প্রবন্ধ

প্রবন্ধ (4)

  • 23
  • Sep

।। ২ ।।


‘The eyes of others our prisons; their thoughts our cages.’
উপন্যাসের মধ্যে লেখককে অন্বেষণ করা, যাকে পরিভাষায় textual-biographical interpretation বলে চিহ্নিত করা হয়, আত্মহত্যার সূত্র খোঁজা যেমন অনেকটাই নিয়মমাফিক, তেমনই উপন্যাসে, গল্পে ও প্রবন্ধে আত্মহননের সূক্ষ্মভাবে প্রথিত বীজের অন্বেষণও নিয়মানুগ। ভার্জিনিয়া ওল্‌ফ নিজেই লিখছেন : ‘Every secret of a writer’s soul, every experience of his life, every quality of his mind is written large in his works.’। মৃত্যুর ২০ বছর পর তাঁর স্বামী লিওনার্দ তাঁর ৫ খন্ড আত্মজীবনীতে (১৯৬০-১৯৬৯) ওল্‌ফের জীবনের শেষ বছরটির একটি পরিচয় দেন, যদিও নারীবাদী সমালোচকদের যে স্বভাবসিদ্ধ সন্দেহের তীর স্বামীর দিকে ছিল, লিওনার্দের তথ্যভিত্তিক অনুপুঙ্খ বিবরণ সমালোচকদের প্রশ্রয় দেয়নি। স্ত্রীর ডায়েরি ও জার্নাল থেকে তথ্য উদ্ধৃত করে ওল্‌ফের শেষ ৩১৯ দিনের (১৩ মে ১৯৪০ থেকে ২৮ মার্চ ১৯৪১) একটি চিত্র তিনি তুলে ধরেন।১৩ মে ১৯৪০ তারিখে ওল্‌ফ নিজে তার জীবনীকার রজার ফ্রাইয়ের কাছে প্রকাশের জন্য প্রুফগুলি পাঠিয়ে দেন এবং লিওনার্দের মতে এই সময় থেকেই ‘slow-moving catastrophe’ শুরু হয়ে যায়। তবে নিজের মনের ওপর অধিকার আত্মহত্যার মাস দুয়েক আগে পর্যন্ত চোখে পড়ত। শুধু এপ্রিল ১৯৪০ থেকে জানুয়ারি ১৯৪১, যেসময় দক্ষিণ ইংল্যান্ডে যুদ্ধ বিমানের হানা ক্রমশ বাড়ছে, তখন অন্যদের মতো ওল্‌ফকেও খুবই উদ্বিগ্ন দেখাত। মে-জুন ১৯৪০-এ ওল্‌ফ তখন পরিচিত ও বন্ধুদের সঙ্গে জার্মান আক্রমণের পরিণতি ও প্রতিরোধ নিয়ে আলোচনারত, কিন্তু উদ্বিঘ্ন। ওল্‌ফের উৎকন্ঠার একটা স্পষ্ট কারণ ছিলই। লিওনার্দ ইহুদি ছিলেন। নাৎসীদের হাতে পড়লে লিওনার্দের মতো রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ও বুদ্ধিজীবী ইহুদি ও তার স্ত্রীর কি দশা হবে তা অনুমানই করা যায়। ওলফ্‌ বলেই ফেলেছিলেন ‘We agreed that if the time came we would shut the garage door and commit suicide.’। তবে এই কথাটা ওল্‌ফের বলা বা লিওনার্দের উক্তি এ নিয়ে জীবনীকারদের মধ্যে দ্বিমত থাকলেও একটি ঘটনা থেকে অনুমান করা হয় যে হয়তো সিদ্ধান্তটি ওল্‌ফের : ১৯৪০ সালের জুন মাসে ওল্‌ফের মনোবিজ্ঞানী ভাই এড্‌রিয়ান স্টিফেন ওদের বাড়িতে মারণ ক্ষমতা সম্পন্ন পরিমাণের মরফিয়া দিয়ে যান, যাতে জার্মান আক্রমণ হলে এর ব্যবহার হতে পারে। জীবনীকারদের একটি ভাষ্য যে এই সিদ্ধান্ত এক দম্পতির যৌথ সিদ্ধান্ত, এবং তা প্রত্যক্ষভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন জার্মান আক্রমণের প্রেক্ষিতে নেওয়া, কখনোই ওল্‌ফের বিষাদগ্রস্ত আত্মহত্যার ভাবনার কোনো সূত্র নির্দেশক নয়। ওল্‌ফ কোনোদিনও সেই মরফিয়া ব্যবহার করেননি এবং নিজের জীবনও সেই মরফিয়া দিয়ে শেষ করেননি।
বাকি বছরটা কর্মময় ও সৃষ্টিশীল থাকলেও মাঝে মাঝে ইনফ্লুয়েঞ্জা, ব্রংকাইটিস ও অত্যধিক মাথার যন্ত্রণা তার স্বভাবের স্বাভাবিক স্থৈর্যকে মাঝে মাঝেই চুরমার করে দিত। নভেম্বর ১৯৪০-এ তিনি তিনটি লেখা একসঙ্গে লিখছেন এবং ডিসেম্বরের মধ্যে তাঁর শেষ উপন্যাস ‘বিটুইন দ্য অ্যাক্টস’-এর খসড়াও শেষ করেন। কিন্তু এই সময় তাঁর লেখা বেশ কিছু চিঠির মধ্যে এক বন্ধু ডাক্তার অক্টোভিয়া উইলবার-ফোর্সকে তাঁর হতাশা ও আত্মসমালোচনার উল্লেখ করেন : ‘I have lost all power over words, can’t do a thing with them.’