ফুটবলার

03 July 2018
Author :  

  -মোহাম্মদ কামরুজ্জামান।

সাবুর বাবা উপজেলা মুন্সেফ আর হারুণের বাবা টিএন্ডটি অফিসের টেলিফোন অপারেটর কি না, সে কথা কখনও মাথায় আসত না তখন। সাবু কেমন গোল আটকাতে পারত, হারুন কেমন বল কাটাতে পারত, খেলতে ডাকলেই কাকে যখন-তখন মাঠে পেতাম, সেগুলোই ছিল সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার জন্য একমাত্র বিবেচনার বিষয়। তখন আমাদের ভাবের বেশ আদান-প্রদান হতো। ভাব ছিল, থানার কোয়ার্টারের রনি-রকি-হফুজদের ফুটবলে কতবার হারিয়েছি, তা-ই নিয়ে। থানার কোয়ার্টারের রনি-রকিদের হারাতে উপজেলা মুন্সেফের ছেলে হওয়া লাগত না, বৃষ্টি ভিজে ঘাসের মাঠের উপরে যে ছপ-ছপ করে বল নিয়ে ছুটতে পারত, কাদার ভিতরে যে বল লাথি দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারত, সেই হারুনকে লাগতো। ও ছিল উপজেলা টিএন্ডটি অফিসের টেলিফোন অপারেটার হাকিম কাকার ছেলে। হারুণের লিকলিকে দুটো পায়ে, তালের আঁটির মতো উঁচু হয়ে থাকা হাঁটুর মালা দুটো, আজও আমার কাছে শক্তিমত্তা এবং কৌশলের প্রতীক।

উপজেলা পরিষদের কলোনির সাথে থানার কোয়ার্টারের ফুটবল ম্যাচ হতো। ওরা হলুদ গেঞ্জি পরে আসত, আর আমরা নীল-সাদা; আমাদের কারোরটা নেভি ব্লু, কারোরটা আকাশী, কারোরটা ফ্যাকাসে; কারোরটা কলারঅলা শার্ট, কারোরটা হাতাছাড়া স্যান্ডো গেঞ্জি; কারোরটা ছেঁড়া, কারোরটা জোড়া। একটা কিছু নীল-সাদা হলেই হলো, পরে মাঠে নেমে যেতাম। ঝুম বৃষ্টিতে খেলা হতো। এ পাশের গোল রক্ষক ঘাড় গুঁজে দাঁড়িয়ে, ওপাশের গোল রক্ষককে আবছা দেখতে পেত। কপাল বেয়ে পানির ধারা নেমে চোখ ঝাঁপসা হয়ে আসত। বৃষ্টিতে ভিজে চামড়ার বল ফুলে উঠত, লাথি দিলে পুচ-পুচ করে আওয়াজ তুলে কদ্দুর গড়িয়েই থেমে যেত, গড়গড় করে ছুটে যেত না। শুধু হারুন লাথি দিলে বল বো-বো করে উড়ে যেত,  সোজা প্রতিপক্ষের গোলপোস্ট ভেদ করে পেছনের পাট ক্ষেতে ঢুকে পড়ত।

