স্মৃতির ডায়েরি সোনালী আলো ছড়ায়

09 June 2018
Author :  

-কাদের পলাশ।

 

বিষণ্ণ মন। ভাবছি কিছু সময়ের জন্যে নগর জীবন ছেড়ে শীতলতায় গা ভাসিয়ে দিই। ছুটে যাই সবুজ অরণ্যে, কাঁদা মাটি জড়িয়ে রাখা ঘাসের বিছানায়। আম কিংবা কাঁঠাল বাগানের ভিড়ে। যেখানে উচ্ছল শৈশব কাটিয়েছি মহানন্দে। মোটরসাইকেলে চড়ে খুব দ্রুত সময়ে মায়ের কাছে পৌঁছে যাই। বাড়িতে মা নেই। মাকে খুঁজছি। তবে ডাক দিচ্ছি না। চমকে দেবো বলে। বাড়ির আঙিনা মাড়িয়ে ঘরে ঢুকি। সিটকানি খুলে ঘরে ঢুকে কাঁধের ব্যাগ রাখতে রাখতে, মাকে নিচু গলায় ডাকলাম। মায়ের কোনো সাড়া শব্দ নেই। বাড়িতে খাঁ খাঁ নীরবতা। গ্রামের সেই কোলাহল এখন শহরে পাড়ি জমিয়েছে। হঠাৎ একটা পাখি ডেকে উঠলো। চেনা সুর। না দেখে নাম বলা মুশকিল। বিকেলের বুকে এতো মধুর সুরে গান গায় কোন পাখি? যে গানের সুরে হারিয়ে যাই দেড় যুগের অতীতে। কিশোর জীবনে।

আমি দ্রুত ছুটে আসি। ঘরের আগ দরজা ডিঙিয়ে উঠোনে নজর যেতেই আমি চমকে উঠি। স্তম্ভিত হই। কি করবো কিংবা কি বলবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। পনের বছর আগের পছন্দের পাখি ছানা নিয়ে আমার আঙিনা দাঁড়িয়ে। বুকের মাঝ বরাবর হাত দিয়ে দেখি; কোনো সাড়া শব্দ নেই। ভয় নেই, ধড়পড় কিংবা কোনো কম্পন নেই।

আমি ফিরে দেখি ফেলে আসা স্মৃতির ক্যানভাসে। যেখানে মান-অভিমান আরো কত কী ছুটোছুটি করতো। দমের ঘনত্ব, ধড়পড়, শরীরের কাঁপন বেড়ে যেতো তার উপস্থিতিতে। কত দিন, কত রাত ওকে ভেবে পার করেছি। রাস্তার মোড়ে অপেক্ষায় ছিলাম দিনের পর দিন। যার চলন, আমায় আন্দোলিত করে। যার সরল মুখ, আমায় পথ বাতলে দেয়। আমি হাঁটি স্বপ্নের রাজ্যে। পিছু পিছু ঘুরি। যার চোখে, খুঁজে পাই মর্ত্যের সীমাহীন মুগ্ধতা। যার পায়ে ভর করে হাঁটি হাজার বছরের কাঁচা মাটির পথ। যার হাত ছুঁয়ে দেখি ফুলেদের শরীর। নাকে নিই মহুয়া ঘ্রাণ।

আমায় দেখে তার অবুঝ হয়ে যাওয়া অভিনয় ছিলো মাত্র। ওর ভণিতা আমি বুঝতাম। আমার অপেক্ষা; তথা রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকার কষ্ট তাকে ভালবাসতে প্রেরণা দিতো বলে; আজো বোধকরি পুলকিত হয় সে। আমার অব্যক্ত করুণ আর্তি দেখে আমোদিত হতো। ঠোঁটে মিহি কাঁপন উঠতো। বুঝতো না; কিংবা বুঝেও না বুঝার ভান করতো। আমি উপভোগ করতাম মধুর কষ্ট। আমার দীর্ঘশ্বাসে উড়তো তোমার, চুল, ওড়না এমনকি মন! বুকের বাম পাশে চিনচিন ব্যথা হতো। বুঝাতে পারতাম না। আজও পারি না।

বেশ কিছু সময় গত হওয়ার পর, তার মুখে কেমন আছি? জানতে চাওয়ার জবাব দিতে আমি ভুলে যাই। যদিও আমার চোখে মুখের মুগ্ধতার আভা আড়াল করতে পারিনি। ভালো বা মন্দ; কোনো উত্তর না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন ছুড়ি কেমন আছিস?

