Super User

Super User

Email: This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

তারিক সামিন।

 

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ। লেখক হিসেবে হুমায়ূন আহমেদ এর সবচাইতে বড় সাফল্য বাংলাদেশের মানুষকে তিনি বই পড়া, বই কেনার অভ্যাস তৈরি করিয়ে ছিলেন। এমন বহু পাঠক আছে যারা তার প্রায় সব বই পড়েছেন, সেই সাথে কিনেছেনও বিস্তর। তার উপন্যাসের লিখন ভঙ্গি অসাধারণ। অল্প কথায় এমন হাস্যরস তৈরীর অপূর্ব ভঙ্গিমা বাংলাদেশের অন্য লেখকদের মাধে অনুপস্থিত। তার টেলিভিশন নাটক গুলোর জনপ্রিয়তা প্রবাদতুল্য। তবে এ সময়ের অনেক পাঠক বোধ করি হুমায়ূন আহমেদ এর ছোটগল্প সমন্ধে জানেন না। আমার মতে, হুমায়ূন আহমেদের ছোট গল্প গুলো বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। তার অনেক উপন্যাস হালকা মেজাজে লেখা হলেও, তার অনেক গল্প রাশভারী মেজাজের । গল্পে তিনি প্রতিবাদী, সমাজের বহু অনিয়ম দেখিয়েছেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে। 

তার ছোটগল্প ‘খাদক’ রূপক অর্থে একনায়কতান্ত্রিক শোষন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লেখা। যেখানে গল্পের নায়ক মতি মিয়া একজন খাদক। আস্ত গরু, খাসি বা আধ মন জিলাপী খায় বাজি ধরে। গল্পের নায়ক মতি মিয়া বলছে, ‘আল্লাহতালা একটা বিদ্যা দিছে খাওনের বিদ্যা, অন্য কোন বিদ্যা দেয় নাই’। হুমাযূন আহমেদ লিখেছেন, ‘পেট বের হওয়া হাড় জিড়জিরে কয়েকটি শিশু। চোখ বড় বড় করে বাবার খাবার দেখছে। শিশুগুলো ক্ষুর্ধাত। হয়তো রাতেও কিছু খায়নি। বাবা একবারও তার বাচ্চাগুলোর দিকে তাকাচ্ছে না’। একনায়কতান্ত্রিক শোষণের বিরুদ্ধে কাল উত্তীর্ণ একটি গল্প।

তার রচিত গল্প ‘ভয়’ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এক অসাধারণ উচ্চারণ।

তার অপর গল্প ‘কবি’। যেখানে নায়ক একজন পেশাদার প্রুফ রিডার ও কবি। ঘরে তার অসুস্থ কন্যা। তবুও প্রুফ দেখে দিচ্ছেন। প্রকাশক তাকে শোষণ করেছে সামান্য টাকার বিনিময়ে। তার আরো একটি গল্প ‘আনন্দ বেদনার কাব্য’তে তিনি লিখেছেন গরিব স্কুল মাষ্টার কবিতা লিখেন, হঠাৎ ইচ্ছে হলো একটা কবিতার বই বের করবেন, তার দশম শ্রেনী পড়ুয়া মেয়ে তার কবিতার বই এর প্রচ্ছদ এর জন্য একটা ছবি একে দিল। তারপর কিছুদিন পর মেয়েটি অসুখে মারা যায়। কোনো প্রকাশক বিনা পয়সায় কবিতার বই ছাপবেনা। তাই গরিব পিতা পাচঁ বছর ধরে তিলে তিলে বই ছাপার টাকা সঞ্চয় করলেন মেয়ের স্মৃতি ধরে রাখতে। তারপর সেই বই বের হলে তা উপহার দিলেন লেখক হুমাযূন আহমেদকে। লেখকদের প্রতি হুমায়ূন আহমেদের ছিল অপরিসীম মায়া।

আমাদের দেশের প্রকাশকদের দূনীর্তি ও নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে মানুষকে সচেতন করেছিলেন তিনি। তার জাদুকরি লেখার ভঙ্গি ও জনপ্রিয়তার কাছে হার মেনেছে এদেশের প্রকাশকেরা। শোনা যায়, যদি একটি বই পাওয়া যায় সেই আশায় টাকার বস্তা নিয়ে হুমায়ুন আহমেদের ফ্লাটে বসে থাকতেন অনেক প্রকাশক। বই পড়ুয়া জাতি যে কত অনিয়ম, অনাচার নিজের অজান্তেই প্রতিরোধ করতে পারে। তার উদাহরন সে সময়ের প্রকাশনা শিল্প।

