতিবিদ, আমলা, সামরিক-বেসামরিক সরকারী কর্মকর্তা- কর্মচারী, লেখক-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী সকলের মধ্যেই ওই নিরীহের রক্ত চোষায় আসক্ত শ্রেনীর মানুষ লুকিয়ে আছে। নিপীড়িতের রক্ত শোষণ না করে এরা সমাজে বেঁচে থাকতে পেড়েছে কখনো?

অপরদিকে দেখুন, মশা যেমনি আমাদের বিশুদ্ধ রক্ত শোষণ করে; বিনিময়ে আমাদের শরীরে প্রাণঘাতী সব রোগ-জীবাণু ঢুকিয়ে দেয়। দুর্নীতিবাজ-ঘুষখোরেরা তেমনি আমাদের অর্থ-বিত্ত লুট করে আমাদের খাবারে বিষ, ওষুধ ও চিকিৎসায় ভেজাল, বিচারে অবিচার, শিক্ষায় প্রশ্ন ফাসঁ ও বিকৃত রুচির পাঠ্য পুস্তক প্রণয়ন এর মতো জঘন্য কাজগুলো করে।

সব অপকর্মের পরও মশা যেমন বুক উঁচু করে কানের কাছে ভন্‌ ভন্‌ করে; দুর্নীতিবাজ-ঘুষখোরেরা তেমনি টেলিভিশনে, পত্র-পত্রিকায় উঁচু গলায় কথা বলে।

এই পৃথিবীতে যত মানুষ মারা যায়; তার মধ্যে সবচাইতে বেশী মারা যায় মশার কামড়ে। পৃথিবী জুড়ে বছরে সাত লক্ষের বেশি মানুষ মারা যায় শুধু মশার কামড়ে। দ্বিতীয় বৃহত্তর মানুষ হন্তা-কারক মানুষ নিজে, অর্থৎ মানুষের হাতে মানুষ মরে আরো প্রায় সাত লক্ষ। বাঘ-সিংহ মানুষ হত্যা করে বছরে বড় জোর শ-দুইশো।

এতসব বিশদ গবেষণার পর, দুর্নীতিবাজ-ঘুষখোরদের পূর্ব-পুরুষগন মশা হইতে বিবর্তিত হয়ে মানুষ হয়েছে, এ নিয়ে আমার লেখা বিশাল একখানা বই প্রকাশের অপেক্ষায় আছে। বিজ্ঞানী আইনস্টাইন সাহেব ভুমিকা লিখছেন এবং প্রুফ দেখছেন স্বয়ং কবি গুরু রবিন্দ্রনাথ!

পরিশেষে আরো আনন্দের সাথে জানাচ্ছি যে, আমার এই আবিষ্কার জনপ্রিয় ‘সায়েন্স’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। আশাকরি, এই মহান আবিষ্কারের জন্য ‘নোবেল পুরস্কার কমিটি’ আগামী বছর আমাকে বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার প্রদান করিয়া ধন্য হইবেন।

তারিক সামিন।

 

()

তিনি সরকারী অফিসের একজন পিয়ন। তার সামনের চেয়ারে বসে আছি প্রায় দুই ঘণ্টা। তিনি টেবিলের নিচে পা ছড়িয়ে, শরীর এলেয়ে বসে আছেন। তার চোখ দুটো বন্ধ। মনে হচ্ছে মহাজাগতিক কোন ধ্যানে ব্যস্ত।

তবুও ভীরু মনে সাহস করে একবার ডাকলাম, ‘রাজু ভাই, আমার ফাইলটার কি খবর?’

দুর মিয়া বিরক্ত করেন নাতো, স্যার নাই, সই হয় নাই। অন্য দিন আসেন। রোজা রাইখা মানুষের এতো প্যাঁচাল ভাল লাগে না।

তারপর ধমক দিয়ে বললেন, ”টাকা ছাড়া সরকারী অফিসে কোন কাজ হয় না। যান! অযথা ঘুর ঘুর করে লাভ নাই।

খুব কাছের টেবিলে বসে আছেন রাজু ভাইয়ের সহকারী। তিনি আমার কানে কানে ফের বললেন, ”মাত্র ত্রিশ হাজার টাকা! এত কষ্ট করে বারবার আসার কি দরকার?”

হ্যাঁ অনেক কষ্ট করেছি, গত কয়েক মাস ধরে সুপ্রিম কোটের উল্টো দিকে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের হেড অফিস থেকে মিরপুর দুই নম্বরে নির্বাহী প্রকৌশলীর অফিস ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে গেছি। সর্বত্র সীমাহীন দুর্নীতি ঘুষের কারবার। যেখানে যাই সেখানেই একই কথা, ঘুষ ছাড়া সরকারী অফিসে কোন কাজ হয় না।

 

রাজু ভাইয়ের পাশের টেবিলের যুবক কম্পিউটার অপারেটর। বেশ লম্বা-চওড়া স্বাস্থ্যবান মানুষ। আমার কাছে আপাতত মহামানব এর ন্যায় মূল্যবান মানুষ রাজু ভাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ’রাজু ভাই চলেন থাইল্যান্ড যাই। থাই মেয়ে গুলার নরম হাতে; দিনে দুই বার করে এক সপ্তাহ ম্যাসেজ নিয়ে আসেন, শরীরের ম্যাজ-ম্যাজানীটা কেটে যাবে।

দুর মিয়া আর দুঃখ বাড়ায়ে নাতো! সারা দিন দোকান খুইলা বসে আছি, কাস্টমার নাই। টাকা না হলে থাইল্যান্ড যাবো কি দিয়া!, ঘরের পুরাণ বউ দিয়াই চালাতে হবেবলে রোমান্টিক একটা হাসি দিলেন তিনি।

রোজার মাস না, তবুও তিনি নফল রোজা রেখেছেন, এমন ভাল মানুষের মুখে এমন কথা শুনে সত্যই খুব আশ্চর্য হলাম।

অবশ্য এমন সব ভাল মানুষের দেখা গত কয়েক মাস ধরে অহরহ হচ্ছে। সব চেয়ে বেশি দেখেছি রোজার মাসে। তখন সরকারি অফিসে ঘুষের রেট বেড়ে যায়। নামায় পড়ে এসে টুপি খুলে বলবে, ’সামনে ঈদ, টাকা বেশি দিতে হবে, আগের রেটে কাজ হবে না। নইলে ঈদের পরে আসেন।

ঘুষ দুর্নীতিবাজদের মতো জঘন্য পাপাচারী কিছু মানুষ যখন ধর্ম সৃষ্টিকর্তার নামকে ব্যবহার করে নিজেদের অপকর্ম আড়াল করে, তখন মনটা শিউরে উঠে!