। এইসময় তাঁদের লন্ডনের বাড়ি এবং ব্যবসায়িক কেন্দ্র বিমান হানায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে সেখান থেকে রড্‌মেলমঙ্ক হাউসে তাদের আসবাব, দরকারি কাগজপত্র এবং ছাপাখানার জিনিসপত্র নিয়ে আসা হয়। লেখক এলিজাবেথ বাওয়েন যখন ফেব্রুয়ারিতে ওল্‌ফের সঙ্গে দেখা করতে আসেন তখন পুনরায় ইংরেজি সাহিত্যের একটা নতুন রূপরেখা পরে তৈরি করার ইচ্ছার কথা শোনেন। তখনও, বাওয়েনের মতে, অসুস্থতার চিহ্ন তার চোখে পড়েনি বরং ওল্‌ফের সরব হাসি তিনি স্মরণ করেন। লিওনার্দ ২৫ জানুয়ারি ১৯৪০ মানসিক ভারসাম্যহীনতার লক্ষণ চিহ্নিত করেন। সেদিন ওল্‌ফের জন্মদিন ছিল, উপন্যাসের খসড়াটি তিনি পড়েছিলেন কিন্তু নভেম্বরে শেষ করার পর যা বলেছিলেন, ‘I am a little triumphant about the book…I’ve enjoyed writing almost every page….’--একদম বিপরীত হয়ে উঠল সেই প্রতিক্রিয়া, তাঁর দৃঢ় ধারণা বইটি ব্যর্থতার একটি চূড়ান্ত নিদর্শন। জন্মদিনের দিন পড়বার সময় উপন্যাসটি নিয়ে তাঁর ভয় আরও বাড়তে থাকে, যে ভয় দশ বারোদিন পরে আবার মিলিয়ে যায়। লিওনার্দ সবসময়েই ওল্‌ফের কিছু ঘটলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতেন। আত্মজীবনীতে লিখছেন, ‘বহুবছর ধরেই ভি’র(ভার্জিনিয়া) মনের গতিপ্রকৃতি ও অসুস্থতা-এর লক্ষণ ও বিপদে আমি অভ্যস্ত; আশঙ্কার লক্ষণগুলো সবসময়েই খুব ধীরে কিন্তু অবশ্যম্ভাবী হয়ে আসত--মাথাধরা ও যন্ত্রণা, ঘুম না হওয়া ও মনোযোগের চূড়ান্ত অভাব হওয়া।আমরা জানতাম যে এই ধরণের মানসিক বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা যায় যদি ভি সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নিয়ে নির্জীব হয়ে যায়। কিন্তু এবার কোনো লক্ষণ ছাড়াই অস্বস্তির সূত্রপাত।‘ যদিও ১৯১৫ সালে তার দীর্ঘতম অসুস্থতার সময় এরকম যে একবার হয়নি তা নয়।
ওল্‌ফের প্রতিষ্ঠিত ‘হগার্থ প্রেস’-এ তখন প্রতিষ্ঠিত লেখক জন লেহমেন কর্মরত। ওল্‌ফের লেখা শেষ কয়েকটি চিঠির একটি তিনি পেয়েছিলেন এবং মৃত্যুর তিন সপ্তাহ আগে তাদের দেখা হয়। ‘বিটুইন দ্য অ্যাক্টস’ উপন্যাসটির চূড়ান্ত খসড়াটি তাঁকে পড়তে দিলেও ওল্‌ফ তখন মোটামুটি নিশ্চিত যে কাজটা নিরর্থক হয়েছে। লেহমেন তাঁর রিকালেকশন বইতে লেখেন মার্চ ১৯৪১-এর সেই সাক্ষাৎকারের কথা : ‘একটা ব্যাপারে আমি খুব সচেতন হয়ে উঠেছিলাম যে ভার্জিনিয়া অস্বাভাবিক রকমের উদ্বিগ্ন ও ভীত, মাঝে মাঝেই হাত কাঁপছে যদিও কথা বলছেন স্পষ্ট ও গুছিয়ে। উপন্যাসটা হাতে নিয়ে তারপর একটু দ্বিধাগ্রস্ত ভাবে বলে উঠেছিলেন, যে ওটা কিছুই হয়নি, ছাপার অযোগ্য, ছিঁড়ে ফেলাই ভালো। যদিও খুব ভদ্রভাবে কিন্তু দৃঢ়তার সঙ্গে লিওনার্দ ওর কথার প্রতিবাদ করেছিলেন এবং এভাবে বলার জন্য সামান্য বকেওছিলেন...।‘ পড়তে গিয়ে লেহমেন পরে লক্ষ্য করেন যে এই প্রথম ওল্‌ফের নিজের টাইপ করা অদ্ভুত সব বানান বৈচিত্র্য। আগের যে কোনো লেখার চেয়ে অনেক বেশি অসংলগ্ন, বাক্য ও বানানে এক উৎকেন্দ্রিক সম্পর্ক--প্রতি পাতায় প্রচুর কারেকশন করতে করতে লেহমেনের মনে হয়েছিল যে, যে হাত এই লেখা লিখেছে তা ‘govern by high voltage electric current.’। আত্মহত্যার ঠিক আগের দিন আবার ওল্‌ফ উপন্যাসটি ছাপার অযোগ্য বলে যে চিঠি লেখেন তার সঙ্গে লিওনার্দের ছোট্ট একটি চিরকুট যুক্ত ছিল। ওল্‌ফ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও বিধ্বস্ত, সুতরাং ওর বক্তব্যকে গুরুত্ব না দেওয়ার ইঙ্গিত খুব স্পষ্ট ছিল। কিন্তু চিঠিটি লেহমেন যখন পান তখন সব শেষ। বুদ্ধিদীপ্ত হাস্যরস, সাহিত্যের বিষয় ও প্রকরণগত দিক নিয়ে সক্রিয় আন্দোলনকারী ততক্ষণে বেদনা, বিষাদ ও এক অব্যক্ত ভয়ে নিজেকে নিঃশেষ করে ফেলেছেন।