সরল প্রাণ এই লেখক তার ‘শাহ্ মকবুল’গল্পে তিনি নিজের কথা লিখেছেন, ‘আমি ধরেই নিলাম প্রুফ রিডার মতির দেখা আর পাওয়া যাবে না। সে প্রুফ ভালো দেখতো তাতে সন্দেহ নেই। আমার মতো বানানে দুর্বল লেখকের জন্য এটা দুঃসংবাদ’। একজন লেখক কত উদার মনের হলে নিজের এমন দুর্বলতার কথা অকপটে জানাতে পারেন, তা একমাত্র লেখকরাই বুঝবেন। 

তার রচিত আরো অসাধারণ কিছু গল্প উনিশ শ’ একাত্তর, জুয়া, জীবনযাপন, জলিল সাহেবের পিটিশন, শিকার, ফেরা, একজন ক্রীতদাস, অয়োময়, অচিনবৃক্ষ, সৌরভ, লিপি, গন্ধ, অতিথি, ইত্যাদি।     

এই লেখকের কর্মমুখর জীবনের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

-কাদের পলাশ।

 

বিষণ্ণ মন। ভাবছি কিছু সময়ের জন্যে নগর জীবন ছেড়ে শীতলতায় গা ভাসিয়ে দিই। ছুটে যাই সবুজ অরণ্যে, কাঁদা মাটি জড়িয়ে রাখা ঘাসের বিছানায়। আম কিংবা কাঁঠাল বাগানের ভিড়ে। যেখানে উচ্ছল শৈশব কাটিয়েছি মহানন্দে। মোটরসাইকেলে চড়ে খুব দ্রুত সময়ে মায়ের কাছে পৌঁছে যাই। বাড়িতে মা নেই। মাকে খুঁজছি। তবে ডাক দিচ্ছি না। চমকে দেবো বলে। বাড়ির আঙিনা মাড়িয়ে ঘরে ঢুকি। সিটকানি খুলে ঘরে ঢুকে কাঁধের ব্যাগ রাখতে রাখতে, মাকে নিচু গলায় ডাকলাম। মায়ের কোনো সাড়া শব্দ নেই। বাড়িতে খাঁ খাঁ নীরবতা। গ্রামের সেই কোলাহল এখন শহরে পাড়ি জমিয়েছে। হঠাৎ একটা পাখি ডেকে উঠলো। চেনা সুর। না দেখে নাম বলা মুশকিল। বিকেলের বুকে এতো মধুর সুরে গান গায় কোন পাখি? যে গানের সুরে হারিয়ে যাই দেড় যুগের অতীতে। কিশোর জীবনে।

আমি দ্রুত ছুটে আসি। ঘরের আগ দরজা ডিঙিয়ে উঠোনে নজর যেতেই আমি চমকে উঠি। স্তম্ভিত হই। কি করবো কিংবা কি বলবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। পনের বছর আগের পছন্দের পাখি ছানা নিয়ে আমার আঙিনা দাঁড়িয়ে। বুকের মাঝ বরাবর হাত দিয়ে দেখি; কোনো সাড়া শব্দ নেই। ভয় নেই, ধড়পড় কিংবা কোনো কম্পন নেই।

আমি ফিরে দেখি ফেলে আসা স্মৃতির ক্যানভাসে। যেখানে মান-অভিমান আরো কত কী ছুটোছুটি করতো। দমের ঘনত্ব, ধড়পড়, শরীরের কাঁপন বেড়ে যেতো তার উপস্থিতিতে। কত দিন, কত রাত ওকে ভেবে পার করেছি। রাস্তার মোড়ে অপেক্ষায় ছিলাম দিনের পর দিন। যার চলন, আমায় আন্দোলিত করে। যার সরল মুখ, আমায় পথ বাতলে দেয়। আমি হাঁটি স্বপ্নের রাজ্যে। পিছু পিছু ঘুরি। যার চোখে, খুঁজে পাই মর্ত্যের সীমাহীন মুগ্ধতা। যার পায়ে ভর করে হাঁটি হাজার বছরের কাঁচা মাটির পথ। যার হাত ছুঁয়ে দেখি ফুলেদের শরীর। নাকে নিই মহুয়া ঘ্রাণ।