 

 

( )

ত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে দিলে, সুড়ত করে কাজটা হয়ে যাবে, জানি। তবুও আমি দেব না। আমি দেখতে চাই, এদেশের দুর্নীতির বীভৎস রূপ। লেখক হিসেবে, আমি জানতে চাই, কি রকম দুঃখে বা সুখে আছে এদেশের মানুষ।

জীবনে বহু বার সরকারী অফিস গুলোতে ঘুরে ঘুরে আমি জীবনকে গভীরভাবে বুঝতে শিখেছি। আমারই মতো, অন্য সব মানুষের মতোই দেখেতে অথচ কি নিচু, লোভী অসৎ মানুষ এরা। এদের সীমাহীন দুর্নীতি শোষণ আজ পাকিস্তানী বা ব্রিটিশ উপনিবেশিক শোষণকেও হার মানিয়েছে।

 

ন্যাশনাল হাউজিং অথরিটি, বাংলায় জাতিয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, সংক্ষেপে সবাই বলে হাউজিং। এখানে দৈাড়াচ্ছি বাড়ির রেজিস্ট্রেশন করতে। বৈধ মালিকানা কাগজপত্র থাকার পরও ঘুষের হিসেবে পাঁচ লাখ থেকে সাত লাখ লাগবে।

একজন মানুষ কিছুটা ব্যতিক্রম পেয়েছিলাম, তিনি আমার ফাইলের রিসিভার ডেপুটি ডিরেক্টর এর পি.এস। প্রথম প্রথম বেশ কয়েক দিন ঘুরালেন। তারপর বললেন, ”বুঝছি কবি সাব। আপনার টাকা নাই, ঠিক আছে, আমি আমার কাজ টুকু করে দিমু। আপনি দৌড়ে দৌড়ে বাকি কাজটা করে নেন। এখানে টাকা না দিলে ফাইল হাজার বছরেও নড়ে না। তবুও, আপনার জন্য আমি এইটুকু করবো।ভদ্রলোক পদ মর্যাদায় একজন পিয়ন। চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী। এখানে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর সবারই কম বেশি অঢেল সম্পদ।

বাংলাদেশে সরকারী অফিসে ঘুষের রেট বাধা।

আশেপাশের পিয়নরা চিৎকার করে উঠতো, ”তুই আর দেশী মানুষ, আর কাছ থন দশ হাজার টিহা নিলি, হেতেরে মাগনা দিলি কেন?”

ভদ্র লোক বলতো, ”আমার ইচ্ছা! ভাই একজন কবি মানুষ, হের টাকা-পয়সা নাই। হেতে এই দুয়ার, ওই ঘুরতেছে। আমি টাকা নিমু না.. ”

চোখের পানি অনেক কষ্টে লুকাতাম! তবে কিছু দিন পর তিনিও বদলে গেলেন। হাজার নষ্টের মধ্যে একজন ভাল মানুষ টিকে থাকতে পারে না।

একদিন পর ফাইল সাইন হয়ে গেল। খুশি মনে ডিরেক্টর সাহেবের অফিসে দৌড়লাম।

ডিরেক্টর এর পি.এস. একজন ধূর্ত মহিলা, দুর্নীতি বিদ্যায় বিশেষ পারদর্শী। পাঠক হয়তো ভাবছেন, মহিলার ব্যবহার খুব খারাপ! মোটেও না, তিনি মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে আপনার ফাইল মাসের পর মাসে আটকে রাখবেন। আজ স্যারের মন খারাপ, স্যার ফাইল ধরছেন না, আজ স্যারের মিটিং, আজ স্যারেরইত্যাদি ইত্যাদি। এই দেখেই বুঝি কবি গুরু বলেছিলেন, ”পুরুষ বাধে শিকলে, নারী বাধে আফিমে।

 

()

এরপর গেলাম মেম্বার এর কাছে। তিনি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদাধিকারী- সরকারের অতিরিক্ত সচিব। সবাই বললো, তিনি একটা সাইন করতে নেন চল্লিশ হাজার টাকা। একটা সাইন করতে, পাঁচ সেকেন্ড সময় লাগে। পাঁচ সেকেন্ডে চল্লিশ হাজার টাকা আয়! এমন অসাধারণ প্রতিভাধর মানুষ দেখার আমার খুব শখ হলো। তার পারসোনাল সেক্রেটারি কে অনেক ধরে কয়ে সাক্ষাৎ নিলাম।

অতিরিক্ত সচিব সাহেব একজন খর্বকায় মানুষ। তাতে কি? জাপানীরা কি বেটে নয়? তবুও-তো তাদের বিশ্বজুড়ে প্রশংসা। ইনিও জাপানিদের মতো, নিজের ভাষার প্রতি তার অঘাৎ মমতা। কথা বলেন, একদম খাটি আঞ্চলিক ভাষায়। আপনের নাম কি? বাপের নাম কি? এভাবে কথা শুরু করলেন তিনি। কথা প্যাচাচ্ছেন তো প্যাচাচ্ছেনই। যার অর্থ খুব সোজা! আমার পি.এস.কে টাকা দাও, না হয় কেটে পড়। কিন্তু আমি নাছোড় বান্দা, সহজে হাল ছাড়ি না। এই মহামানবের(!) সাইন না পেয়ে সত্তর ঊর্ধ্ব বয়স্ক মানুষ জনাব কলিম উদ্দিন সেদিন কাঁদতে কাঁদতে বের হয়ে যেতে দেখেছি।