 

 

।। ৩ ।।


‘It is the nature of the artist to mind excessively what is said about him. Literature is strewn with the wreckage of men who have minded beyond reason the opinions of others.’
কয়েকটি উপন্যাসের মধ্যে লেখকের সৃজনশীল সত্তার পাশাপাশি,সূক্ষ্ম শিল্পবোধের প্রকাশের সঙ্গে আত্মহননের বুনোট চোখ এড়ায় না। ১৯২৫ সালে প্রকাশিত ‘মিসেস ড্যালোওয়ে’ উপন্যাস তাঁকে ঔপন্যাসিক হিসেবে যে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল তা মূলত তার interior monologue বা stream of consciousness শৈলিতে সফল পরীক্ষার জন্য। নিঃসঙ্গতা ও প্রেম এই দুইয়ের সমস্যাকে একান্ন বছরের এক নারীচরিত্র ক্ল্যারিসা ড্যালোওয়ের চরিত্রের চিন্তার প্রবাহ ধরে এগিয়ে পরিণতিতে দিনের শেষে এই চরিত্রের জানলা দিয়ে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যার মধ্যে দিয়ে শেষ। আসলে ক্ল্যারিসা ও তার স্বামী রিচার্ড ড্যালওয়ে সন্ধ্যায় বাড়িতে একটি অনুষ্ঠানে আয়োজনের জন্য ফুল ও অন্যান্য কেনাকাটায় লন্ডন শহরে বেরিয়ে, ক্ল্যারিসার চেতনার প্রবাহ অনুসরণ করে, তার অতীত, বর্তমানের ভেদরেখা মুছে, তৎকালীন সমাজের প্রাচুর্যের শৌখিনতায় বন্দী মহিলাদের ঝলমলে জীবনকে একটুকরো অন্ধকার কি করে গ্রাস করে নেয়, তার ব্যঞ্জনায় মুখর। পার্টি চলাকালীন ক্ল্যারিসার আত্মহত্যার সংবাদ, সকাল থেকে সন্ধ্যার এই একদিনের চরিত্রের চেতনার প্রবাহের মধ্যে দিয়ে জীবনের অর্থহীনতা, রহস্যময়তা, মানব সম্পর্কের জটিলতাকে যেভাবে বিবস্ত্র করে ফেলে, তখন আত্মহত্যা শিল্পগতভাবে আরোপিত হয় না, aesthetic compulsion মনে হয় না।
আবার ‘টু দ্য লাইট হাউস’ উপন্যাসেও (১৯২৭) একদল চরিত্রকে হেব্রিডিস দ্বীপপুঞ্জে গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে আপাত সহজ অথচ নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা জর্জরিত এক জটিল মানবিক সম্পর্কের আবর্তে ছেড়ে দেন। সচেতনভাবে এই উপন্যাসে, সাংকেতিক শব্দচিত্র, চরিত্রের চেতনার প্রবাহের সংলগ্ন অসংলগ্ন ভাষার ব্যবহার একদিকে সৃষ্টি ও স্রষ্টার যন্ত্রণা ও আনন্দকে যেমন প্রকাশ করে, অন্যদিকে ভার্জিনিয়া ওল্‌ফ যে প্রথাগত উপন্যাসের সবকিছু ভেঙ্গে এগোচ্ছেন তা বুঝতে অসুবিধে হয় না। উপন্যাসের তিনটি পর্বের একটিতে একজন বয়স্ক কবি ও চিত্রকরের সৃষ্টির ব্যথা ও আনন্দ, দ্বিতীয়টিতে মানুষের মনে মৃত্যুর প্রভাবের ক্ষণিকত্ব, এবং তৃতীয় অংশে জীবনের নিঃশেষ না হয়ে যাওয়া উদ্যমের এক অদ্ভুত বৈপরীত্য উপন্যাসটিকে পঙ্‌ক্তিভুক্ত হতে দেয় না। এই দুটো উপন্যাস থেকেই ব্যক্তিজীবনের উপাদানের চেয়েও, অভিজ্ঞতার চেয়েও, সৃষ্টির স্বয়ংসম্পূর্ণতা অনেক বেশি লক্ষণীয়। আরও লক্ষণীয় ওল্‌ফের লেখক হিসেবে উদ্দেশ্যের একমুখীনতাঃ ‘If a writer were a free man and not a slave, if he could write what he chooses, not what he must...there would be no plot, no comedy and tragedy, no love interest and catastrophe in the accepted style.’
ব্যক্তিজীবনের স্থায়ী ক্ষত বা পরিবারের সকলের সাথে গ্রীষ্মকালের অবকাশের অভিজ্ঞতার পুঁজি দিয়ে ওল্‌ফের উপন্যাসের আলোচনাকে বিস্তৃত করা গেলে আত্মহত্যার ময়নাতদন্ত সম্ভব নয়। ১৯২৮ সালের ‘অরল্যান্ডো’ উপন্যাস প্রকৃতিতে জীবনীমূলক, তীব্র বিদ্রূপের আঘাতে প্রচলিত জীবনীকারদের ব্যঙ্গচিত্র, আবার ‘দ্য ওয়েভস’ (১৯৩১) আত্মকথন পদ্ধতির বাইরে গিয়ে ছয় বন্ধুর আবৃত্তিধর্মী আত্মপ্রতিফলন, গদ্য কবিতার আঙ্গিকে লিখিত। শেষ উপন্যাস ‘বিটুইন দ্য অ্যাক্টস’ (১৯৪১) তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হলেও লেখকের মূল ভাবনাগুলো যা সব উপন্যাসেই উপস্থিত তা পরিবর্ধিত আকারে প্রক্ষিপ্ত : শিল্পের মধ্যে দিয়ে জীবনের রূপান্তর, নরনারীর সামাজিক, ব্যক্তিক ও যৌন সম্পর্কের বৈপরীত্য,সময় ও জীবনের ক্ষণিকত্ব ও পরিবর্তনশীলতা-এ বিষয়গুলোর মধ্যে সংঘাত থেকে ধংসাত্মক পরিণতি, কখনো বা সৃষ্টির সামান্য স্ফুলিঙ্গ--যে কল্পনা কথনে সাংকেতিকতার সর্বোচ্চ প্রকাশ, তা সমালোচকদের মতে ইংরেজি সাহিত্যে দুর্লভ।

 

(চলবে) …

  • 02
  • Sep

 

‘নিরর্থক প্রহসনের ইতি’ :  ভারজিনিয়া ওল্‌ফ

 

 প্রাবন্ধিক :অভীক গঙ্গোপাধ্যায়

 

 

লেখক পরিচিতি:

অভীক গঙ্গোপাধ্যায় কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। লেখার পাশাপাশি সংস্কৃত, ফরাসি, জার্মান সাহিত্য ও ভাষার প্রতি বিশেষ আগ্রহী। ইংরেজি ও বাংলায় প্রবন্ধ ও সৃজনশীল রচনায় সমান কৃতী। নন্দনতত্ত্ব, সাহিত্যতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব, বিশ্লেষণধর্মী সাহিত্য সমালোচনা, বিতর্কিত ঐতিহাসিক বিষয়, দর্শন, মনস্তত্ত্ব ও ধর্মীয় মতবাদ প্রভৃতি বিষয়ের ওপর প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ৩০। এছাড়া ইংরেজি ও বাংলায় সম্পাদিত ছয়টি কাব্যগ্রন্থ ও গল্পসংকলন দেশে ও বিদেশে পর্যালোচিত। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ‘লাইব্রেরি অফ পোয়েট্রি’ থেকে ‘এডিটরস চয়েস অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন ২০০২ সালে।

‘ভাষার মৃত্যু, লুপ্ত ও বিপন্ন ভাষার খোঁজ’  এবং ‘ডায়াস্পোরা : তত্বে ও অভিঘাত সাহিত্যে’ বই দুটির জন্য একাধিক সম্মান পেয়েছেন। বিশ্বের ৯০ শতাংশের কাছাকাছি মানুষ প্রচলিত ভাষায় কথা বলেনা। ভাষাতো শব্দের সংকলনমাত্র নয়, ভাষা এমন এক চাবি যার সাহায্যে জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, প্রকৃ্তিচেতনা, জগতের সাথে এবং নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক প্রকাশের পন্থা, রসিকতা, ভালোবাসা, জীবন দর্শন জানার এক প্রামাণিক সাক্ষ্যের মুখোমুখি হতে পারি। এই জীবিত হৃৎযন্ত্র থেমে গেলে, ভাষা-মনস্তাত্ত্বিকদের মতে, মানুষের নিজের আত্মপরিচয় অবচেতনে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে,  অবষাদ ও আসক্তির জালে ব্যক্তি ও সেই সমাজ জড়িয়ে যায়।

সারা পৃথিবী জুড়ে উদ্বাস্তু, শরণার্থী, প্রত্যাবর্তক, মানসিকভাবে স্থানচ্যুত এবং রাজ্যহীন মানুষদের সত্যকে তুলে ধরতে এই ‘ডায়াস্পোরা' গ্রন্থ । ‘ছেড়ে আসা’, ‘ফেলে আসা’, ‘ছেড়ে চলে যাওয়া’ অনুভূতির পাশাপাশি উদ্বাস্তু মানুষের মানসিক অভিঘাত, অযাচিত পরিযায়ী, অনাহূত দেশান্তরীয় চেতনা ধরা থাকে ডায়াস্পোরীয় সাহিত্যের আখ্যানের মধ্যে।

ভাষাচর্চা ও ডায়াস্পোরা বা স্থানচ্যুত মানুষের মানসিক অভিঘাতে ভাষার পরিণতি নিয়ে লেখা ও কাজের জন্য জার্মানির Heinrich-Heine-Universität Düsseldorf , ফ্রান্সের Université Paris-Sorbonne , স্কটল্যান্ডের The University of Edinburgh, কানাডার  Canadian Diaspora Communities, Cultural Confederation   ও বাংলাদেশের রাঢ় ও বরেন্দ্র ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চা পরিষদ থেকে সম্মানিত ।

এছাড়া  গ্রন্থকার কয়েকটি দেশী-বিদেশী দৈনিকে উত্তর-সম্পাদকীয় ও শিল্প-সাহিত্য পৃষ্ঠায় নিয়মিত লেখক। কাজ-অকাজের আরও খোঁজ www.avikauthorindia.com  ও facebook.com/avik.gangopadhyay

 

  

                                                                                                                                                                                                                                                                       

 

“If you do not tell the truth about yourself you cannot tell it about other people.”

বেলা সাড়ে এগারোটার সময় সাসেক্স-এর বাড়ির গা ঘেঁষে যাওয়া আউসে নদীর পথে ঊনষাট বছরের স্থির ব্যক্তিত্বের দৃপ্ত ভঙ্গিতে একটি লাঠি হাতে এক মহিলার হেঁটে যাওয়া চোখে পড়ছিল অনেকেরই। চেনা মুখ, হাতে সেই পরিচিত লাঠি, দিনটা ১৯৪১-এর ২৮ মার্চ। বাড়ি ছেড়ে বেরোবার সময় রেখে গেছেন একই বয়ানের দুটি চিঠি। একটি দশদিন আগের লেখা বোন ভানেসা-কে। আর একটি একটু আগেই শেষ করা, স্বামী লেওনার্দকে। চিঠিতে লেখা :

‘প্রিয়, আমি নিশ্চি ত, আবার আমি ভারসাম্য হারাচ্ছি। আমি অনুভব করি যে আর একবার ওইরকম বীভৎস সময়ের মধ্যে দিয়ে আর আমাদের চলা সম্ভব নয়। আর এবার আর আমি সেরে উঠবো না ।আমি মনঃসংযোগ করতে পারছিনা । নানারকম কথা শুনতে শুরু করেছি। তাই যা সব থেকে গ্রহণযোগ্য তাই আমি করছি। সব সম্ভাব্য সুখ তুমি আমায় দিয়েছ। একজনের যা হওয়া উচিত সব দিক থেকেই তুমি তাই। এই বীভৎস রোগ আসার আগে আমার মনে হয় না দুজন মানুষের জীবনে সুখের কোনও অভাব ছিল। আমি আর লড়াই করতে পারছিনা। আমি জানি যে আমি তোমার জীবনটাই নষ্ট করেছি, এও জানি যে আমার অবর্তমানে তুমি কাজ করে যেতে পারবে। আমি জানি তুমি পারবে। দেখছ, আমি এটাও গুছিয়ে লিখতে  পারছিনা। আমি পড়তে পারিনা। আমি এইটুকুই বলতে চাই যে আমার জীবনের সব সুখের ঋণ তোমার কাছে। তুমি যথেষ্ট ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছ এবং আমার প্রতি এত বেশি ভাল ছিলে....। সবাই এটা জানে তাও আমি বলতে চাই। যদি কেউ আমাকে বাঁচাতে পারত, সে তুমি। সবকিছু আজ আমাকে ছেড়ে গেলেও তোমার ভালবাসার নিশ্চয়তা অটুট। এভাবে আমি তোমার জীবন নষ্ট করতে পারিনা। আমার মনে হয়না আমাদের দুজনের মতো এতো সুখী কোনও দুজন মানুষ দেখি’।  

