‘নিরর্থক প্রহসনের ইতি’ : ভারজিনিয়া ওল্ফ -৩

27 September 2018
Author :  

।।।।

 

‘Sleep, that deptorable curtailment of the joy of life.’

ওল্‌ফের পারিবারিক ইতিহাসে মানসিক প্রতিবন্ধকতার উদাহরণ থাকলেও আত্মহত্যার উদাহরণ নেই। এক সৎ প্রতিবন্ধী বোন কিছুদিন তাঁদের সঙ্গে থাকলেও স্থায়ীভাবে তার সঙ্গে অভিজ্ঞতা ছিল না। কিন্তু ১৩ বছর বয়সে মার মৃত্যু ও তার দুবছর পরে সৎ বোন স্টেলার মৃত্যু এবং ২২ বছর বয়সে বাবার মৃত্যু তাঁকে মাঝে মাঝেই বিষাদগ্রস্ত করে রাখত। এই সময় এবং এর কিছুদিন আগে থেকেই ওল্‌ফ এবং তার বোন ভানেসা তাদের সৎ ভাই জর্জ ও জেরাল ডাকওয়ার্থের যৌন নিগ্রহের স্বীকার হতেন। আধুনিক জীবনীকারদের পাশাপাশি ওল্‌ফ নিজেই তাঁর আত্মজীবনীমূলক প্রবন্ধ ‘আ স্কেচ অফ দ্য পাস্ট’-এ নিজেই জানিয়েছেন। ব্যবহারের পরিবর্তন তাঁর সামাজিকতা ও সামাজিক সম্পর্কগুলোকে যে কতটা বিঘ্নিত করে সে সম্পর্ক তিনি সচেতন। ‘ব্লুমস বেরী গ্রুপ’-এর দিকপাল চিন্তাবিদদের সান্নিধ্যে তিনি আসেন--লিটন স্ট্র্যাচি, ক্লাইভ বেল, রুপার্ড ব্রক-এঁদের সঙ্গে intellectual repertoire-এ তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। এই গ্রুপেরই লিওনার্দ ওল্‌ফকে তিনি বিয়ে করেন, দুজনে মিলে হগার্থ প্রেস প্রতিষ্ঠা করেন, এবং নিজেরাই উপন্যাস প্রকাশের দায়িত্ব নেন। তবে একজন ইহুদিকে বিয়ে করার জন্য মাঝে মাঝে দুশ্চিন্তার ও উৎকন্ঠার জায়গা প্রশস্ত হত। ১৯১২ সালে বিয়ের ২৫ বছর পর ডায়েরিতে ওল্‌ফ লিখছেন : ‘আমাদের দাম্পত্য জীবন এত সম্পূর্ণ যে কোনো মুহূর্তে একজনকে আলাদা করে ভাবা যায় না--সবচেয়ে বড়ো কথা হল, স্ত্রী হিসেবে কেউ আমাকে চায় এই আনন্দ।‘ স্বামী স্ত্রী দুজনেই জানতেন তাঁরা হিটলারের ব্ল্যাক লিস্টে রয়েছেন। তবে ইহুদিদের সম্পর্কে তাঁর ধারণা ছিল মিশ্র। ইহুদিদের সহনশক্তির প্রতি যেমন শ্রদ্ধাশীল ছিলেন আবার উন্নাসিকতার সমালোচকও ছিলেন। একটা চাপা ফ্যাসিবাদের ভয় তাঁদের মধ্যে প্রবাহিত ছিল। কিন্তু তার লেখার মধ্যে সর্বপ্রথম স্থান পেয়েছে যা, তা হল ঘটনা ও চরিত্রের বৈশিষ্ট্যহীনতা, দৃশ্য ও শব্দের প্রাচুর্য, এক গীতিকাব্যিক মাধুর্য, অস্বাভাবিক চরিত্রের বিরলতা। অনেক সমালোচক ওল্‌ফের লেখার মধ্যে উচ্চমধ্যবিত্ত ইংরেজ বুদ্ধিজীবী সমাজের অতিরিক্ত প্রতিফলন ছাড়া আর কিছু খুঁজে পান না। তার ‘আ রুম অফ অয়ান্স’ (১৯২৯) ও ‘থ্রি গিনিস’( ১৯৩৮) প্রবন্ধগুচ্ছ যুদ্ধ, আক্রান্ত হবার যন্ত্রণা, শ্রেণীগত চেতনা, মহিলা লেখকদের ও বুদ্ধিজীবীদের আইনগত ও অর্থনৈতিক সমস্যা, শিক্ষা ও সমাজ, মেয়েদের ভবিষ্যত দীর্ঘ আলোচনার ক্ষেত্র জুড়ে রয়েছে। 