সেদিনই বুঝ ছিলুম!, এরা আমাদের কবি বা লেখকদের মতো এতো সস্তা লোক নয়! যে, কেউ অটোগ্রাফ বলে একটা সাদা কাগজ বাড়িয়ে দিলে, আমাদের প্রাণটা আনন্দে ভরে উঠে। কত রকমের শুভেচ্ছা বানী লিখে একটা অটোগ্রাফ দিয়ে দেই। একটা একশ টাকার বই বিক্রি করে কবির লাভ ওটাই, অটোগ্রাফ! প্রকাশক তো এক-পয়সাও দেয় না।

এরা বড় মানুষ! অনেক শিক্ষিত! অনেক মেধাবী!(?), বিসিএস পাশ! তাইতো বলি বি.সি.এস পাশদের চাকুরীর কোটা নিয়ে এতো রক্তারক্তি হয়ে গেল কেন? এরা আমাদের প্রভু, আমরা এদের দাস। মোগল, পাকিস্তান, ব্রিটিশ চলে গেছে এদের রেখে গেছে। এখন এরাই আমাদের মতো অকেজো, অভদ্র, ইতর জনগণকে শাসন করে আমাদের ধন্য করছেন!

আমার কাগজ-পত্রে কোন গোলমাল নেই। কত আর প্রশ্ন করবেন, কত আর ঘুরাবেন! আমার পাশে এক ভদ্রলোক তদবিরে বসে আছেন। তার জমির পরিমাণ অনেক বেশি, তাও আবার গুলশানে এবং সম্ভবত বড় কোন ঘাপলা আছে। পি.এস. স্যারকে দ্রুত তাগাদা দিলেন। ইশারায় বুঝালেন, আমার সাথে কথা সংক্ষিপ্ত করতে। আমিও চট করে বড় বড় দুই-তিন জন আমলা লেখকের নাম বলে দিলাম। বললাম তাদের সাথে আমার খুব ভাব, ইয়ার দোস্ত মানুষ! স্যার বিরক্ত হয়ে ঘচ্ করে একটা সাইন মেরে দিলেন। বিশ্বাস করুন পাঠক, এতটা আনন্দ হলো, মনে হলো স্যারের পা ছুঁয়ে সালাম করি। চল্লিশ হাজার টাকা বেঁচে গেল। মনে দারুণ আনন্দ। আমার দোয়ায়(!) অল্প কিছু দিনের মধ্যেই ভদ্রলোক চেয়ারম্যান অর্থাৎ সর্বোচ্চ পদে প্রমোশন পেয়ে গেলেন।

 

()

নিজ জাতির এমন বীভৎস, কদাকার রূপ দেখে মাঝে মাঝেই আমার ভেতরটা কেঁদে উঠে। দেশের স্বাধীনতার জন্য কত লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়েছে। নির্যাতিত হয়েছে কত মানুষ। আমার নিজের পরিবারই সয়েছে কত অত্যাচার, দুঃসহ দরিদ্রতা, প্রিয় মানুষ হারানোর বেদনা। অথচ সেই স্বাধীন বাংলাদেশ আজ কতিপয় দুর্নীতিবাজ আর ক্ষমতা লোভীর কারণে শোষক রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে।

একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন, স্ব-জাতিকে বঞ্চনা-মুক্ত করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে মৃত্যুকে হাসি মুখে মেনে নিয়ে ছিলেন আমার মেজ চাচা। আমার বাবা ছিলেন যুদ্ধ বন্দি। আরো এক চাচা মুক্তিযুদ্ধে আহত অবস্থায় কত কষ্ট পেয়ে ধুকে ধুকে মরেছে। তাদের সবারই স্বপ্ন ছিল একটি সুন্দর স্বাধীন রাষ্ট্র ব্যবস্থার। আজ স্বাধীন দেশে চারদিকে সীমাহীন দুর্নীতি।

আমার মেজ চাচা ছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সুবেদার। আব্বা নায়েব সুবেদার ছোট চাচা ল্যান্স নায়েক। তিন ভাই সেনাবাহিনীতে চাকুরী করে, সেই সুবাদে গ্রাম জুড়ে তাদের ছিল অনেক সম্মান। তবুও, পরাধীন দেশের বঞ্চনা সহ্য হয়নি তাদের! ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পূর্বে পাকিস্তান থেকে ছুটি নিয়ে এসে মেজ চাচা পরিবারের সবাইকে ডেকে বলেছিলেন, ”শেখ সাহেবরে ভোট দাও। বাঙ্গালী দুর্দশা মুক্ত হবে।চাচার তখন পাকিস্তান ইন্টার সার্ভিস ইন্টেলিজেন্সে পোস্টিং। কোথায় এদেশের খবর পাকিস্তানীদের দেবে! তা না করে সবাইকে বলছে, ‘শেখ সাহেবরে ভোট দাও। বাঙ্গালী দুর্দশা মুক্ত হবে।

সেনাবাহিনীর লোক গুলো এমনিতে রাগী কিন্তু ভেতরটা সহজ-সরল। এরা সিভিলিয়ানদের মতো কৌশলী না। নির্বাচনে আওয়ামীলীগের জয়ের পর। এবার মেজ চাচা বললো, ”১৯৭১ মার্চে বড় কোন অপারেশন হবে, তোমরা সবাই সতর্ক থেক।সত্যই ১৯৭১ এর ২৫শে মার্চ কাল রাতে ভয়াবহ নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চললো। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ছোট একটা দল চলে এলো টাঙ্গাইলে, আমাদের গ্রামে। চাচাকে স্যালুট করে বললো, ঢাকায় বড় ধরনের গণ্ডগোল হচ্ছে, আপনাকে দ্রুত হেড কোয়াটারে রিপোর্ট করতে হবে।