কুড়ি দিন পরে ১৮ই এপ্রিল একদল বাচ্চা আউসে নদীতে নিখোঁজ এই বিশ্বখ্যাত মহিলার মৃতদেহের খোঁজ দেয়। ভারী বড়ো কোট, প্রতিটা পকেটেই ভারী পাথর-- স্বামী লিওনার্দ দেহটি শনাক্ত করেন--তার স্ত্রী ভার্জিনিয়া ওল্‌ফ। ইংরেজ ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, পত্রসাহিত্যিক, প্রকাশক, গল্পকার ও বুদ্ধিজীবী, নারীবাদী, বিংশ শতাব্দীর আধুনিক সাহিত্যের আধুনিকতার প্রবক্তাদের অগ্রজ ভার্জিনিয়া ওল্‌ফের জীবনের শেষটাও স্বরচিত।

প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্তর্বর্তী সময়ের লন্ডনের সাহিত্য সমাজের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব, ‘ব্লুমস বেরি গ্রুপ’-এর অন্যতম সদস্যা ভার্জিনিয়া ওল্‌ফকে নিয়ে একদিকে সাহিত্য সমালোচকদের মধ্যে যেমন অস্বস্তি ছিল, অন্যদিকে মৌলিক প্রতিভাধর ঔপন্যাসিক কবি ও নাট্যকারদের কাছে এরকম আঙ্গিকের পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ শিল্পীর বুদ্ধিদীপ্ত সান্নিধ্য ও উপস্থিতি অনুসরণীয় ছিল। টি.এস.এলিয়ট উৎসাহ দিয়ে লিখেছিলেন তাঁর এই বান্ধবীকে, ...you have freed yourself from any compromise between the traditional novel and your original gift…..’

 

 

প্রথম নজরে মৌলিকতাকে চিনতে পারার অক্ষমতা সর্বজনীন, তীক্ষ্ণ সমালোচনায় প্রথাবহির্ভূত বিষয় বা রচনাশৈলির সীমা লঙ্ঘন করা যে চিরকালই প্রশ্রয় পায় না,  ১৯২২ সালে বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক জন মিডিলটন মারে’র আক্রমণাত্মক প্রবন্ধ তারই নিদর্শন ছিল। তবে বিরূপ সমালোচনা বা স্বীকৃতির অভাবে যেভাবে বহু স্রষ্টার সত্তাকে ও জীবনকে আত্মহননের দিকে নিয়ে গেছে, ভার্জিনিয়া ওল্‌ফ সেই শ্রেণীভুক্ত নন। প্রায় ১৮টি প্রকাশিত গ্রন্থের লেখক (‘লেখিকা’ শব্দটি ইচ্ছাকৃত ভাবেই বাদ দিলাম), সমাজসংস্কারক লেখক ও ফেবিয়ান স্বামী লিওনার্দ ওল্‌ফের স্ত্রী, প্রি-র‍্যাফায়লাইট চিত্রকরদের পছন্দের মডেল অসাধারণ রূপসী জুলিয়া প্রিন্সেপ স্টিফেন-(১৮৪৬-১৮৯৫) এরও প্রতিষ্ঠিত লেখক, সমালোচক, জীবনীকার ও পর্বতারোহী স্যার লেসলি স্টিফেন এর কন্যা--সাধারণ মনোরোগের স্বীকার হবার কোনো উপাদান নিয়ে জন্মগ্রহণ করেননি ও বড়ো হয়ে ওঠেননি। ভিক্টোরিয় সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে বড়ো হয়ে ওঠা ভার্জিনিয়া ওলফ্‌-এর অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর যে সামাজিক ভিত্তির ওপর ইংরেজি উপন্যাস প্রতিষ্ঠিত ছিল তার ভিত্তিকে আঘাত করার ক্ষমতা ছিল। তাই ভাগ্য, বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যে মানুষের অবস্থান, সামাজিক সম্পর্কের সাফল্য-অসাফল্য যে ভিক্টোরিয় উপন্যাসের বৃত্ত ছিল, তার থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক উপন্যাসের নামে যে উপন্যাস রচিত হচ্ছিল, তা যে যথার্থ আধুনিক নয়, লিখিত প্রবন্ধের মধ্যে দিয়েই এই বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করে খ্যাতির স্বীকৃতি তাঁর জীবনে প্রথম ঘটে। ১৯২৩ সালে লিখিত ও ১৯২৪-এ প্রকাশিত এই প্রবন্ধে-‘মিস্টার বেনেট অ্যান্ড মিসেস ব্রাউন’-এ ওল্‌ফ লেখেন যে ১৯১০ সালে সপ্তম এডওয়ার্ডের মৃত্যুর পর একটা পরিবর্তন এসেছে সাহিত্যিক বাস্তবতার দিকে, কিন্তু সেই বাস্তবতা বা বস্তুমুখীনতা এডওয়ার্ডীয় ঔপন্যাসিক আরনল্ড বেনেট (১৮৬৭-১৯৩১), জন গল্‌সওয়ার্দি (১৮৬৭-১৯৩৩) ও এইচ.জি.ওয়েলস (১৮৬৬-১৯৪৬) এদের মতো ‘materialists’-দের বাহ্যিক বাস্তবতার অনুপুঙ্খ চিত্রণ নয়। ১৯১৯ সালে লিখিত ‘মডার্ন ফিকশন’ প্রবন্ধের উপাদানও এই প্রবন্ধে ফিরে আসে, যেখানে তিনি নিজেকে আরেকজন সমমনোভাবাপন্ন আধুনিক লেখক, জেমস জয়েস (১৮৮২-১৯৪২) এর সঙ্গে তুলনা করেন--দুজনেরই একই সাধারণ প্রকরণগত বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করে বলেন যে উভয়েই ভাবনা ও অনুভূতির চড়াই উৎরাই ধরে চলেছেন, যা পড়তে গেলে এক মনস্তাত্ত্বিক স্বরলিপির প্রয়োজন, আর যা লিখতে গেলে পুরনো ঔপন্যাসিকদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক নতুন কথন প্রকরণ বা বাক্য বিনির্মাণের প্রয়োজন। ভার্জিনিয়া ওল্‌ফের ভাষায় এই  অন্তর্বাস্তবতা, ‘a look within the life’। তাই তার লেখা উপন্যাসে বাদ পড়ল প্রথাগত প্লট, কথক ও কথন, কেন্দ্রীয় চরিত্র, নিয়মিত ভাবে আসা নৈর্ব্যক্তিক বর্ণনা। সেই জায়গায় এলো মানব চেতনা-প্রবাহের ব্যক্তিগত অনুভূত মুহূর্তের ভাষ্য, যাকে মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতার শেষ কথা বলে সমকালীন বুদ্ধিদীপ্ত ও আধুনিক মননধর্মী রসিক পাঠক চিহ্নিত করতেন।