হারুনের খুব সাহস ছিল। খেলার জন্য ওর বাবা ওকে চুলোর লাকড়ি দিয়ে পিটাত। দুপুরে মার খেয়ে বিকেলে আবার যা তাই। ওর বাবা যখন দুপুরের খাবার খেতে ঘরে এসে শুনত, ও আবারও খেলতে গিয়েছিল, হারুনকে ডাক দিত, ‘হারুন, এদিকে আসো তো, বাবা।’আমরা জাম্বুরা গাছে উঠে জানালা দিয়ে দেখতাম, হারুন হাউমাউ করে কাঁদছে, আর ওর বাবার পা জড়িয়ে ধরতে চাচ্ছে। কিন্ত ওর বাবার মারার বিরাম নেই। ক্লান্ত হয়ে গেলে দাঁড়িয়ে একবার করে দম নিয়ে নিচ্ছে, ফোঁস-ফোঁস করে হাঁপাচ্ছে, আর গড়গড় করে ভবিষ্যদ্বাণী করছে, ‘খাবি তো রিস্কা চালাইয়া, কুলিগিরি কইরা, পড়াল্যাহা করবি ক্যান্‌, খবিশের বাচ্চা খবিশ!’ তখন হারুন আমাদের হাত ইশারা করে সরে যেতে ইঙ্গিত করত। ওর বাবা লুঙ্গির কোঁচাটা শক্ত করে বেঁধে নিয়ে আবার শুরু করত। মারধোর হয়ে গেলে ওর বাবা গালাগাল করতে করতে কলের পাড়ে হাতমুখ ধুতে যেত। খকখক করে কেশে গলা পরিষ্কার করত। পানি দিয়ে উঁচুস্বরে গড়গড়া করত। আমরা জাম্বুরা গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে হতাশ বদনে হারুনের দিকে হাত ইশারা করতাম, সাবু মুখ নাড়িয়ে ফিসফিস করত, ‘তাহলে কি আমরা আজ হারব?’ হারুন হাতের চেটোর উল্টো পিঠ দিয়ে ঠোঁটের রক্ত মুছতে মুছতে বলত, ‘তোরা যা!’ আমরা ধুপ্‌-ধুপ্‌ করে গাছ থেকে নেমে, হৈ-হৈ করে মাঠের দিকে ছুটতাম। সাবুর হাতে নেটের ব্যাগের ভেতরে আমাদের ফুটবল-আমাদের আনন্দ। সুমন পা তুলে লাথি মারতে চাইত, সাবু এক ঝটকায় সরিয়ে নিত। সুমন ভর সামলাতে না পেরে চিৎপটাং। সবাই হেসে উঠত। সুমনও হাসত, চিৎ হয়ে শুয়ে চার হাত-পা ছুড়ে হাসত। কারণ আমরা আজও জিতব-হারুন আসছে! 

দুপুরে খেতে এসে ওর বাবা যখন সুড়-ৎ-সুড়-ৎ করে নাক ডেকে বিকেলটা পার করত, হারুন এক ফাঁকে টিউবওয়েলের উপর পাড়া দিয়ে দেয়াল টপকে বাসার পেছন দিয়ে পগার পার। আমরা মাঠের কোনায় বসে দূর থেকে দেখতাম, হাফপ্যান্ট পরে নীল রঙের একমাত্র শার্টটির সবগুলো বোতাম খুলে হেঁটে হেঁটে আসছে হারুন। এসেই সুমনকে ঢ্যাপ্‌-ঢ্যাপ্‌ করে কিল। মার খাওয়ার সময় সুমনের জাম্বুরা গাছে ওঠা বারণ। অনেক বার বারণ করেছে ও। সুমন শোনে না। হারুন পোলাপানের সামনে মার খেতে পছন্দ করত না। তাই সুমনের কানপাটায় আচ্ছা করে ডলা দিত। হারুনকে ওর বাবা কখন মার শুরু করেছে, সেই সুসংবাদটা সুমনই প্রতিবার নিয়ে আসত। আর প্রতিবারই সাবু ওকে ধমক দিত, ‘তোকে তা দেখতে যেতে কে বলেছে?’

পা মচকে সন্ধ্যায় যখন ঘরে ফিরত হারুন, তখন আবার মার শুরু হতো; চুলের মুঠি ধরে চুলোর লাকড়ি দিয়ে দুই পায়ে পিটাত। হারুনের বাবা জানত না, থানা-কোয়ার্টারের ছেলেপেলেদের কাছে বিগত চার বছর ধরে উপজেলা কলোনির ছেলেপেলে ও বড়ভাইদের মুখ রক্ষা করে চলেছে ওই লিকলিকে পা দুটো। ওই পা দুটোর মালিক উপজেলা কলোনির সবার কাছে ম্যাকগাইভারের মতো বিশাল নায়ক। কতবার হারতে হারতে শেষ গোলে জিতে গেছি ওর জন্য। রেফারি শাহ আলম ভাইয়ের শেষ বাঁশি বাজার আগে, হারুন কর্নার থেকে কিক করেছে, বল ঘূর্ণি বাতাসের মতো ঘুরতে ঘুরতে গোল-কিপারের মাথার উপর দিয়ে সোজা গোল-পোস্ট ভেদ করে পেছনের পাটের ক্ষেতে। 

বাবার বদলির সুবাদে পঁচিশ বছর আগেকার ছেলেবেলার সেই মফঃস্বল শহর ছেড়ে ঢাকায় চলে এলাম। ঢাকায় এসে আর ফুটবল খেলা তেমন হতো না। মাঠ কোথায়, যে খেলব? ফুটবল খেলা দেখতে শুরু করলাম। রাত জেগে ফুটবল খেলা দেখা এক প্রকার নেশার মতো হয়ে দাঁড়াল।