-ভালো। তুই কেমন?

ওর কথাগুলোই এমন। অল্প কথায় হাজার কথার জবাব। মনে মনে ভাবি, তুই বলতে থাক। এ মুহূর্তে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে মনোযোগী শ্রোতা।

-কিরে কিছু বলবি না?

আমি হুশ ফিরে পাই। ভালো না থাকার উপায় কী বল? এমন প্রশ্নের জবাবে; মানুষ জেনে শুনে কিংবা মনের অগোচরে মিথ্যে উত্তর দেয়। কারণ মানুষের ভালো থাকা হয়ে উঠে না। ভালো না থাকার কোটি কারণের মধ্যে একটা না একটা কারণ  থাকেই। যাহোকে, আমিতো এ প্রিয় মুখের কথা শুনতেই যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী অপেক্ষার প্রহর গুনেছি। পৃথিবীর সব মানুষ অপেক্ষায় থাকে, বুঝে না বুঝে; দুভাবেই। দুর্বোধ্য বা অস্পষ্ট সে অপেক্ষা। পৃথিবীর প্রতিটি প্রেমিক পুরুষ অপেক্ষায় থাকে, হৃদয় গহীনে প্রথম বসত করা নারীটির মুখোমুখি হবার। কারো হয়ে উঠে, কারো নয়। যে ক্ষেত্রে আমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন।

বারবার অজানায় আমার হারিয়ে যাওয়া দেখে, ও বলে উঠে,

-ও আমার মেয়ে। নাম সৌমিতা। হঠাৎ করে ইচ্ছে হলো; তাই রিক্সা থেকে নেমে তোদের বাড়িতে ঢুকে পড়লাম।

-কিউট! ভারি মিষ্টি হয়েছে তোর মেয়ে। মনের অজান্তেই ছোট মেয়েটির মুখে ফের নাম জানতে চাই।

 মেয়েটি নাম না বললেও তার মা বলে সৌমিতা। আমি শুনেছি কি শুনিনি; বুঝতে পারিনি।

এর ফাঁকেই মা ও বাবা এসে হাজির বাড়ির আঙিনায়। দুইজনেই জানতে চাইলেন ওরা কারা? আমি মেয়েটির মাকে দেখিয়ে বললাম, আমরা একসাথে পড়েছি। এরচেয়ে খুব ভালো পরিচয় দেয়ার সুযোগ হতে পারতো। কিংবা পরিচয় না দিলেও চলতো। কিন্তু সে পরিস্থিতি তৈরি করতে দেয়নি বাস্তবতা। সময় এমনই। সময় মানুষের পরিচয় ভুলিয়ে দেয়। পরিচয় করিয়ে দেয়। এ সময়ই মানুষকে মনে রাখতে দেয় না। আবার সময়ই মানুষকে মনে রাখে। তাইতো আমরা এ সময়ের সাথেই থাকি, চলি। সময়ের কাছেই হার মানি।

মা বললেন, পোলা আমার পাইক্কা গেছে। বড় দার্শনিক হইয়া গ্যাছে মনে অইতেছে। কতা কম কও। ওদের ঘরে নিয়ে বসতে দাও। বাবা বললেন, এমএ পাস কইরা ভদ্রতা ভুইলা গ্যাছো বেটা? যাও; মা তোমরা ঘরে গিয়ে বসো। তোমার খালাম্মা নাস্তা দিচ্ছে।