বাড়ীর সবাই মেজ চাচাকে বললো পালিয়ে যেতে। তিনি বললেন, “আরে বাদ দাও! আমি কি কোন অন্যায্য কথা বলেছি নাকি? আর এই সব সৈনিকরা তো আমার চেনা-জানা। এদের সাথে আমি কত রুটি মাংস ভাগ করে খেয়েছি। এরা আমার কোন ক্ষতি করবে না।চাচা চলে গেলে। এরপর হতে তার কোন খোঁজ নেই। তার ইউনিটের এক বাঙ্গালী সৈনিক মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলে খবর দিয়েছিল, ”স্যারকে ওরা অনেক অত্যাচার করে মেরেছে। তারপর তার লাশ পুরিয়ে ফেলেছে।

ভদ্রলোক আমার আম্মাকে বলেছিল, ”দ্যাখেন ভাবি, আমার একটাও দাঁত নেই। নখ উঠাইয়া ফেলছিল, আবার গজাইছে। টর্চার সেল থেকে পালিয়ে ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলাম। তাই খবর দিতে এত দেরি হয়ে গেল।

সবার ঘরে যুদ্ধ জয়ের আনন্দ। আমাদের বাড়ীতে বিষাদের কালো ছায়া। বাবা পাকিস্তানে বন্দী। রেডক্রস এর মাধ্যমে ইংল্যান্ড হয়ে ছয় মাসে একটা চিঠি আসতো। তাতে একটা খবর জানা যেত তিনি বেচে আছেন। এভাবে চললো তিন বছর। তারপর পাকিস্তান থেকে যুদ্ধবন্দি চুক্তির বিনিময়ে ছাড়া পেলেন। চোখের সামনে, কত হাজার হাজার ভুয়া মুক্তিযুদ্ধ তৈরি হলো। পৃথিবী জুড়ে প্রিজনার অব ওয়ারদের সন্মান জানালে হলেও, এদেশের সৈনিক, যারা যুদ্ধবন্ধী ছিল; তাদের আজো কোন সন্মান জানায়নি বাংলাদেশ। ছোট চাচা, (পাঁচ নম্বর চাচা) কহিনুর কাকা। মুক্তিযুদ্ধে পালিয়ে অংশ নিতে গিয়েছিলেন, ধরা পরার পর বেদম মারধরের কারণে আমৃত্যু আহত, দুর্বল হয়ে, কষ্ট পেয়ে ধুকে ধুকে মারা গেলেন। মেজ চাচার কষ্ট, বাবার কষ্ট আমি দেখিনি, এই সব আমার মায়ের মুখে শোনা। আমার জন্মের বেশ আগের ঘটনা। কিন্তু কহিনুর কাকার সেই দুঃসহ কষ্ট পীড়িত জীবন আমি দেখেছি।

মুক্তিযুদ্ধ এদেশের বহু পরিবারকে হত-দরিদ্র করেছে, নিঃস্ব করেছে, তবুও মানুষ দেশের স্বার্থে সব সয়ে নিয়েছে। কিন্তু জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃক পক্ষর অফিসে বসে একটা অনুভূতিই বার বার হয়েছে। ভুল, সবই ভুল! এত কষ্ট, এত অশ্রু, এত কান্না। সব আত্ম-ত্যাগ সবই বৃথা!

 

-তারিক সামিন

 

আশ্বিন মাস থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। এই রোদ্দুর, এই বৃষ্টি। মেঘ আর সূর্যের লুকোচুরি। চারিদিকে যত দুর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। এই বন্যায় খুব কষ্ট করে দিনপাত করছে দিলারা। ঘরের ভিতর হাটু পর্যন্ত পানি। টিনের ঘর, তার মধ্য মাচা পেতে কোন রকমে বেঁচে আছে ওরা। দিলারার সদ্য প্রসুত শিশুটির বয়স আঠারো দিন। এখনো নাম রাখা হয়নি।  মা’র কাছে শুনেছিল, গরীবের জীবন এমনই জিনিস হাজার কষ্টেও টিকে থাকে’।

দিলারার স্বামী হারিস। অলস প্রকৃতির মানুষ। মাঝে মধ্যে কখনো কখনো কিছু কাজ করে সে। সব কিছুতেই ভাবলেশহীন। সুঠাম শরীর, বেটে-খাটো মানুষ। মাথায় চুল নেই প্রায়। সারাদিন একটার পর একটা সিগারেট ফুঁকে। দু'টো গাভী আর দু'টো বাছুর আছে তার। এখন উচু রাস্তার উপরে বাধা থাকে ওগুলো। গ্রামের সবার গৃহ পালিত পশু-পাখির আশ্রয় এখন রাস্তা বা ব্রিজের উপর। মানুষের চেয়ে কিছুটা ভাল আছে ওরা।

প্রতিদিন দুই গাভী যতটুকু দুধ দেয়। তার থেকে সামান্য সন্তানের জন্য রেখে বেশির ভাগই বিক্রি করে দেয় হারিস।

‘দুধ বিক্রি কইরা, চাল, আলু আর ডিম কিনে আনবা’। স্বামীকে মনে করিয়ে দিল দিলারা।

‘আচ্ছা আনমু’ বলে হারিস নৌকা নিয়ে চললো বাজারের দিকে।

কোথাও কোথাও পানির নিচের আবাদী জমি দেখা যায়। সেখানে মাছেরা ছুটোছুটি করে। বক আর মাছরাঙা টুপটাপ ধরে নিচ্ছে মাছ। একটু দুরে লাল আর সাদা শাপলা ফুটে আছে। এসব দৃশ্য; খুব একটা মন কারে না হারিসের। তার মাথা ঝিম ঝিম করছে, শরীরে অস্বস্তি হচ্ছে। সকাল থেকে একটা সিগারেট খাওয়া হয়নি তার। কাল রাতে আধ প্যাকেট সিগারেট মাচা থেকে কখন যে পানিতে পরে গেছে টের পায়নি সে।

বাজারের বেশীরভাগ অংশেই পানি উঠেছে। এ্যালুমিনিয়ামর জগ, বালতি আর কলস ভরে দুধ নিয়ে বসে আছে চারজন দুধবিক্রেতা।