আমায় দেখে তার অবুঝ হয়ে যাওয়া অভিনয় ছিলো মাত্র। ওর ভণিতা আমি বুঝতাম। আমার অপেক্ষা; তথা রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকার কষ্ট তাকে ভালবাসতে প্রেরণা দিতো বলে; আজো বোধকরি পুলকিত হয় সে। আমার অব্যক্ত করুণ আর্তি দেখে আমোদিত হতো। ঠোঁটে মিহি কাঁপন উঠতো। বুঝতো না; কিংবা বুঝেও না বুঝার ভান করতো। আমি উপভোগ করতাম মধুর কষ্ট। আমার দীর্ঘশ্বাসে উড়তো তোমার, চুল, ওড়না এমনকি মন! বুকের বাম পাশে চিনচিন ব্যথা হতো। বুঝাতে পারতাম না। আজও পারি না।

বেশ কিছু সময় গত হওয়ার পর, তার মুখে কেমন আছি? জানতে চাওয়ার জবাব দিতে আমি ভুলে যাই। যদিও আমার চোখে মুখের মুগ্ধতার আভা আড়াল করতে পারিনি। ভালো বা মন্দ; কোনো উত্তর না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন ছুড়ি কেমন আছিস?

-ভালো। তুই কেমন?

ওর কথাগুলোই এমন। অল্প কথায় হাজার কথার জবাব। মনে মনে ভাবি, তুই বলতে থাক। এ মুহূর্তে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে মনোযোগী শ্রোতা।

-কিরে কিছু বলবি না?

আমি হুশ ফিরে পাই। ভালো না থাকার উপায় কী বল? এমন প্রশ্নের জবাবে; মানুষ জেনে শুনে কিংবা মনের অগোচরে মিথ্যে উত্তর দেয়। কারণ মানুষের ভালো থাকা হয়ে উঠে না। ভালো না থাকার কোটি কারণের মধ্যে একটা না একটা কারণ  থাকেই। যাহোকে, আমিতো এ প্রিয় মুখের কথা শুনতেই যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী অপেক্ষার প্রহর গুনেছি। পৃথিবীর সব মানুষ অপেক্ষায় থাকে, বুঝে না বুঝে; দুভাবেই। দুর্বোধ্য বা অস্পষ্ট সে অপেক্ষা। পৃথিবীর প্রতিটি প্রেমিক পুরুষ অপেক্ষায় থাকে, হৃদয় গহীনে প্রথম বসত করা নারীটির মুখোমুখি হবার। কারো হয়ে উঠে, কারো নয়। যে ক্ষেত্রে আমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন।

বারবার অজানায় আমার হারিয়ে যাওয়া দেখে, ও বলে উঠে,

-ও আমার মেয়ে। নাম সৌমিতা। হঠাৎ করে ইচ্ছে হলো; তাই রিক্সা থেকে নেমে তোদের বাড়িতে ঢুকে পড়লাম।

-কিউট! ভারি মিষ্টি হয়েছে তোর মেয়ে। মনের অজান্তেই ছোট মেয়েটির মুখে ফের নাম জানতে চাই।

 মেয়েটি নাম না বললেও তার মা বলে সৌমিতা। আমি শুনেছি কি শুনিনি; বুঝতে পারিনি।

এর ফাঁকেই মা ও বাবা এসে হাজির বাড়ির আঙিনায়। দুইজনেই জানতে চাইলেন ওরা কারা? আমি মেয়েটির মাকে দেখিয়ে বললাম, আমরা একসাথে পড়েছি। এরচেয়ে খুব ভালো পরিচয় দেয়ার সুযোগ হতে পারতো। কিংবা পরিচয় না দিলেও চলতো। কিন্তু সে পরিস্থিতি তৈরি করতে দেয়নি বাস্তবতা। সময় এমনই। সময় মানুষের পরিচয় ভুলিয়ে দেয়। পরিচয় করিয়ে দেয়। এ সময়ই মানুষকে মনে রাখতে দেয় না। আবার সময়ই মানুষকে মনে রাখে। তাইতো আমরা এ সময়ের সাথেই থাকি, চলি। সময়ের কাছেই হার মানি।