(চলবে) …

 

  

Advertisement:

Better World Books Good Reading

 

 
     

 

 

  • 05
  • Jul

 

|| আবুল খায়ের ||

 

বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হলো ফুটবল। ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে প্রথম বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতার আসর হওয়ার পর থেকে শুরু করে, কালের বিবর্তনে এ খেলায় এসেছে অনেক পরিবর্তন, জনপ্রিয়তাও বেড়েছে অনেকগুণ বেশী। ২০১৮ সালে দাঁড়িয়ে ফিফা বিশ্বকাপ বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও উত্তেজনায় ভরপুর একটি খেলা। পৃথিবীর ২৩০ টি দেশের মধ্যে এমন কোন দেশ পাওয়া যাবে না, যেখানে ফিফা ফুটবল খেলা উপভোগ করা হচ্ছে না। সারা বিশ্বব্যাপী চলছে বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা। শিশু থেকে শুরু করে বয়ো-বৃদ্ধ পর্যন্ত খেলা দেখা, উপভোগ করা ও সাথে সাথে আবেগ, উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা নিয়মিত ব্যাপার। আর এ থেকে দূরে থাকা মানে পিছিয়ে পড়ার মতো অবস্থা। যেন কোন গুরুত্বপূর্ণ কিছুকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া। তবে ভয়াবহ ও চিন্তার বিষয় হলো, বর্তমান অবস্থায় খেলা দেখা; আবেগ বা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করার মধ্যে আর সীমাবদ্ধ নেই। রীতিমতো মারামারি বা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার নানা রকম ফন্দি ফিকির করতে দেখা যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে অভিজাত এলাকার রেস্টুরেন্টে বসে প্রিয় দলের পক্ষে বা প্রিয় খেলোয়াড়ের পক্ষে সাফাই গাওয়া অব্যাহত থাকছে স্বার্থ-হীনভাবে। বিতর্কের ঝড় এখন তুঙ্গে। তর্ক-বিতর্ক করা ছাড়াও মারামারিতে জড়িয়ে পড়তেও দেখা যাচ্ছে কোথাও কোথাও।

এদেশে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থক সবচেয়ে বেশী । ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার খেলাকে কেন্দ্র করে নোয়াখালীর সেনবাগে, ডুমুরিয়া গ্রামে সমর্থকদের মধ্যে বিতর্কে জড়িয়ে মারামারিতে কয়েকজনকে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবরও পত্রিকায় দেখা গেছে। একইভাবে দু’দল প্রতিপক্ষ সমর্থকদের মধ্যে লক্ষীপুরেও ঘটেছে মারামারির ঘটনা। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু ছোট-খাটো অপ্রীতিকর ঘটনার সূত্রপাত হতে দেখা যাচ্ছে। যা আশংকাজনক ও চিন্তার বিষয়ও বটে।

ক্রিকেট খেলায় বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে ঠিকই। কিন্তু ফুটবল খেলায় এখনো অনেক পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ, তা বলার অপেৰা রাখে না। যদিও অতি সম্প্রতি নারী ফুটবলে কিছুটা হলেও আলোর মুখ দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের নারী ফুটবল দলের সদস্যগণ, আমাদের মুখ কিছুটা হলেও উজ্জ্বল করতে সচেষ্ট হয়েছে এবং কৃতিত্বের দাবীও রাখছে বিশ্ব ইতিহাসে। বলা বাহুল্য যে, জনপ্রিয় এ খেলার প্রতি বাঙালীদের আগ্রহ, উৎসাহ ও উদ্দীপনা অন্য যেকোনো খেলার চেয়ে অনেক বেশী। দিন দিন তা বেড়েই চলছে। আর সেটা বহুবছর আগে থেকেই হয়ে আসছে। বড় বড় পতাকা বানিয়ে রাস্তায়, হাটে, ঘাটে, বাজারে টাঙিয়ে দেয়া; এমনকি বাড়ির ছাদে পতপত করে উড়তে দেখা যাচ্ছে প্রিয় দল বা সমর্থিত দেশের পতাকা। নিজের পছন্দের দলের পক্ষে সমর্থকদের কেউ তিন কিলোমিটার আবার কেউ পাঁচ কিলোমিটার লম্বা পতাকা বানিয়ে জানান দেয়ার চেষ্টা করছে যে, তারা তাদের প্রিয় দলকে কতোটা ভালোবাসে। কেউ পুরো বহুতল বাড়িকে দলের পতাকার রঙে রাঙিয়ে একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে নিজেকে জাহির করার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। আবার কেউ শত শত পতাকা দিয়ে পুরো এলাকাকে পছন্দের দল বা দেশের পতাকায় সাজিয়ে তুলছে। খেলায় জিতলে খিচুরি, পোলাও-বিরানী বা খানাপিনার ব্যবস্থা ছাড়াও; অনেকে রীতিমতো মেজবানি খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করতে দেখা যাচ্ছে।