‘কাকা আজ দাম কত উঠছে?’ এসেই রহিম মাঝিকে জিজ্ঞাসা করে হারিস।

‘চল্লিশ টাকা লিটার,  উত্তর দিল রহিম মাঝি।

আধ ঘন্টা বসে থেকে চার লিটার দুধ ১৬০ টাকায় বিক্রি করলো হারিস। এখন সে যাচ্ছে মুদি দোকানীর কাছে। মুদি দোকানে  জিনিসপত্রের অভাব। বন্যার কারনে সরবরাহ নেই অনেক মালামালের। এই সুযোগে দাম অনেকটা বাড়তি রাখছে দোকানদার রিয়াজ।

‘রিয়াজ ভাই এক প্যাকেট সিগারেট দাও।’

দোকানী এক প্যাকেট সিগারেট এগিয়ে দিল হারিসকে। এসেই দুইটা কিনেছিল, শেষ হয়ে গেছে সেগুলো।

আর কি? প্রশ্ন করলো দোকানী রিয়াজ।

‘এক কেজি চাল, আধা কেজি আলু দাও।’

চাল, আলু মেপে আলাদা পলিথিন ব্যাগে দিল দোকানী।

কত হইছে?

‘চাল - ৪০, আলু- ১৫, সিগারেট ৯০ মোট ১৪৫।’

১৫০ টাকা দিল হারিস ফেরত পেল ৫ টাকা।

সিগারেট ফুকতে ফুকতে শান্ত মনে বাড়ীর পথে রওনা হলো সে।

হারিসের পুরো সংসারের খাবার খরচ ৫৫ টাকা আর তার প্রতিদিন সিগারেট লাগে প্রায় একশত টাকার। হারিস কখনো ভেবে দেখেনি সেটা।

Better World Books Good Reading

|| তারিক সামিন ||

 

এই গল্পের চরিত্র ও ঘটনা প্রবাহ কাল্পনিক। নির্দিষ্ট কোন দলের পক্ষে বা বিপক্ষে আমার কোন বক্তব্য নেই। কারণ বাংলাদেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের হাতেই লেগে রয়েছে সাধারণ মানুষের রক্ত। এটি এদেশের নিপীড়িত ও লাঞ্ছিত মানুষের সকরুণ আর্তনাদের একটি গল্প। - লেখক।

 

বার্ন ইউনিটে স্বামীর লাশের পাশে বসে আছে মিতু। লাশের সারা শরীর এখনো ব্যান্ডেজ মোড়ানো। মুখটা রক্তশূন্য, ফ্যাকাসে।  গত একুশটা দিন তীব্র কষ্টে, অমানুষিক যন্ত্রণা পোহাতে পোহাতে আজ ভোরে মৃত্যু হয়েছে তার স্বামী শাহরিয়ার হকের।

মিতু বসে আছে। নিঃশব্দে কেঁদে চলছে সে। তার গর্ভবতী ভারী শরীর কেঁপে উঠছে একটু পর পর।  একটা ছোট ডায়েরী, তাতে জীবনের শেষ কথাগুলো অলৈাকিক ভাবে লিখে গিয়েছে শাহরিয়ার। মিতু পড়ে চলছে, সমস্ত শোক ভুলে, যেন চিঠির মধ্যে হারিয়ে গেছে সে। শাহরিয়ার লিখেছে...

 

১০ই ডিসেম্বর ২০১৩ ইং

 

প্রিয় মিতু,

আমার মনে হয় সময় ঘনিয়ে আসছে। আগামীকাল হয়তো আমাদের আর দেখা হবেনা। মৃত্যুকে এত কাছাকাছি  দেখবো কখনো ভাবিনি। গত বিশটা দিন হাসপাতালে পুড়ে যাওয়া মানুষগুলোর তীব্র আর্তনাদ, ফিনাইল আর ডেটলের গন্ধ, স্বাদহ্নীন তরল খাবার, ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, চিকিৎসায় প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা খরচের দুঃচিন্তা, এসবের মধ্যেও; এখানে এসে বুঝলাম মানুষ মানুষের কত আপন। একজন অসুস্থ, রোগাক্রান্ত আর অসহায় মানুষের দুঃখ অপর একজন অসহায় মানুষই ভাল বোঝে। তাই মনেহয় মানুষে মানুষে ভাতৃত্ববোধ হাসপাতালেই বেশী।

এখানে আমাদের ওয়ার্ডের নার্স রিক্তা আপা। ভারী মিষ্টি তার ব্যবহার। অত্যন্ত নিবেদিত ভাবে প্রত্যেক রোগীর সেবা করে সে ।  তার শ্যামবর্ণ, অতি সাধারণ মুখমণ্ডল, দেখতেও খুব সাদাসিধে। তবুও এই মানুষটির মধ্যে আমি একজন দেবীর দেখা পেয়েছি। নার্সরা আমাদের সমাজের সবচাইতে মহান পেশার মানুষ। রিক্তা আপা বিবাহিত, ওনার চার বছরের একটি ছেলে আছে। স্বামী-সন্তান ছেড়ে মাঝে-মাঝেই নাইট ডিউটি করতে হয় ওনাকে।

গত পরশু আমার প্রচণ্ড জ্বর ছিল। আমার পাশের বেডের দেলোয়ার ভাইয়ের ড্রেসিং পড়ানো হচ্ছিল। তার কাতরানো আর গোঙ্গানির শব্দে দর্শনার্থী দুইজন সুস্থ-স্বাস্থ্যবান যুবক জ্ঞান হারিয়ে ধপাস করে পড়ে গেল। এমনিতে ডাক্তাররা কাউকে বার্ন ইউনিটে ঢুকতে দেয়না। এখন লোকে-লোকারণ্য। দেলোয়ার ভাইয়েরও আমার মত শরীরের ৪০% এর বেশী পুড়ে গেছে। প্রথম যখন এসেছিল, সারা শরীর কালো পোড়া; ফোস্কার ভেতর পানি জমতে শুরু করেছে। ওনার শরীরে স্যালাইন দেবার জন্য রগ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলোনা।  ডাক্তার আর নার্সরা অনেক ধৈর্য ধরে ঔষধ দিল, মলম দিল, তারপর ব্যান্ডেজ করলো। আমার ঘা-গুলো শুকিয়ে আসছে, কোথাও কোথাও হলুদ পদার্থ জমেছে, গভীর ক্ষত গুলো থেকে রক্ত বের হয় মাঝে মাঝে।

হায়! আমরাতো কত কিছুই চোখের সামনে পুড়তে দেখি। কারো ঘর পুড়ে, কারো কপাল পুড়ে কিন্তু যাত্রীবাহী বাসের ভেতর দগ্ধ মানুষগুলোর পোড়া শরীর যেন আমাদের কারো দেখতে না হয়!