মা বললেন, পোলা আমার পাইক্কা গেছে। বড় দার্শনিক হইয়া গ্যাছে মনে অইতেছে। কতা কম কও। ওদের ঘরে নিয়ে বসতে দাও। বাবা বললেন, এমএ পাস কইরা ভদ্রতা ভুইলা গ্যাছো বেটা? যাও; মা তোমরা ঘরে গিয়ে বসো। তোমার খালাম্মা নাস্তা দিচ্ছে।

-না! না! খালাম্মা। রাস্তায় রিক্সা রেখে এসেছি। মা ঘর থেকে খুব দ্রুত দু’টা কমলা এনে মেয়ের হাতে গুজে দেয়। মেয়েটি নিতে চায় না। মা-মেয়েদুজন, বিদায় নিয়ে রিক্সার দিকে এগোয় । সাথে আমিও। আমি কেন হাঁটছি জানি না। কোনো সৌজন্যতার প্রয়োজন আছে কী না! তাও জানি না। আমার পা এগোই না।  মনে হয়, পেছন থেকে কেউ একজন আমার পায়ের কদম বাড়িয়ে দেয়।

ওরা আঙিনা পার হয়। সাথে আমিও। আমি কী হাঁটছি, না ভাসছি? বুঝতে পারছি না। রিক্সায় উঠে বসার পর একটা মিহি হাসি ঠোঁটে লেপ্টে ছিলো ওর মুখে। এ হাসি খুব চেনা-পরিচিত। খুব ভালোলাগার। এতদিনে কত কিছুই ভুলে গেছি! ধূলিময় স্মৃতির ডায়েরিটা সোনালী আলো ছড়িয়ে দিলো এক নিমিষেই। ওই আলো আমায় স্তব্ধ করে দেয়। অন্ধ করে দেয়, ভুলিয়ে দেয় আমার রহস্যময় বর্তমান।

বুকের ভেতর অন্যরকম অনুভূতি। এ মুখ আমায় প্রশস্তি দেয়। একসময় খুব ভালবাসতাম। এখন বাসি না। প্রয়োজন মনে করি না। তবে ওর কাছে আমি চির-ঋণী। ওকে দেখেই স্বপ্ন-বাজ হতে শিখেছি। বড় হতে শিখেছি। অপেক্ষা করতে শিখেছি। নীরবে কিভাবে ভালবাসতে হয়, তার কৌশল ওর কাছেই শেখা। এটি অতি গোপন রহস্য। পৃথিবীর আর কেউ জানবে না। জানানো হবেও না। এ প্রাপ্তি, আমি আমার আত্মার কাছে গোপন রাখতে পারিনি।

রিক্সায় উঠতেই চালক প্যাডেলে চাপ দেয়। আমি পেছনে পড়ে যাই। ভালো থাকিস, বলে আমিও উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করি। পেছন থেকে ও বলছিলো, আমি ফেসবুক ব্যবহার করি না, তবে ইমো চলাই।

আমি অবচেতনে বললাম, আচ্ছা ঠিক আছে। রিক্সার গতি বাড়তে থাকে। রিক্সা আমার পৈত্রিক বাড়ীর সীমানা পার হয়। আমি বাড়ি ফিরে আসি। বাড়িতে ভালো লাগছিলো না। উঠোনে বিষণ্ণতা খেলা করছে। কিছুক্ষণ পর আনমনে রাস্তায় ফিরে আসি। একটু আগে যেখান থেকে রিক্সাটি ছেড়ে গিয়েছিলো, ঠিক সেখানে হুক উঠানো অবিকল আরেকটি রিক্সাটি দাঁড়িয়ে আছে। কাছে ভিড়তেই আমি আবারও চমকে উঠি। স্তম্ভিত হই!