-না! না! খালাম্মা। রাস্তায় রিক্সা রেখে এসেছি। মা ঘর থেকে খুব দ্রুত দু’টা কমলা এনে মেয়ের হাতে গুজে দেয়। মেয়েটি নিতে চায় না। মা-মেয়েদুজন, বিদায় নিয়ে রিক্সার দিকে এগোয় । সাথে আমিও। আমি কেন হাঁটছি জানি না। কোনো সৌজন্যতার প্রয়োজন আছে কী না! তাও জানি না। আমার পা এগোই না।  মনে হয়, পেছন থেকে কেউ একজন আমার পায়ের কদম বাড়িয়ে দেয়।

ওরা আঙিনা পার হয়। সাথে আমিও। আমি কী হাঁটছি, না ভাসছি? বুঝতে পারছি না। রিক্সায় উঠে বসার পর একটা মিহি হাসি ঠোঁটে লেপ্টে ছিলো ওর মুখে। এ হাসি খুব চেনা-পরিচিত। খুব ভালোলাগার। এতদিনে কত কিছুই ভুলে গেছি! ধূলিময় স্মৃতির ডায়েরিটা সোনালী আলো ছড়িয়ে দিলো এক নিমিষেই। ওই আলো আমায় স্তব্ধ করে দেয়। অন্ধ করে দেয়, ভুলিয়ে দেয় আমার রহস্যময় বর্তমান।

বুকের ভেতর অন্যরকম অনুভূতি। এ মুখ আমায় প্রশস্তি দেয়। একসময় খুব ভালবাসতাম। এখন বাসি না। প্রয়োজন মনে করি না। তবে ওর কাছে আমি চির-ঋণী। ওকে দেখেই স্বপ্ন-বাজ হতে শিখেছি। বড় হতে শিখেছি। অপেক্ষা করতে শিখেছি। নীরবে কিভাবে ভালবাসতে হয়, তার কৌশল ওর কাছেই শেখা। এটি অতি গোপন রহস্য। পৃথিবীর আর কেউ জানবে না। জানানো হবেও না। এ প্রাপ্তি, আমি আমার আত্মার কাছে গোপন রাখতে পারিনি।

রিক্সায় উঠতেই চালক প্যাডেলে চাপ দেয়। আমি পেছনে পড়ে যাই। ভালো থাকিস, বলে আমিও উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করি। পেছন থেকে ও বলছিলো, আমি ফেসবুক ব্যবহার করি না, তবে ইমো চলাই।

আমি অবচেতনে বললাম, আচ্ছা ঠিক আছে। রিক্সার গতি বাড়তে থাকে। রিক্সা আমার পৈত্রিক বাড়ীর সীমানা পার হয়। আমি বাড়ি ফিরে আসি। বাড়িতে ভালো লাগছিলো না। উঠোনে বিষণ্ণতা খেলা করছে। কিছুক্ষণ পর আনমনে রাস্তায় ফিরে আসি। একটু আগে যেখান থেকে রিক্সাটি ছেড়ে গিয়েছিলো, ঠিক সেখানে হুক উঠানো অবিকল আরেকটি রিক্সাটি দাঁড়িয়ে আছে। কাছে ভিড়তেই আমি আবারও চমকে উঠি। স্তম্ভিত হই!

 

 

175 Views
Literary Editor

লেখা পাঠাবার নিয়ম

মৌলিক লেখা হতে হবে।

নির্ভুল বানান ও ইউনিকোড বাংলায় টাইপকৃত হতে হবে।

অনুবাদ এর ক্ষেত্রে মুল লেখকের নাম ও সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি দিতে হবে।

আরো দিতে পারেন

লেখকের ছবি।

সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি।

বিষয় বস্তুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অঙ্কন চিত্র বা ছবি। 

সম্পাদক | Editor

তারিক সামিন

Tareq Samin

This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

 

লেখা পাঠাবার জন্য

ইমেইল:

This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

 

We use cookies to improve our website. Cookies used for the essential operation of this site have already been set. For more information visit our Cookie policy. I accept cookies from this site. Agree