অভাবী।
Featured

08 June 2018
Author :  

|| তারিক সামিন ||

 

যে শাড়ীটা পড়ে এতক্ষন রান্না-বান্না করছিলেন, সেটা পরেই তাড়াহুড়া করে ছোট বোনের বাসার দিকে ছুটলেন নিলুফার পারভীন।

নিলুফার পারভীনের বয়স ৪৮ বৎসর। এক ছেলে, এক মেয়ে আর স্বামী। এই চারজনের সংসার। তবুও অভাব অনটন লেগেই আছে। স্বামী সগীর আহম্মদ। চাকুরী থেকে অবসর গ্রহন করে; মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং এর প্রতারনায় এখন প্রায় সর্বশান্ত।

এ যুগে অমন সরল মানুষের পক্ষে টিকে থাকা দায়। সরকারী চাকুরী জীবনে অসৎ আয়-উপার্জন করেননি। কখনো কারো ক্ষতি করেছেন এমনও শোনা যায়নি।

 

নিলুফার পারভীন এর মেয়ে শুভ্রা, তার প্রথম সন্তান। এবার এসএস.সি পরীক্ষা দেবে। খুব ভাল ছাত্রী। একা একা পড়াশোনা করে। তবুও তার রেজাল্ট ভাল। খুব লাজুক আর প্রচন্ড হ্নীন্যমনতায় ভুগে মেয়েটি।

এক ছেলে শুভ্র। ক্লাস সিক্সে পড়ে। দুরন্ত-ডানপিটে স্বভাবের, বাবা-মা কারো কথা শুনতে চায় না। সারাদিন বাইরে বাইরে খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকে।

নিলুফার পারভীনরা চার বোন, এক ভাই। তার ছোট বোন ইয়াসমিনের এর বাসা পাশের লাইনে। সেখানেই ছুটছেন তিনি।

এই মহল্লার বাড়ী গুলো সব আড়াই কাঠা জমির উপর তৈরী। দশ বছর আগে প্রাইভেট হাউজিং কোম্পানীর কাছ থেকে একটা প্লট কিনে টিনশেড বাড়ী করে তার স্বামী। বছর দুই পর তার ছোটবোন ইয়াসমীন একদিন খুব করে ধরলো।

- আপা তোদের বাসার সাথে একটা প্লট কিনে দে।

- সে কিরে, এখনতো দাম অনেক বাড়তি! বিস্ময় প্রকাশ করলো নিলুফার।

- ‘তো!’। ঠোট উল্টে বললো ইয়াসমিন।

- এত দাম দিয়ে মোজ্জামেল বাড়ী কিনবে?

- কিনবে। না কিনতে পারলে যে ব্যাটা কিনতে পারবে তার সাথে গিয়ে ঘর করবো।

- ছিঃ!

- এমন একটা বিয়ে দিয়েছ। বলেই কান্না শুরু করলো ইয়াসমিন।

 

সেই সময় অনেক খোজাখুজি করে জানা গেল, ঠিক পাশের লাইনে একটা প্লট বিক্রি হবে। দাম বিশ লক্ষ টাকা। দালালেল খরচ, নামজারী এসব মিলিয়ে আরো ত্রিশ- পয়ত্রিশ হাজারের মত লাগবে।

বিশ লাখ টাকা দুলা ভাইয়ের হাতে দিয়ে, ইয়াসমিন বললো,

- দুলা ভাই, আর কোন টাকা দিতে পারবো না। আপনি দামা-দামি করে এক-দুই লাখ টাকা কমান।

- আচ্ছা, চেষ্টা করে দেখি। তুমি কোন চিন্তা করো না। এই টাকায় হয়ে যাবে।

বাকী পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা নিজের পকেট থেকে দিয়েছিলেন তার স্বামী, নিলুফার কখনো ছোট বোনকে বলেনি সে কথা। জায়গাটা কেনার পর পরই ইয়াসমিনের স্বামী মোজাম্মেল গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীতে সাপ্লাই এর ব্যবসাটা বন্ধ করে, নিজেই একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী চালু করে। এখন ওদের অনেক অর্থ-সম্পদ। বাড়ীটা সাত তলা করেছে পাঁচ বছর হলো। সাভারে নিজস্ব মার্কেট আছে, গ্রামে অনেক জমি আছে। আরো কত কি! বোনের সুখে অনেক ভাল লাগে নিলুফার পারভীনের।

 

ইয়াসমিনদের গেটে তালা মারা, কলিং বেল চাপতে দারোয়ান গেট খুলে দিল। ইয়াসমিনের দুই ছেলে আরিফ আর মারুফ। ক্রিকেট খেলছিল। বড় খালাকে দেখে ইদানিং আর খুশি হয়ে উঠে না আগের মত।

তিন তলার দরজা খোলাই ছিল। ভীতরে ঢুকলো নিলুফার পারভীন । ড্রইং রুমে বসে পাঁচ তলার ভাড়াটিয়া মহিলার সাথে গল্প করছিল ইয়াসমীন।

- আসসালামু-আলাইকুম, কেমন আছেন আপা? জিজ্ঞাসা করলো ভাড়াটিয়া অল্প বয়সী মহিলাটি।

- ওয়ালাইকুম সালাম, ভাল।

- তোমার কি খবর ?