এখনও ফুটবল খেলা দেখার সে নেশা আছে। এ ব্যাপারে সামিনার কাছে কম কথা শুনতে হয় না। কোপা আমেরিকা অথবা ইউরোপা লিগ শুরু হলেই, সামিনার মেজাজ খিঁচে যায়। সকালে ওর অফিস থাকে। বাসায় রাত জেগে কেউ টিভি দেখলে, ওর নাকি ঘুম হয় না। সকালে উঠে মনে হয়, ও নাকি রাতে ঘুমোয়নি। বাসার সবাই বাতি বন্ধ করে একসাথে ঘুমিয়ে পড়লেই কেবল ও ভাবতে পারে, রাতটা যথারীতি ঘুমিয়ে কাটিয়েছে। নয়তো ওর মনে হয়, সারারাত ও জেগেই ছিল। তাই ফুটবল ওর আজম্ম শক্র, আর বিশ্বকাপ ওর জন্য নরক।

সেই সামিনাকে আজ দেখলাম, রিক্সাঅলার সাথে গুটুর গুটুর করে আসন্ন বিশ্বকাপের গল্প করছে। বিশ্বকাপ এগিয়ে এলে অফিসের সবচেয়ে খেলা-বিদ্বেষী, পরলোকঅন্তপ্রাণ, গম্ভীর মানুষটিও হঠাৎ আলাপী হয়ে ওঠে, ‘পোলাপাইনের কাম দেখছেন, বিদেশীগো পতাকা কিন্যা নিজেগো ছাদ ভরতাছে? এইগুলার কুনো মানে অয়? আমার পোলারে দিছি সেইদিন থাপ্পড়। একশ ট্যাকায় নাকি পতাকা হয় না। দুইশো ট্যাকা লাগব। আমি কানে ডলা দিয়া কই, আমারে শিখাস্‌, পতাকা কিনতে কত ট্যাকা লাগে? আমি জানি না মনে করছস্‌? পোলায় কী কয় জানেন, পতাকা নাকি দুইডা লাগব? আমি জিগাই, দুইডা লাগব ক্যান্‌? একটা মাথায় দিবি আর একটা খাবি নিকি? পোলায় কী কয় জানেন, একটা ছাদে উড়াইব আর একটা রাস্তায় পুড়াইবো? দেখছেননি কারবার-ডা? হা-হা-হা-হা! নে পুড়া-দিলাম দুইডা...।’

বিশ্বকাপ আসছে দেখে, সবার ভাব সামিনাকেও বোধহয় পেয়ে বসেছে। সামিনা রিক্সাঅলার সাথে সে ভাব বিনিময় করছে। ভাব আমিও বিনিময় করি। তবে ভাব আমার পাল্টেছে। অদরকারি বিষয় নিয়ে অদরকারি লোকের সাথে ভাব বিনিময় করি না। এখন সচ্ছলতা, আর প্রতিষ্ঠা; আর সামাজিক সম্মান, আর প্রতিপত্তি নিয়ে ভাবি; আর ভেবে ভেবে ক্লান্ত হই। এসব নিয়ে ভাবতে গিয়ে অনেক নিরানন্দের দিকে নজর গিয়েছে। সেদিকে নজর দিতে গিয়ে অনেক আনন্দ হারিয়েছি, কিন্তু সাফল্য অর্জিত হয়েছে, তাতে সুখ মেলে। এখন আর সুখ অর্জন করে চলি না, সুখ রক্ষা করে চলি; অর্জনে পাওয়ার আনন্দ, আর রক্ষায় হারাবার ভয়। আমি ভয় নিয়ে বেঁচে আছি। বুক ভরে বাতাস টেনে নিয়ে ‘গো-ও-ল’ বলে বের করে দিতে পারি না। দূরে বসে খেলা দেখি, হাততালি দিই। তাই পাশে বসে সামিনাদের কথা শুনছিলাম। দালানের ছাদে ছাদে লাল-নীল-সবুজ-হলুদ পতাকা দেখছিলাম, লক্ষ করিনি, কে আগে গল্পটা শুরু করেছিল। বোধ হয় সামিনা, অথবা রিক্সাঅলাটাও হতে পারে।