দেখ-দেখি কি বলতে কি বলছি। কোথায় সিস্টার রিক্তা আপার কথা বলাবো, তা-না-বলে বারবার তোমার মন খারাপ করে দিচ্ছি। আমার হাতদুটো অলৈাকিকভাবে খুব সামান্য পুড়েছে, তাই সারাদিন এসব হাবিজাবি লিখি। আগুনের প্রচণ্ড তাপ নিঃশ্বাসের সাথে গ্রহণ করার কারণে আমার শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, কথা বলাতে কষ্ট হয়, তবুও বলি। যতক্ষন ব্যথা কম থাকে, মাঝে মাঝে আলাপ জুড়ে দেই সিস্টার রিক্তার সাথে। সেদিন আমাকে তোমার কথা জিজ্ঞাসা করলো। আমি বললাম আর কয়েক সপ্তাহ পরই আমাদের সন্তান ভূমিষ্ঠ হবে। শুনে উনি খুব খুশি হল। আবার একটু  পর মনে হল, চোখের কোনে সামান্য পানি। সিস্টারকে আমার জীবনের স্বপ্নের কথা, তোমার কথা, আমার ব্যবসা আর জীবন সংগ্রামের অভিজ্ঞতার কথা বলি। শুনে সিস্টার  দুঃখ করে বলে, ইস্ আপনার মত এত বুদ্ধিমান, এত ভাল আর সৎ মানুষের জীবনে এমন কেন হলো!

চলন্ত বাসে যারা পেট্রোল বোমা মারে, ওরাতো মানুষকে মারে না; ওরা মারে ঘুণে ধরা, পচে যাওয়া সমাজ ব্যবস্থার উপর। যে রাষ্ট্র, সমাজ ব্যবস্থা ওদের অমানুষ বানিয়েছে, হয়তো তাদের লক্ষ করে। কপাল দোষে পুড়ে মরে কর্মঠ মানুষ। সন্তানের চিকিৎসা করতে আসা মা আর তার দুই বছরের অবুঝ শিশু, এমন আরো কত নিরীহ মানুষ।

আমি প্রতিনিয়ত আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানাই, দয়াময় আমাকে আবার সুস্থ-সবল করে দাও।  আমি যেন আমার স্ত্রী-সন্তানের সাথে আর ক’টা বছর সুখে জীবন-যাপন করতে পারি। আমার অনাগত সন্তান, যে এখনো তোমার গর্ভে, তার জন্যও খুব কষ্ট হয়। হায়! এই দেশে তাকেও জন্মাতে হবে। অনাচার আর অবিচারের স্বর্গরাজ্যে এই দেশে,  পদে পদে দুঃখ-কষ্টে কাটবে তার জীবন্।

এই যা! ফের দুঃখের কথা বলছি। শোন, তুমি আগামীকাল যখন হাসপাতালে আসবে, সুন্দর করে সেজে আসবে।  আমার মনটা ভীষণ খুশি হয় তোমাকে দেখলে। আমার বাবুটা কেমন আছে? দুষ্টুমি করে? এখনো কি হঠাৎ পেটের ভেতর থেকে লাথি মারে? দেখে নিও অনেক দুষ্ট হবে। তোমার বমিটা কমেছে?  মা কি এখনো অনেক কান্না-কাটি করে?

শিমুলকে বলো, ও যেন মাঝে মাঝে ব্যবসাটার দেখাশোনা করে। বাজারে অনেক টাকা বাকি পড়ে আছে। টাকাগুলো তুলতে হবে। এদিকে আমার পেছনে-তো লক্ষ-লক্ষ টাকা খরচ হচ্ছে। একবারে মরে গেলেও বেঁচে যেতাম।  এই আট-দশ লক্ষ টাকা দিয়ে আমাদের সন্তানটির ভবিষ্যৎ খরচ চলতো। হাসপাতালের সবাই রিক্তা আপার মত নিবেদিতপ্রাণ মানুষ নয়। এখানে সবাই পরিশ্রম করে, তবে টাকাটাই মুখ্য অনেকের কাছে।  মানুষের কষ্ট আর যন্ত্রণা থেকে লাভবান হবার একটা লালসা দেখি এদের মধ্যে। ঠিক আমাদের রাজনীতিবিদের মতো।  

ইদানীং তোমার কথা খুব মনে পড়ে। তোমার সুন্দর মুখ, স্নিগ্ধ হাসি, সিল্কের মত মসৃণ চুল, চোখের সামনে ভেসে উঠে। শোনো তুমি ভাল থেক, নিজের প্রতি যত্ন নিও। বেশি করে খাওয়া-দাওয়া কর। আমাদের সন্তানটা যেন সুস্থ-সবল হয়। এই নরক রাজ্যে, যেখানে জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি, সীমাহ্নীন অসৎ প্রতিযোগিতা। জেনে রেখো, সেখানে দুর্বলের কোন স্থান নেই।  এদেশে মানুষের দুঃসময়ে সবাই বাড়তি কিছু আয়ের চিন্তা করে।