কোন কোন বাড়িতে একাধিক দলের পতাকা শোভা পাচ্ছে। কারণ পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন দলের সমর্থক। কেউ জার্মানি, কেউ ফ্রান্স, পর্তুগাল বা কেউ আর্জেন্টিনা, কেউ ব্রাজিল। এমন কোন বাড়ি নেই, যে বাড়িতে কোন না কোন দলের বা দেশের পতাকা টাঙানো হয়নি। কার পতাকার সাইজ কতো বড়, এ নিয়ে খোশগল্প করতে দেখা যায় সমর্থকদের মধ্যে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম টুইটার, ফেসবুকে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় বা দলের নানা রকম ব্যঙ্গ চিত্র বা ছবি প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে। নিজের প্রিয় দল খেলায় হেরে গেলেও চলে নানা রকম কসরত প্রদর্শন। গালি-গালাজ ও অশোভনীয় আচরণ করতেও দেখা যাচ্ছে কাউকে কাউকে। যেটা কোনক্রমেই উচিত নয়। খেলা নিয়ে যেকোনো ধরনে অসদাচরণ পরিহার করা সকলের কাম্য।

বাংলাদেশে নেইমার ও মেসির ভক্ত বেশী । খেলার সময় এই খেলোয়াড়দের কোন রকম ভুল হতে দেখলেই চলে তুমুল বিতর্ক, উচ্ছ্বাস বা আবেগ তাড়িত হই-হুল্লোড়। আবার খেলায় ভালো করা বা গোল করা দেখলেও সমর্থকদের মধ্যে চলে একই ভাবে আনন্দ প্রকাশের আয়োজন। নানা রকম মন্তব্য বা স্ট্যাটাস দিয়ে জানান দেয়া হয় যে আমার প্রিয় খেলোয়াড়ই কেবল এমনটি করতে পেরেছে। আর এই সব টাইমলাইনে বা স্ট্যাটাসে মন্তব্য করতেও হুমড়ি খেয়ে পড়ে সমর্থকরা। কার স্ট্যাটাসে কতোগুলো লাইক বা মন্তব্য পড়েছে তা নিয়েও চলে আলোচনা ও সমালোচনা। হাতাহাতি, মারামারি, আক্রমণ পাল্টা আক্রমণ এই রকম ছোটো খাটো অনেক ঘটনা কিন্তু থাকছেই নিয়মিত। ঢাকাতে এক আর্জেন্টিনা ভক্তের সুইসাইড করার ঘটনাও ঘটেছে বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা গেছে। এরকম ঘটনা বিশ্বের আর কোথাও দেখা গেছে কিনা! সেই রকম কোনো তথ্য জানা যায়নি। কিন্তু বাংলাদেশে ঘটছে! সম্প্রতি ব্রাজিলের তিনজন সাংবাদিক বাংলাদেশ সফর করে এ মন্তব্য করেছেন যে, বাংলাদেশের মতো এতো ব্রাজিলের সমর্থক পৃথিবীর আর কোথাও তারা দেখেননি। একই কথা দাবী করছে আর্জেন্টিনার সংবাদ মাধ্যমগুলো! তাঁদের ভাষায় এটা একটা বিরল ঘটনা। কারণ এতো দূরের দেশ ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা। যে দেশগুলো সম্পর্কে ভালোভাবে অনেকেই কিছু জানে না। জানার সুযোগও নেই। কিন্তু ফুটবলারদের নাম অনেকেরই মুখস্থ এবং ফুটবল দলের প্রতি অন্ধ সমর্থন এতো বেশী, যা কল্পনাতীত!।

এখন প্রশ্ন হতে পারে। খেলা নিয়ে কেন এতো উৎসাহ বা উচ্ছ্বাস? কেউ কেউ বলেন, দেশে বেকার ও হতাশাগ্রস্তদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণেই খেলা দেখার জন্য যথেষ্ট সময় পাচ্ছে এবং সমর্থকদের অহেতুক ঘটনা প্রবাহ জন্মদিতে সহায়ক পরিবেশ পাচ্ছে। বিনোদন প্রিয় বাঙালির বিকল্প কোন বিনোদনের ব্যবস্থা না থাকায়, ফুটবল খেলা দেখা ও উপভোগ করাকে বিনোদন হিসেবে গ্রহণ করাও উচ্ছ্বাস প্রকাশের কারণ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

তবে চিন্তার বিষয় এই যে, ভিনদেশী পতাকার সাইজ বিরাট আকার, তার পাশেই ছোট একটা বাংলাদেশের পতাকা উড়ানো কেমন যেন একটা বেমানান। এটি নিজ দেশের পতাকার প্রতি অপমানজনক কিনা তা ভেবে দেখার সুযোগ আছে। আবার কেউ কেউ একই বাঁশের খুঁটিতে একেবারে বাঁশের মাথায় ছোট একটা বাংলাদেশের পতাকা এবং তারই একটু নীচে বিরাট সাইজের একটা ভিনদেশীয় পতাকা উড়ানো; কেমন যেন একটু দৃষ্টিকটু এবং আপত্তিকরও মনে হয়। এধরনের উচ্ছ্বাস সমর্থনযোগ্য কিনা? বা  উচিত কিনা? তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। দিন দিন এসব যেন সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশী না হয়ে যায়, সেদিকেও সচেতন নাগরিকদের খেয়াল রাখতে হবে। অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস যেন ক্ষতিকর কোন কিছুকে উসকে দিতে না পারে। এবং নিজের সংস্কৃতির ওপর কোনরূপ নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে সংশ্লিষ্টদের। আগে দেশীয় ক্রীড়া ও সংস্কৃতির বিকাশ, পরে অন্য সব। তাই, ফুটবল খেলায় বাংলাদেশের উৎকর্ষতা বৃদ্ধি পাবে, বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের ফুটবল একসময় বিশ্বকাপ বিজয়ে সামর্থ্য অর্জন করবে, সেই প্রত্যাশায় কাজ করার এখনই সময়।

 

  • 09
  • Jun

তারিক সামিন।

 