মনোবিজ্ঞানীরা ও মনস্তাত্ত্বিক সমালোচকদের কয়েকটি বক্তব্য লক্ষ্য করার মতো:

প্রথমত আত্মহত্যা সম্পর্কে ওল্‌ফের মন্তব্য, দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন আলাপচারিতায় আত্মহত্যার গুরুত্ব নিয়ে ওল্‌ফের প্রতিফলন, তৃতীয়ত, সমস্যার সমাধানের বা পরিত্রাণের ভাবনায় আত্মহত্যার স্থান ও গুরুত্ব। এ কথা সঠিক যে ওল্‌ফ তিরিশের দশকে বন্ধু সুরকার ও গীতিকার এথেল স্মিথকে লিখেছিলেন,

“আত্মহত্যার বিরুদ্ধে কি কি যুক্তি আছে, জানিও তো।...আমি জানতে চাই--‘এখানে সবকিছু শেষ করে দিই’-এই বোধটার বিরুদ্ধে যুক্তিটা কি?’’ (৩০ অক্টোবর,১৯৩০)। এর ছয় মাস পরে ২৯ মার্চ, ১৯৩১-এ আবার ওই প্রসঙ্গে লিখতে দেখা যায়। কোনো এক আয়োজনের শেষে, বাড়ি ফিরে, লিওনার্দের উদ্দেশ্যে লিখছেন : ‘If you weren’t here, I should kill myself-so much do I suffer.’’। দশদিন পরে ৮ এপ্রিল বিয়াত্রিচ্‌ ওয়েবকে আত্মহত্যা নিয়ে আলোচনা করতে শুনে তাঁকে লেখেন : ‘I wanted to tell you but was too shy, how much I was pleased by your views upon the possible justification of suicide. Having made the attempt myself, from the best of motives as I thought--not to be a burden on my husband--the conventional accusation of cowardice and sin has always rather rankled.’

আত্মহত্যা ভার্জিনিয়া ওল্‌ফের এক চির আকর্ষণের বিষয় ছিল। খুব নৈর্ব্যক্তিকভাবে সুস্থ অবস্থায় আত্মহত্যা নিয়ে ভাবতেন। অতীতের আত্মহত্যার সুপ্ত ইচ্ছাকে যুক্তি দিয়ে সমর্থনের প্রয়াস করে যেতেন। আত্মহত্যার হিতবাদী ব্যাখ্যা দিয়ে নিজের সান্ত্বনা খুঁজতেন। মৃত্যু তার বড়ো হওয়ার মধ্যে যেভাবে উপস্থিত,আর শিল্পীর তীক্ষ্ণতায় তা এতই ভাস্বর যে তার বর্তমান সব সময় অতীতের বাস্তবে বিঘ্নিত হতই, যা কাছের মানুষের অধরা থেকে যেত : ‘Each has his past shut in him shut in him like the leaves of a book known to him by his heart, and his friends can only read the title.’

 

 

 

।। ।।

 

‘Life is not a series of gig lamps symmetrically arranged; life is a luminous halo, a semitransparent envelop surrounding us from the beginning of consciousness to the end.’