 

 

ফাহরেদিন শেহু একজন কবি, লেখক, প্রাবন্ধিক এবং বিশ্ব আধ্যাত্মিক রীতি ও ঐতিহ্য বিষয়ে স্বাধীন বৈজ্ঞানিক গবেষক। ১৯৭২ সালে কসোভোর দক্ষিণ পূর্ব রাহেভেকে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রিস্টিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচ্য গবেষণা বিষয়ে স্নাতক।

শন্খের মালা ফাহরেদিন শেহু একটি জনপ্রিয় কবিতা। একে বাংলায় রূপান্তর করেছেন কবি তারিক সামিন।

 

শন্খের মালা

মূল: ফাহরেদিন শেহু

অনুবাদ: তারিক সামিন

 

আমাদের সকল ব্যাপ্তি সত্ত্বেও

অভিশপ্ত  ফোটাগুলো পতিত হচ্ছে

কোমল ত্বকের উপর।

পুরাতন কবরস্থান যাবার পথে

একপাল পায়রা এক একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে

যাত্রীদের দিকে।

আমরাই ছিলাম সেই যাত্রী

মাটিতে অনধিকার

প্রবেশকারী।

 

আমরা ততক্ষন গলধরন করি

যতক্ষণ না এটি ধনীদের পেটের মতন পূর্ণ হয়,

আমরা তো ধনী নই

তারপরও আমরা পূর্ণ;

পার্থিব জিনিস আমাদের বোধ সংকীর্ণ করেছে

এবং আমাদের সিদ্ধান্তগুলোকে ।

 

একটি বয়সের জন্য আমারা ভাবপ্রবণ

যখন আমরা পুরুষরা ভালবাসতে সক্ষম।

সেটা না বললে অথবা

উচ্চারণ না করে বললে

অনেক বেশী কামনাপূর্ণ

দৈনিদিন একটি জৈবিক গ্রাস।

 

পর্যটক ও দর্শক হিসেবে

আমরা প্রাচীন ঐতিহ্যর উপর দাম্ভিকভবে দাঁড়িয়ে।

নারী ও শিশু এবং

তাদের সঙ্গে বলপূর্বক অধিকারগুলো

তাহারা স্বয়ং ঈর্ষানিত্ভাবে রক্ষাকরে

তাদের মৃত সংস্কারকে।

আমরা এই সম্পর্কে সচেতন

কিন্তু কার্যকর কোন শব্দ উচ্চারন করি না

আঘাত ও বিস্ফোরিত  করতে।

 

আমাদের ফেরার পথে

আমার প্রিয়তমা হারিয়েছে

ভারত মহাসাগরের শন্খ দিয়ে তৈরি একটি মালা

আমি জেরুজালেমের বাজার থেকে সেটি কিনেছিলাম

একজন আর্মেনীয় বণিক থেকে

এবং আমরা কখনোই দু:খ প্রকাশ করিনি সেজন্য।

 

-তারিক সামিন

 

যে শাড়ীটা পড়ে এতক্ষন রান্না-বান্না করছিলেন, সেটা পরেই তাড়াহুড়া করে ছোট বোনের বাসার দিকে ছুটলেন নিলুফার পারভীন।

নিলুফার পারভীনের বয়স ৪৮ বৎসর। এক ছেলে, এক মেয়ে আর স্বামী। এই চারজনের সংসার। তবুও অভাব অনটন লেগেই আছে। স্বামী সগীর আহম্মদ। চাকুরী থেকে অবসর গ্রহন করে; মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং এর প্রতারনায় এখন প্রায় সর্বশান্ত।

এ যুগে অমন সরল মানুষের পক্ষে টিকে থাকা দায়। সরকারী চাকুরী জীবনে অসৎ আয়-উপার্জন করেননি। কখনো কারো ক্ষতি করেছেন এমনও শোনা যায়নি।

 

নিলুফার পারভীন এর মেয়ে শুভ্রা, তার প্রথম সন্তান। এবার এসএস.সি পরীক্ষা দেবে। খুব ভাল ছাত্রী। একা একা পড়াশোনা করে। তবুও তার রেজাল্ট ভাল। খুব লাজুক আর প্রচন্ড হ্নীন্যমনতায় ভুগে মেয়েটি।

এক ছেলে শুভ্র। ক্লাস সিক্সে পড়ে। দুরন্ত-ডানপিটে স্বভাবের, বাবা-মা কারো কথা শুনতে চায় না। সারাদিন বাইরে বাইরে খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকে।

নিলুফার পারভীনরা চার বোন, এক ভাই। তার ছোট বোন ইয়াসমিনের এর বাসা পাশের লাইনে। সেখানেই ছুটছেন তিনি।