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ। লেখক হিসেবে হুমায়ূন আহমেদ এর সবচাইতে বড় সাফল্য বাংলাদেশের মানুষকে তিনি বই পড়া, বই কেনার অভ্যাস তৈরি করিয়ে ছিলেন। এমন বহু পাঠক আছে যারা তার প্রায় সব বই পড়েছেন, সেই সাথে কিনেছেনও বিস্তর। তার উপন্যাসের লিখন ভঙ্গি অসাধারণ। অল্প কথায় এমন হাস্যরস তৈরীর অপূর্ব ভঙ্গিমা বাংলাদেশের অন্য লেখকদের মাধে অনুপস্থিত। তার টেলিভিশন নাটক গুলোর জনপ্রিয়তা প্রবাদতুল্য। তবে এ সময়ের অনেক পাঠক বোধ করি হুমায়ূন আহমেদ এর ছোটগল্প সমন্ধে জানেন না। আমার মতে, হুমায়ূন আহমেদের ছোট গল্প গুলো বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। তার অনেক উপন্যাস হালকা মেজাজে লেখা হলেও, তার অনেক গল্প রাশভারী মেজাজের । গল্পে তিনি প্রতিবাদী, সমাজের বহু অনিয়ম দেখিয়েছেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে। 

তার ছোটগল্প ‘খাদক’ রূপক অর্থে একনায়কতান্ত্রিক শোষন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লেখা। যেখানে গল্পের নায়ক মতি মিয়া একজন খাদক। আস্ত গরু, খাসি বা আধ মন জিলাপী খায় বাজি ধরে। গল্পের নায়ক মতি মিয়া বলছে, ‘আল্লাহতালা একটা বিদ্যা দিছে খাওনের বিদ্যা, অন্য কোন বিদ্যা দেয় নাই’। হুমাযূন আহমেদ লিখেছেন, ‘পেট বের হওয়া হাড় জিড়জিরে কয়েকটি শিশু। চোখ বড় বড় করে বাবার খাবার দেখছে। শিশুগুলো ক্ষুর্ধাত। হয়তো রাতেও কিছু খায়নি। বাবা একবারও তার বাচ্চাগুলোর দিকে তাকাচ্ছে না’। একনায়কতান্ত্রিক শোষণের বিরুদ্ধে কাল উত্তীর্ণ একটি গল্প। তার রচিত গল্প ‘ভয়’ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এক অসাধারণ উচ্চারণ।

তার অপর গল্প ‘কবি’। যেখানে নায়ক একজন পেশাদার প্রুফ রিডার ও কবি। ঘরে তার অসুস্থ কন্যা। তবুও প্রুফ দেখে দিচ্ছেন। প্রকাশক তাকে শোষণ করেছে সামান্য টাকার বিনিময়ে। তার আরো একটি গল্প ‘আনন্দ বেদনার কাব্য’তে তিনি লিখেছেন গরিব স্কুল মাষ্টার কবিতা লিখেন, হঠাৎ ইচ্ছে হলো একটা কবিতার বই বের করবেন, তার দশম শ্রেনী পড়ুয়া মেয়ে তার কবিতার বই এর প্রচ্ছদ এর জন্য একটা ছবি একে দিল। তারপর কিছুদিন পর মেয়েটি অসুখে মারা যায়। কোনো প্রকাশক বিনা পয়সায় কবিতার বই ছাপবেনা। তাই গরিব পিতা পাচঁ বছর ধরে তিলে তিলে বই ছাপার টাকা সঞ্চয় করলেন মেয়ের স্মৃতি ধরে রাখতে। তারপর সেই বই বের হলে তা উপহার দিলেন লেখক হুমাযূন আহমেদকে। লেখকদের প্রতি হুমায়ূন আহমেদের ছিল অপরিসীম মায়া।

আমাদের দেশের প্রকাশকদের দূনীর্তি ও নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে মানুষকে সচেতন করেছিলেন তিনি। তার জাদুকরি লেখার ভঙ্গি ও জনপ্রিয়তার কাছে হার মেনেছে এদেশের প্রকাশকেরা। শোনা যায়, যদি একটি বই পাওয়া যায় সেই আশায় টাকার বস্তা নিয়ে হুমায়ুন আহমেদের ফ্লাটে বসে থাকতেন অনেক প্রকাশক। বই পড়ুয়া জাতি যে কত অনিয়ম, অনাচার নিজের অজান্তেই প্রতিরোধ করতে পারে। তার উদাহরন সে সময়ের প্রকাশনা শিল্প।

সরল প্রাণ এই লেখক তার ‘শাহ্ মকবুল’গল্পে তিনি নিজের কথা লিখেছেন, ‘আমি ধরেই নিলাম প্রুফ রিডার মতির দেখা আর পাওয়া যাবে না। সে প্রুফ ভালো দেখতো তাতে সন্দেহ নেই। আমার মতো বানানে দুর্বল লেখকের জন্য এটা দুঃসংবাদ’। একজন লেখক কত উদার মনের হলে নিজের এমন দুর্বলতার কথা অকপটে জানাতে পারেন, তা একমাত্র লেখকরাই বুঝবেন। 

তার রচিত আরো অসাধারণ কিছু গল্প উনিশ শ’ একাত্তর, জুয়া, জীবনযাপন, জলিল সাহেবের পিটিশন, শিকার, ফেরা, একজন ক্রীতদাস, অয়োময়, অচিনবৃক্ষ, সৌরভ, লিপি, গন্ধ, অতিথি, ইত্যাদি।     

এই লেখকের কর্মমুখর জীবনের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

Better World Books Good Reading

লেখা পাঠাবার নিয়ম

মৌলিক লেখা হতে হবে।

নির্ভুল বানান ও ইউনিকোড বাংলায় টাইপকৃত হতে হবে।

অনুবাদ এর ক্ষেত্রে মুল লেখকের নাম ও সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি দিতে হবে।

আরো দিতে পারেন

লেখকের ছবি।

সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি।

বিষয় বস্তুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অঙ্কন চিত্র বা ছবি। 

সম্পাদক | Editor

তারিক সামিন

Tareq Samin

This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

 

লেখা পাঠাবার জন্য

ইমেইল:

This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

 

We use cookies to improve our website. Cookies used for the essential operation of this site have already been set. For more information visit our Cookie policy. I accept cookies from this site. Agree