- এই তো ভাল।

- শবনম আপা পরে কথা বললো। ঘাড় নেড়ে বললো ইয়াসমিন।

- জী আপা আসি। বলে চলে গেল শবনম।

সুন্দর একটা থ্রি-পিছ পরে আছে ইয়াসমিন। দিন দিন ওর স্বাস্থ্যটা ভারী হচ্ছে। বাসায় তেমন কোন কাজ নাই। সব কাজ বুয়ারাই করে। ঘুম, শপিং আর টেলিভিশন নিয়ে কাটে ওর সময়। নিলুফার এর থেকে দশ বছরের ছোট ইয়াসমিন। লম্বা, শ্যামলা আর ভারী শরীর। গোল মুখ, ছোট নাক, গলায় উপর, চিবুকের নিচে মাংস ঝুলে আছে অতিরিক্ত মেদ বহুল স্বাস্থ্যের কারনে।

 ইয়াসমিন হেসে বললো, ‘আপা আসছো ভাল হইছে।’

- ক্যানোরে?

- বসো, তোমারে একটা জিনিস দেখাই। লাল গহনার বাক্সটা খুলে চকচকে সোনার হারটা দেখালো বোনকে।

- দ্যাখো আপা, নতুন বানালাম।

- বাহ্‌ বেশ সুন্দরতো। মিষ্টি করে হাসলেন নিলুফার।

- পুরো পাঁচ ভরি। আমিন জুয়েলার্স থেকে বানানো।

- দারুন! ভাল মানাবে তোকে।

- হুম! খুশিতে চকচক করে উঠলো ইয়াসমিনের চোখ।

- শুভ্রা এবার টেষ্ট পরীক্ষায় খুব ভাল রেজাল্ট করেছে। নিচু স্বরে বললো নিলুফার।

- হ্যাঁ শুনছি তো। খানিকটা বিরক্ত গলায় বললো ইয়াসমিন। তার চোখ এখনো গহনার দিকে।

- স্কুল থেকে বলছে। আগামী ছয় মাস স্পেশাল কোচিং করাবে। তাহলে নাকি ‘এ প্লাস’ পাবে।

- ভালতো।

- পাঁচ হাজার টাকা লাগবে। ধার দিতে পারবি। তোর দুলা ভাই এক মাস পরে দিয়ে দিবে।

 দপ করে ইয়াসমিনের মুখের চকচকে ভাব মুছে কালো হয়ে গেল ।

- আপা, আমিতো দেড় লাখ টাকা দিয়ে হার বানালাম। আরিফ-মারুফ ইংলিশ মিডিয়ামে পরে, ওদের স্কুলের বেতন মাসে চল্লিশ হাজার টাকা। বলে একটু দম নিল ইয়াসমিন।  ‘দারোয়ান-বুয়া-ড্রাইভারদের বেতন দিলাম আজকে। এখনতো বিষ খাবার টাকাও নাই। যেন অবাক হয়েছে এমন ভাবে বললো ইয়াসমিন।’

অনেক কষ্টে নিজেকে সামলালেন নিলুফার। শাড়ীর আঁচলে মুখ মুছলেন।

- ঠিক আছে। অসুবিধা নাই। তোর দুলাভাই থেকে চেয়ে নেব। নিস্পলক চেয়ে রইলেন নিজের বোনের দিকে।

- ও, ঠিক আছে।

- আচ্ছা আসিরে।

দরজা দিয়ে মাথা নিচু করে বিষন্ন মনে বোনের বাসা থেকে বেরিয়ে এলেন নিলুফার।

তার এত ধনী বোন থাকতে!(?) পাশের বাসার ভাবীর কাছ থেকে টাকাটা ধার নেবার সময়, লজ্জায় মরে যাচ্ছিন নিলুফার পারভীন ।

 

 

275 Views
Literary Editor

লেখা পাঠাবার নিয়ম

মৌলিক লেখা হতে হবে।

নির্ভুল বানান ও ইউনিকোড বাংলায় টাইপকৃত হতে হবে।

অনুবাদ এর ক্ষেত্রে মুল লেখকের নাম ও সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি দিতে হবে।

আরো দিতে পারেন

লেখকের ছবি।

সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি।

বিষয় বস্তুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অঙ্কন চিত্র বা ছবি। 

সম্পাদক | Editor

তারিক সামিন

Tareq Samin

This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

 

লেখা পাঠাবার জন্য

ইমেইল:

This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

 

We use cookies to improve our website. Cookies used for the essential operation of this site have already been set. For more information visit our Cookie policy. I accept cookies from this site. Agree