এই মহল্লার বাড়ী গুলো সব আড়াই কাঠা জমির উপর তৈরী। দশ বছর আগে প্রাইভেট হাউজিং কোম্পানীর কাছ থেকে একটা প্লট কিনে টিনশেড বাড়ী করে তার স্বামী। বছর দুই পর তার ছোটবোন ইয়াসমীন একদিন খুব করে ধরলো।

- আপা তোদের বাসার সাথে একটা প্লট কিনে দে।

- সে কিরে, এখনতো দাম অনেক বাড়তি! বিস্ময় প্রকাশ করলো নিলুফার।

- ‘তো!’। ঠোট উল্টে বললো ইয়াসমিন।

- এত দাম দিয়ে মোজ্জামেল বাড়ী কিনবে?

- কিনবে। না কিনতে পারলে যে ব্যাটা কিনতে পারবে তার সাথে গিয়ে ঘর করবো।

- ছিঃ!

- এমন একটা বিয়ে দিয়েছ। বলেই কান্না শুরু করলো ইয়াসমিন।

 

সেই সময় অনেক খোজাখুজি করে জানা গেল, ঠিক পাশের লাইনে একটা প্লট বিক্রি হবে। দাম বিশ লক্ষ টাকা। দালালেল খরচ, নামজারী এসব মিলিয়ে আরো ত্রিশ- পয়ত্রিশ হাজারের মত লাগবে।

বিশ লাখ টাকা দুলা ভাইয়ের হাতে দিয়ে, ইয়াসমিন বললো,

- দুলা ভাই, আর কোন টাকা দিতে পারবো না। আপনি দামা-দামি করে এক-দুই লাখ টাকা কমান।

- আচ্ছা, চেষ্টা করে দেখি। তুমি কোন চিন্তা করো না। এই টাকায় হয়ে যাবে।

বাকী পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা নিজের পকেট থেকে দিয়েছিলেন তার স্বামী, নিলুফার কখনো ছোট বোনকে বলেনি সে কথা। জায়গাটা কেনার পর পরই ইয়াসমিনের স্বামী মোজাম্মেল গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীতে সাপ্লাই এর ব্যবসাটা বন্ধ করে, নিজেই একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী চালু করে। এখন ওদের অনেক অর্থ-সম্পদ। বাড়ীটা সাত তলা করেছে পাঁচ বছর হলো। সাভারে নিজস্ব মার্কেট আছে, গ্রামে অনেক জমি আছে। আরো কত কি! বোনের সুখে অনেক ভাল লাগে নিলুফার পারভীনের।

 

ইয়াসমিনদের গেটে তালা মারা, কলিং বেল চাপতে দারোয়ান গেট খুলে দিল। ইয়াসমিনের দুই ছেলে আরিফ আর মারুফ। ক্রিকেট খেলছিল। বড় খালাকে দেখে ইদানিং আর খুশি হয়ে উঠে না আগের মত।

তিন তলার দরজা খোলাই ছিল। ভীতরে ঢুকলো নিলুফার পারভীন । ড্রইং রুমে বসে পাঁচ তলার ভাড়াটিয়া মহিলার সাথে গল্প করছিল ইয়াসমীন।

- আসসালামু-আলাইকুম, কেমন আছেন আপা? জিজ্ঞাসা করলো ভাড়াটিয়া অল্প বয়সী মহিলাটি।

- ওয়ালাইকুম সালাম, ভাল।

- তোমার কি খবর ?

- এই তো ভাল।

- শবনম আপা পরে কথা বললো। ঘাড় নেড়ে বললো ইয়াসমিন।

- জী আপা আসি। বলে চলে গেল শবনম।

সুন্দর একটা থ্রি-পিছ পরে আছে ইয়াসমিন। দিন দিন ওর স্বাস্থ্যটা ভারী হচ্ছে। বাসায় তেমন কোন কাজ নাই। সব কাজ বুয়ারাই করে। ঘুম, শপিং আর টেলিভিশন নিয়ে কাটে ওর সময়। নিলুফার এর থেকে দশ বছরের ছোট ইয়াসমিন। লম্বা, শ্যামলা আর ভারী শরীর। গোল মুখ, ছোট নাক, গলায় উপর, চিবুকের নিচে মাংস ঝুলে আছে অতিরিক্ত মেদ বহুল স্বাস্থ্যের কারনে।

 ইয়াসমিন হেসে বললো, ‘আপা আসছো ভাল হইছে।’

- ক্যানোরে?