তাহলে ভার্জিনিয়া ওল্‌ফের আত্মহত্যার রহস্যময়তা জীবন ও সৃজনের অতিরিক্ত কোনো দিকে আমাদের কি নিয়ে যায় না?

আত্মহত্যা মূলত দু ধরণের-একটি প্রথাগত, অপরটি ব্যক্তিগত।

সাধারণভাবে জীবনকে একাকীত্ব, ঘৃণা, প্রতিশোধ, ভয়, শারীরিক যন্ত্রণা, অপরাধবোধ, অর্থনৈতিক অবনমন, জীবনবিমুখতা বা এই ধরণের তীব্র মানসিক সংবেদনশীল অনুভূতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরে মানুষ আত্মঘাতী হয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, যে আত্মহত্যা করে, সে মানসিক রোগী হয়,যদিও তাৎক্ষণিকভাবে সে বিব্রত ও বিচলিত। এ সবের পরেও বলা যায়, শিল্পীর সংবেদনশীলতা অনেক সময় কি তাদের psychic censor-কে দুর্বল করে দেয়? কিন্তু ওল্‌ফের ক্ষেত্রে এই ব্যাখ্যাও প্রযোজ্য নয়।

এ কথা বলে শেষ করা যায় যে ভার্জিনিয়া ওল্‌ফের মতো বিদুষী, বুদ্ধিমতী, যুক্তিবাদী, রোমান্টিক, তীক্ষ্ণ আত্মসচেতন অভিজাত নারী, প্রথম সারির কথাশিল্পী ও প্রাবন্ধিক, মনস্তত্ত্বে গভীর জ্ঞান, উনষাট বছর বয়সে অনুভব করেছিলেন তাঁর শিল্পীসত্তার মুছে যেতে থাকা উদ্দীপক--যাকে বাদ দিয়ে তাঁর thinking, feeling, willing, অস্তিত্ব, চেতন-সত্তা আর তিনি চিনতে পারছিলেন না। মনস্তত্ত্বে যাকে নিরবচ্ছিন্ন আত্মউদ্দীপন বা continuous self-stimulation of an artist বলে, সেই স্বতোৎসারিত উদ্দীপন ও তার থেকে নিঃসৃত কল্পনার স্রোত যখন স্তব্ধ হতে শুরু করে, তখন সেই identity crisis বা সত্তার সঙ্কটকে কেউ কেউ মেনে নিয়ে বেঁচে থাকতে চান না। যেমন ধরা পড়েছে ইংরেজ কবি স্যামুয়েল টেলার কোলরিজের কবিতায় তাঁর ‘ডিজেকশন : অ্যান ওড’ কবিতায়, হয়তো ভার্জিনিয়া ওল্‌ফের অব্যক্ত যন্ত্রণার প্রতিধ্বনি শোনার চেষ্টা করা যেতে পারে, ‘unroused’ মুহূর্তের প্রকৃতি ধরা পড়ে-

This night, so tranquil now, will not go hence unroused by winds

কোলরিজের ‘dull pain’ ওল্‌ফের ভেঙ্গে পড়া ‘বিটুইন দ্য অ্যাক্টস’-এর অসংলগ্ন ‘বেদনাহীন তড়িতাহত’ শোকের মতো; চেষ্টা করেও বুঝতে পারছেন, কিন্তু অনুভবে কথনকে সিক্ত করতে পারছেন না। একেই কোলরিজ ভাষা দিয়েছিলেন :

 

My genial parts fail;

And what can these avail

To lift smothering weight from off my breast?

It were a vain endeavour…

 

তাই ভার্জিনিয়া ওল্‌ফ তাঁর শেষ লেখাকে ‘silly and trivial’ বলে চিহ্নিত করে বলেছিলেন ‘must be scrapped’। একসময় এই জগতের সব সমস্যাকে সৃষ্টির অন্তরমহলে জায়গা দেওয়া যেত :

 

       There was a time when though my path was rough,

       This joy within me dallied with distress,

       And all misfortunes were but as the stuff

       Whence Fancy made me dream of happiness:

       For hope grew round me, like the twining vire

       And fruits and foliage, not my own, seemed mine.