রিক্সাঅলা মাঝে মাঝে পেছনের দিকে তাকাচ্ছিল। সামিনার গায়ে আকাশি নীল রঙের কামিজের ওপরে সাদা রঙের ওড়না। তা দেখেই হয়তো রিক্সাঅলা তার ফেভারিট টিমের আলাপ শুরু করে দিয়েছিল। রিক্সাঅলার গায়েও পুরনো নীল-সাদা গেঞ্জি, ঘামে জবজবে হয়ে ওর পোক্ত পিঠের উপর টানটান হয়ে লেপ্টে আছে। অনেক দিন পরতে পরতে জায়গায় জায়গায় সুতো খুলতে শুরু করেছে। পিঠের মাঝখানে একটা-দুটো জায়গায় ফুটো হয়ে গেছে।

সামিনা প্রশ্ন করলে রিক্সাঅলা পেছনে ফিরে দ্রুত জবাব দিয়ে, আবার সামনে ঘুরছে, টুংটাং করে বেল বাজিয়ে সিটে নিতম্ব ঠেকিয়ে ক্যাঁচক্যাঁচ করে প্যাডেল মারছে। প্রশ্নের উত্তর বিবরণ-ধর্মী হলে, এক হাতে হ্যান্ডেল ধরে আমাদের দিকে ঘুরে হড়বড় করে জবাব দিয়ে যাচ্ছে। তার উৎসাহ দেখার মতো। তার চেয়ে দেখার মতো তার রিক্সা চালানোর কায়দাটা। রিক্সা আপনা-আপনি চলছে, ডানে-বাঁয়ে বাঁক নিচ্ছে না, সামনে গোত্তা খাচ্ছে না। সামিনা ব্যাপার গুলো লক্ষ করছে। আমি লক্ষ করছি, আসন্ন বিশ্বকাপ উপলক্ষে ঢাকার আকাশ কেমন লাল-নীল-সবুজ-হলুদ পতাকায় ছেয়ে গেছে। কেমন আনন্দ আনন্দ লাগে। ক্ষণে ক্ষণে নানান কল্পনার পুলক জেগে ওঠে। কিন্তু পুলক আমাকে ভাসিয়ে নেয় না-সেই ছেলেবেলায় যেমন ভাসাত।

ভাই, এবার বিশ্বকাপ কোন দেশ নেবে বলে আপনার মনে হয়?’ সামিনা টিভি রিপোর্টারের মতো প্রশ্ন করল।

রিক্সাঅলা টকশোর বিজ্ঞ উত্তরদাতার মতো বলল, ‘যারা পুরা টুর্নামেন্ট এ্যাটাকিং ফুটবল খেলব।’

সামিনা গম্ভীর হয়ে গেল। তারপর হাসতে হাসতে জিজ্ঞাসা করল, ‘ফাইনাল ম্যাচেও কী এটাকিং ফুটবল খেলতে হবে?’

‘হয়, ফাইনাল ম্যাচেও।’

সামিনা আবারও গম্ভীর হয়ে গেলো, কথা খুঁজছে। আসলে বিশ্বকাপ সম্পর্কে রিক্সাঅলার আগ্রহ সামিনার ভালো লাগেনি, ভালো লেগেছে ওর বিশ্লেষণাত্মক জ্ঞান, সামিনা বিজনেস স্টাডিজের স্টুডেন্ট। সামিনা প্রশ্ন পেয়েছে, ‘তা কেন? গোল খেয়ে বসলে তো আর শোধ দিতে পারবে না। ঘর সামলে খেলতে হবে না?’ রিক্সাঅলা একটু থেমে সামনের দিকে তাকিয়েই জবাব দিল, ‘ফুটবল ঘরে বইসা খ্যালে না, মাঠে নাইমা খ্যালে।’

সামিনা একটু থেমে, জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনার ফেভারিট টিম কি বিশ্বকাপ পাবে?’

‘না।’

‘না কেন?’

‘তাগো টিম-ওয়ার্ক ভালো না।’

‘তাহলে সাপোর্ট করছেন কেন?’