- বসো, তোমারে একটা জিনিস দেখাই। লাল গহনার বাক্সটা খুলে চকচকে সোনার হারটা দেখালো বোনকে।

- দ্যাখো আপা, নতুন বানালাম।

- বাহ্‌ বেশ সুন্দরতো। মিষ্টি করে হাসলেন নিলুফার।

- পুরো পাঁচ ভরি। আমিন জুয়েলার্স থেকে বানানো।

- দারুন! ভাল মানাবে তোকে।

- হুম! খুশিতে চকচক করে উঠলো ইয়াসমিনের চোখ।

- শুভ্রা এবার টেষ্ট পরীক্ষায় খুব ভাল রেজাল্ট করেছে। নিচু স্বরে বললো নিলুফার।

- হ্যাঁ শুনছি তো। খানিকটা বিরক্ত গলায় বললো ইয়াসমিন। তার চোখ এখনো গহনার দিকে।

- স্কুল থেকে বলছে। আগামী ছয় মাস স্পেশাল কোচিং করাবে। তাহলে নাকি ‘এ প্লাস’ পাবে।

- ভালতো।

- পাঁচ হাজার টাকা লাগবে। ধার দিতে পারবি। তোর দুলা ভাই এক মাস পরে দিয়ে দিবে।

 দপ করে ইয়াসমিনের মুখের চকচকে ভাব মুছে কালো হয়ে গেল ।

- আপা, আমিতো দেড় লাখ টাকা দিয়ে হার বানালাম। আরিফ-মারুফ ইংলিশ মিডিয়ামে পরে, ওদের স্কুলের বেতন মাসে চল্লিশ হাজার টাকা। বলে একটু দম নিল ইয়াসমিন।  ‘দারোয়ান-বুয়া-ড্রাইভারদের বেতন দিলাম আজকে। এখনতো বিষ খাবার টাকাও নাই। যেন অবাক হয়েছে এমন ভাবে বললো ইয়াসমিন।’

অনেক কষ্টে নিজেকে সামলালেন নিলুফার। শাড়ীর আঁচলে মুখ মুছলেন।

- ঠিক আছে। অসুবিধা নাই। তোর দুলাভাই থেকে চেয়ে নেব। নিস্পলক চেয়ে রইলেন নিজের বোনের দিকে।

- ও, ঠিক আছে।

- আচ্ছা আসিরে।

দরজা দিয়ে মাথা নিচু করে বিষন্ন মনে বোনের বাসা থেকে বেরিয়ে এলেন নিলুফার।

তার এত ধনী বোন থাকতে!(?) পাশের বাসার ভাবীর কাছ থেকে টাকাটা ধার নেবার সময়, লজ্জায় মরে যাচ্ছিন নিলুফার পারভীন ।

 

 

লেখক পরিচিতি:
শরাফত হোসেন মূলত কবি। প্রকাশিত কবিতার বই ‘ঘাসঢুল তোমার সাথে’ ও ‘ফিরে আসি কাচের শহরে’। জন্ম ১ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। বাবা জয়দুল হোসেন, মা হাসনেয়ারা বেগম। স্কুল জীবন থেকেই নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত। লেখালেখির শুরু ওই সময়েই।  একাধিক জাতীয় দৈনিকের বিশেষ সংখ্যা সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০০৭ সাল থেকে ‘সাহিত্য একাডেমি পত্রিকা’র নির্বাহী সম্পাদক। সম্পাদনা করছেন ‘বুক রিভিউ’। বর্তমানে কাজ করছেন সংবাদ মাধ্যমে। পড়াশুনা ব্যবসায় প্রশাসনে। জাতীয় কবিতা পরিষদ, পেন বাংলাদেশ, সাহিত্য একাডেমিসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক একাধিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি প্রসারে নিজেকে নিয়োজিত করে আনন্দ পান।


অখণ্ড 

শরাফত হোসেন

এক.
শৈশবের শ্লেটে সাজিয়ে রাখি সারি সারি দুঃখ
চায়ের ধোঁয়ায় শিশির জমে কাচঘেরা পাতাগাছে
চোরাস্বপ্নেরা ডুবে থাকে গানে-কবিতায়

দুই.
অবিরত ঝরে পড়া বৃষ্টির জলে জেনেছি
দুঃখ বলে কিছু নেই; আছে হাহাকার
অতৃপ্তি- না পাওয়া!