       But now afflictions bow me down to earth…

                                     (Dejection: An Ode)

সৃষ্টিশক্তি হারাবার শূন্যতা, ‘Reality’s dark dream’ ওল্‌ফ সহ্য না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁর এই মনে হওয়াটা কতটা সঠিক, তা ভিন্ন প্রসঙ্গের অবতারণা করবে। তিনি মানসিক রোগী ছিলেন না। মনরোগ বিশেষজ্ঞরা হতাশা, বেদনা, বিষাদকে মানসিক রোগ অন্তত বলেন না। ভেঙ্গে পড়া একটি মানসিক লক্ষণমাত্র। কিন্তু আত্মহননকে অনেক ক্ষেত্রে নিজের পরম শত্রুকে হত্যার এক পদক্ষেপ হিসাবে মনস্তাত্ত্বিক চিহ্নিত করেন। ওল্‌ফের শত্রু কে ছিলেন? তবে কি সৃষ্টির শেষ আলোতে দেখা নিজের নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার শূন্য সত্তাকে হত্যা করতেই তাঁর আত্মহত্যা ?

 

তথ্য ও উদ্ধৃতি সূত্র :

   

        দ্য ডায়েরি অফ ভার্জিনিয়া ওল্‌ফ(১০৫ খন্ড,১৯১৫-১৯৪১)

        প্যাশানেট অ্যাপ্রেনটিস : দ্য আরলি জার্নালস (১৮৯৭-১৯৪১)

        দ্য লেটারস অফ ভার্জিনিয়া ওল্‌ফ,১৮৪৪-১৯৪১(১-৬ খন্ড,১৯১৫-১৯৪০)

        দ্য প্ল্যাটফর্ম অফ টাইমঃ মেমোয়ার্স অফ ফ্যামিলি অ্যান্ড ফ্রেন্ডস : এডিটেড বাই   এস.পি.রোসেনবস্‌ কালেকটেড এসেজ (১-৪ খন্ড)

        দ্য কমপ্লিট মরটার ফিকশন (১৯৮৫)

        দ্য অয়ার্কস অফ স্যামুয়েল টেলার কোলরিজ

        সুইসাইড, ক্যাভান রুথ

        সুইসাইড অ্যান্ড মাস সুইসাইড, এ.এম.বুস্ট

        ভার্জিনিয়া ওল্‌ফ-এর উপন্যাস, গল্প ও প্রবন্ধ প্রাথমিকভাবে সবই তাঁদের প্রতিষ্ঠিত হগার্থ প্রেস থেকেই প্রকাশিত হয়।

 

দ্বিতীয় পর্ব :

‘নিরর্থক প্রহসনের ইতি’ : ভারজিনিয়া ওল্ফ - ২

 

প্রথম পর্ব:

‘নিরর্থক প্রহসনের ইতি’ : ভারজিনিয়া ওল্ফ - ১

 

90 Views
Literary Editor

লেখা পাঠাবার নিয়ম

মৌলিক লেখা হতে হবে।

নির্ভুল বানান ও ইউনিকোড বাংলায় টাইপকৃত হতে হবে।

অনুবাদ এর ক্ষেত্রে মুল লেখকের নাম ও সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি দিতে হবে।

আরো দিতে পারেন

লেখকের ছবি।

সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি।

বিষয় বস্তুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অঙ্কন চিত্র বা ছবি। 

সম্পাদক | Editor

তারিক সামিন

Tareq Samin

This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

 

লেখা পাঠাবার জন্য

ইমেইল:

This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

 

We use cookies to improve our website. Cookies used for the essential operation of this site have already been set. For more information visit our Cookie policy. I accept cookies from this site. Agree