বাবা যেভাবে আমার সেবা করছে, তাতে আমার শৈশব স্মৃতি মনে পড়ছে। তুমিতো জানো, বাবা বরাবরই রাগী মানুষ। কিন্তু ছোটবেলায় আমাকে খুব আদর করতো। বাজারে গেলে আমি সবচেয়ে বড় মাছটা পছন্দ করতাম। মাঝে মাঝে টাকা থাকতো না। তবুও বাবা আমার জন্য সবচেয়ে বড় মাছটা কিনতো। শুধু মাছ নিয়ে বাসায় ফিরলে মা খুব রাগারাগি করতো। বলতো, চাল-ডাল, তরু-তরকারী কোথায়? শুধু বড় মাছ খেয়েই কি পেট ভরবে? কিন্তু বাবা  আমার আনন্দটাকেই বড় মনে করতো। আমি বড়ই স্মৃতি-ভোলা মানুষ। বাবার ভাল গুন গুলো মনে না রেখে; শুধু রাগ গুলোই মনে রাখতাম।

আজ রিক্তা আপার মেজাজ একটু খিটখিটে। বাসায় ছেলেটার জ্বর। কিছু দিন হলো ওনার স্বামীর চাকুরী চলে গেছে। বাসায় বসে থাকে, তবুও নাকি ছেলেটার যত্ন নেয় না। আয়াকে বকা দিল, আমার প্রস্রাবের থলেটা পাল্টে দেয়নি বলে। তারপর আমাকে ঔষধ খাইয়ে দিল। সাক্ষাত যেন কোন মায়াময়ী দেবী। একটু আগেও ডাক্তার এসেছিল। বললো, আমার পায়ে গ্যাং-গ্রিন হচ্ছে, সেই জন্যই প্রচণ্ড  দুর্গন্ধ।

এই ইন্টারনেটের যুগে কেউ কি আর চিঠি লেখে বলো?  তবুও আমার লিখতে ভীষণ ভাল-লাগে। আমি মরে গেলে তুমি পড়ো, তারপর রেখে দিও আমার অনাগত সন্তানের জন্য। তাকে বলো, আমাকে নির্মম পাশবিক রাজনীতির বলি হতে হয়েছে। এমন দুঃসময়ে তাকে পৃথিবীতে নিয়ে আসার জন্য; বাবা হিসাবে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।

আমার সকল ভুলের জন্য আমি তোমার মাধ্যমে সকলের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। দোয়াকরো আমার মত হতভাগ্য, এ পৃথিবীতে আর যেন জন্ম না নেয়। তুমিও  আমার ভুল-ক্রটি গুলো ভুলে যেও।

 

ইতি,

তোমার স্বামী

শাহরিয়ার।  

|| তারিক সামিন ||

 

যে শাড়ীটা পড়ে এতক্ষন রান্না-বান্না করছিলেন, সেটা পরেই তাড়াহুড়া করে ছোট বোনের বাসার দিকে ছুটলেন নিলুফার পারভীন।

নিলুফার পারভীনের বয়স ৪৮ বৎসর। এক ছেলে, এক মেয়ে আর স্বামী। এই চারজনের সংসার। তবুও অভাব অনটন লেগেই আছে। স্বামী সগীর আহম্মদ। চাকুরী থেকে অবসর গ্রহন করে; মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং এর প্রতারনায় এখন প্রায় সর্বশান্ত।

এ যুগে অমন সরল মানুষের পক্ষে টিকে থাকা দায়। সরকারী চাকুরী জীবনে অসৎ আয়-উপার্জন করেননি। কখনো কারো ক্ষতি করেছেন এমনও শোনা যায়নি।

 

নিলুফার পারভীন এর মেয়ে শুভ্রা, তার প্রথম সন্তান। এবার এসএস.সি পরীক্ষা দেবে। খুব ভাল ছাত্রী। একা একা পড়াশোনা করে। তবুও তার রেজাল্ট ভাল। খুব লাজুক আর প্রচন্ড হ্নীন্যমনতায় ভুগে মেয়েটি।

এক ছেলে শুভ্র। ক্লাস সিক্সে পড়ে। দুরন্ত-ডানপিটে স্বভাবের, বাবা-মা কারো কথা শুনতে চায় না। সারাদিন বাইরে বাইরে খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকে।

নিলুফার পারভীনরা চার বোন, এক ভাই। তার ছোট বোন ইয়াসমিনের এর বাসা পাশের লাইনে। সেখানেই ছুটছেন তিনি।

এই মহল্লার বাড়ী গুলো সব আড়াই কাঠা জমির উপর তৈরী। দশ বছর আগে প্রাইভেট হাউজিং কোম্পানীর কাছ থেকে একটা প্লট কিনে টিনশেড বাড়ী করে তার স্বামী। বছর দুই পর তার ছোটবোন ইয়াসমীন একদিন খুব করে ধরলো।

- আপা তোদের বাসার সাথে একটা প্লট কিনে দে।

- সে কিরে, এখনতো দাম অনেক বাড়তি! বিস্ময় প্রকাশ করলো নিলুফার।

- ‘তো!’। ঠোট উল্টে বললো ইয়াসমিন।

- এত দাম দিয়ে মোজ্জামেল বাড়ী কিনবে?

- কিনবে। না কিনতে পারলে যে ব্যাটা কিনতে পারবে তার সাথে গিয়ে ঘর করবো।

- ছিঃ!

- এমন একটা বিয়ে দিয়েছ। বলেই কান্না শুরু করলো ইয়াসমিন।

 

সেই সময় অনেক খোজাখুজি করে জানা গেল, ঠিক পাশের লাইনে একটা প্লট বিক্রি হবে। দাম বিশ লক্ষ টাকা। দালালেল খরচ, নামজারী এসব মিলিয়ে আরো ত্রিশ- পয়ত্রিশ হাজারের মত লাগবে।