তিন.
হলুদ শার্টে তোমার আকাশ ফিকে হয়ে আসে
কালো চুলে ওপরে ওঠার সিঁড়ি
একটু হাসো- তোমার নিঃশ্বাসে গেয়ে উঠবে পাখি
বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে জল খুঁজে পাবে আশ্রয়

যেমন আমি- ভরদুপুরে, বৃষ্টিতে, রোদ্দুরে
এমনকি অন্ধকারে খুঁজে বেড়ায় শব্দমালা
তোমার নূপুরে, গলার লকেট, কানের দুলে-
অথবা দীর্ঘশ্বাসে।



সীমানা 
শরাফত হোসেন

আকাশে গুচ্ছ মেঘের দল আনমনে পেরিয়ে যায় সীমারেখা
নিজের অজান্তেই শালিক পাখিটি ওপার ঘুরে আসে।

তোমাদের সীমানা প্রাচীর হয়ে বৃষ্টির জল
নেমে আসে এ তল্লাটে- অনায়াসে
ঝড়ো হাওয়ার সাথে শুকনো পাতার দল।
সাগরের স্বচ্ছ জলে মুখ লুকাতে হাপিয়ে উঠি
আলিঙ্গনের দূরত্ব রাইফেলের নল
এপারে আসতে মানা, ওপারে যেতে
এই পথ আমার নয়; ওই পথ তোমার
হৃদয়ে রক্ত ঝরে, শীতল হয়-
এপারে জল ছুঁয়ে দিলে তোমার উঞ্চতা অনুভব করি
বাতাসে সুগন্ধী
এপারে আসতে মানা, ওপারে যেতে
অন্ধকার ডুবে থাকে কাঁটাতার জুড়ে।



ফলন
শরাফত হোসেন

স্মৃতিরা ছবি হয়ে ভাসে; ছবি কেবলই স্মৃতি।
পাতাদের মজ্জাগত দোষ, কথা বলে বাতাসে
এই গরমে নাড়িস না কেউ জল
ভাতের হাড়ি ভাঙিস না কেউ।
উঠোন ভরতি মানুষ ছিল- হারিয়ে গেছে
সোনালি দিন মিলিয়ে গেল জলের দেশে
নাড়িস না কেউ জল।

মাটির চুলা একই আছে; ধুপধোঁয়া মন
ধানের ডগায় বসছে শিশির; শর্ষে ফুলে মৌ।

 -তারিক সামিন 

কি আর্শ্চায এক গভীরতা

প্রশান্তি আছে তোমার মাঝে,

আর-

কি আশ্চর্য এক অস্থিরতা

বিরাজ করে আমার মাঝে।

তুমি কত শান্ত-প্রেমময়ী-বাস্তববাদী

আর-

আমি কী ভাববাদী রুপকময়ী!

তুমি যখন আকাশের মত বিস্তৃত হও

তখন আমি সাগরের গভীরতা খুঁজি,

বিপ্লব-বিদ্রোহ আর বাধভাঙা আমার নীতি

বাঁধন-বশীকরণ আর সম্মোহন তোমার রীতি।

আমি ভেঙে গড়তে চাই

মরে চাই বাঁচতে;

তুমি নিশ্চয়তা চাও

আর চাও ভালোবাসতে।

Page 1 of 2

লেখা পাঠাবার নিয়ম

মৌলিক লেখা হতে হবে।

নির্ভুল বানান ও ইউনিকোড বাংলায় টাইপকৃত হতে হবে।

অনুবাদ এর ক্ষেত্রে মুল লেখকের নাম ও সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি দিতে হবে।

আরো দিতে পারেন

লেখকের ছবি।

সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি।

বিষয় বস্তুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অঙ্কন চিত্র বা ছবি। 

সম্পাদক | Editor

তারিক সামিন

Tareq Samin

This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

 

লেখা পাঠাবার জন্য

ইমেইল:

This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

 

We use cookies to improve our website. Cookies used for the essential operation of this site have already been set. For more information visit our Cookie policy. I accept cookies from this site. Agree