বিশ লাখ টাকা দুলা ভাইয়ের হাতে দিয়ে, ইয়াসমিন বললো,

- দুলা ভাই, আর কোন টাকা দিতে পারবো না। আপনি দামা-দামি করে এক-দুই লাখ টাকা কমান।

- আচ্ছা, চেষ্টা করে দেখি। তুমি কোন চিন্তা করো না। এই টাকায় হয়ে যাবে।

বাকী পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা নিজের পকেট থেকে দিয়েছিলেন তার স্বামী, নিলুফার কখনো ছোট বোনকে বলেনি সে কথা। জায়গাটা কেনার পর পরই ইয়াসমিনের স্বামী মোজাম্মেল গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীতে সাপ্লাই এর ব্যবসাটা বন্ধ করে, নিজেই একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী চালু করে। এখন ওদের অনেক অর্থ-সম্পদ। বাড়ীটা সাত তলা করেছে পাঁচ বছর হলো। সাভারে নিজস্ব মার্কেট আছে, গ্রামে অনেক জমি আছে। আরো কত কি! বোনের সুখে অনেক ভাল লাগে নিলুফার পারভীনের।

 

ইয়াসমিনদের গেটে তালা মারা, কলিং বেল চাপতে দারোয়ান গেট খুলে দিল। ইয়াসমিনের দুই ছেলে আরিফ আর মারুফ। ক্রিকেট খেলছিল। বড় খালাকে দেখে ইদানিং আর খুশি হয়ে উঠে না আগের মত।

তিন তলার দরজা খোলাই ছিল। ভীতরে ঢুকলো নিলুফার পারভীন । ড্রইং রুমে বসে পাঁচ তলার ভাড়াটিয়া মহিলার সাথে গল্প করছিল ইয়াসমীন।

- আসসালামু-আলাইকুম, কেমন আছেন আপা? জিজ্ঞাসা করলো ভাড়াটিয়া অল্প বয়সী মহিলাটি।

- ওয়ালাইকুম সালাম, ভাল।

- তোমার কি খবর ?

- এই তো ভাল।

- শবনম আপা পরে কথা বললো। ঘাড় নেড়ে বললো ইয়াসমিন।

- জী আপা আসি। বলে চলে গেল শবনম।

সুন্দর একটা থ্রি-পিছ পরে আছে ইয়াসমিন। দিন দিন ওর স্বাস্থ্যটা ভারী হচ্ছে। বাসায় তেমন কোন কাজ নাই। সব কাজ বুয়ারাই করে। ঘুম, শপিং আর টেলিভিশন নিয়ে কাটে ওর সময়। নিলুফার এর থেকে দশ বছরের ছোট ইয়াসমিন। লম্বা, শ্যামলা আর ভারী শরীর। গোল মুখ, ছোট নাক, গলায় উপর, চিবুকের নিচে মাংস ঝুলে আছে অতিরিক্ত মেদ বহুল স্বাস্থ্যের কারনে।

 ইয়াসমিন হেসে বললো, ‘আপা আসছো ভাল হইছে।’

- ক্যানোরে?

- বসো, তোমারে একটা জিনিস দেখাই। লাল গহনার বাক্সটা খুলে চকচকে সোনার হারটা দেখালো বোনকে।

- দ্যাখো আপা, নতুন বানালাম।

- বাহ্‌ বেশ সুন্দরতো। মিষ্টি করে হাসলেন নিলুফার।

- পুরো পাঁচ ভরি। আমিন জুয়েলার্স থেকে বানানো।

- দারুন! ভাল মানাবে তোকে।

- হুম! খুশিতে চকচক করে উঠলো ইয়াসমিনের চোখ।

- শুভ্রা এবার টেষ্ট পরীক্ষায় খুব ভাল রেজাল্ট করেছে। নিচু স্বরে বললো নিলুফার।

- হ্যাঁ শুনছি তো। খানিকটা বিরক্ত গলায় বললো ইয়াসমিন। তার চোখ এখনো গহনার দিকে।

- স্কুল থেকে বলছে। আগামী ছয় মাস স্পেশাল কোচিং করাবে। তাহলে নাকি ‘এ প্লাস’ পাবে।

- ভালতো।

- পাঁচ হাজার টাকা লাগবে। ধার দিতে পারবি। তোর দুলা ভাই এক মাস পরে দিয়ে দিবে।

 দপ করে ইয়াসমিনের মুখের চকচকে ভাব মুছে কালো হয়ে গেল ।

- আপা, আমিতো দেড় লাখ টাকা দিয়ে হার বানালাম। আরিফ-মারুফ ইংলিশ মিডিয়ামে পরে, ওদের স্কুলের বেতন মাসে চল্লিশ হাজার টাকা। বলে একটু দম নিল ইয়াসমিন।  ‘দারোয়ান-বুয়া-ড্রাইভারদের বেতন দিলাম আজকে। এখনতো বিষ খাবার টাকাও নাই। যেন অবাক হয়েছে এমন ভাবে বললো ইয়াসমিন।’

অনেক কষ্টে নিজেকে সামলালেন নিলুফার। শাড়ীর আঁচলে মুখ মুছলেন।

- ঠিক আছে। অসুবিধা নাই। তোর দুলাভাই থেকে চেয়ে নেব। নিস্পলক চেয়ে রইলেন নিজের বোনের দিকে।

- ও, ঠিক আছে।

- আচ্ছা আসিরে।

দরজা দিয়ে মাথা নিচু করে বিষন্ন মনে বোনের বাসা থেকে বেরিয়ে এলেন নিলুফার।

তার এত ধনী বোন থাকতে!(?) পাশের বাসার ভাবীর কাছ থেকে টাকাটা ধার নেবার সময়, লজ্জায় মরে যাচ্ছিন নিলুফার পারভীন ।

 

 

লেখা পাঠাবার নিয়ম

মৌলিক লেখা হতে হবে।

নির্ভুল বানান ও ইউনিকোড বাংলায় টাইপকৃত হতে হবে।

অনুবাদ এর ক্ষেত্রে মুল লেখকের নাম ও সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি দিতে হবে।

আরো দিতে পারেন

লেখকের ছবি।

সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি।

বিষয় বস্তুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অঙ্কন চিত্র বা ছবি। 

সম্পাদক | Editor

তারিক সামিন

Tareq Samin

This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

 

লেখা পাঠাবার জন্য

ইমেইল:

This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

 

We use cookies to improve our website. Cookies used for the essential operation of this site have already been set. For more information visit our Cookie policy. I accept cookies from this site. Agree