রিক্সাঅলা এ প্রশ্নের কোনো জবাব দিল না। টুংটাং করে বেল বাজিয়ে জোরে জোরে রিক্সা টানতে শুরু করল।

এবার ওরা প্রসঙ্গ পাল্টাল; টিমের প্রসঙ্গ ছেড়ে ভেন্যুর প্রসঙ্গ শুরু করল। গলির মোড়ে গড়ানে রিক্সা ছেড়ে দিয়ে এক পা ভাঁজ করে রিক্সাঅলা বলতে লাগল, ‘...ওই দ্যাশে কুনো বেকার নাই, ম্যালা কাম, কিছু না পারলেও ফাস্টফুডের একটা দোকান দিয়া রাজার হালে চলতে পারবেন। ভিসা নিয়া একবার যাইলেই হইছে, থাইকা যাওন যায়...।’

‘ভিসা পাইলে আপনি যাবেন?’ সামিনা হাসছে।

রিক্সাঅলা হাসছে না। ও গম্ভীর গলায় বলল, ‘দ্যাশ ছাইড়া কই যামু?’

তারপর কিছুক্ষণ নীরব থেকে রিক্সাঅলা ক্যাঁচক্যাঁচ করে প্যাডেল মারতে মারতে স্বগত-স্বরে বলতে লাগল, ‘...কই যামু? পৃথিবী ফুটবলের লাহান গোল। পুব দিক দিয়া হাঁটা ধরলে, একদিন দেখবেন যেইহান থিকা হাঁটন শুরু করছিলেন, সেইহানে পৌঁছাইয়া গ্যাছেন। পশ্চিম দিক দিয়া হাঁটন শুরু করলেও তা-ই হয়। উত্তর ও দক্ষিণের বেলায়ও তা-ই...।’ কথা শেষে একবার পিছন ফিরে তাকাল।

ওদের আলাপ শুনতে শুনতে, কোন জগতে যেন চলে গিয়েছিলাম, কখন যে আমাদের মহল্লায় ঢুকে পড়েছি, টের পাইনি। সামিনা এর মধ্যেই খবর নিয়ে ফেলেছে, ও আমাদের মহল্লারই রিক্সাঅলা। রোজ সকালে ওকে অফিসে নিয়ে যাবার জন্য মাসিক চুক্তির প্রস্তাবও দিয়ে ফেলেছে। রিক্সাঅলা রাজি হয়নি। বোধ হয় সামিনার ভাড়ায় ওর পোষায়নি। সামিনার ভাড়ায় অত সহজে কারোর পোষায় না। কিন্তু আমি জানি, ওই ভাড়াতেই রিক্সাঅলার সাথে ও চুক্তি করে ফেলবে। রিক্সাঅলাও ‘পারলে একটু বাড়ায়য়া দিয়েন’ বলে আনন্দ চিত্তে তা গ্রহণ করবে। সামিনার এত কথা বলবার কারণ বুঝতে পারলাম। সকাল বেলায় ও প্রায়ই অফিসের বাস ফেল করে। বাস মেইন রোডে থামে। মহল্লার রিক্সা-স্ট্যান্ড থেকে ১৫ মিনিটের রিক্সা-দূরত্ব। বেরুতে বেরুতে ওর রোজই দেরি হয়। প্রতিদিনই ও একটা-না-একটা কিছু বাসায় ফেলে রেখে ঘর থেকে বেরুবে, তারপর আবার তালা খুলে ঘরে ঢুকবে, রান্না ঘরে গিয়ে গ্যাসের চুলোর নব ধরে একবার পরখ করবে, নয়তো বেডরুমে ঢুকে এসির দিকে একবার নজর বুলাবে। প্রায় প্রতিদিনই ও বাস মিস করে-অফিসে লেট হয়। তবে ভালো রিক্সাঅলা পেলে সাত-আট মিনিট হাতে নিয়ে বেরলেও বাস ধরতে পারে। ও কাজের মানুষ চেনে। সিটের উপর উঠে বসার কায়দা দেখেই ও বুঝতে পারে রিক্সাঅলাটা কতটুকু কাজের।

‘আমাদের সাথে একদিন বিশ্বকাপের একটি খেলা দেখবেন। আপনার দাওয়াত।’ সামিনা রিক্সা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে দেবার সময় বলল। আমি এবার কিছু না বললে ভালো দেখায় না। শুকনো মুখে সামিনার কথাগুলোই বললাম, ‘আপনার দাওয়াত।’ জুনের গরমে রিক্সাঅলার মুখ ঘেমে জবজবে হয়ে গেছে। সিটে বসে উল্টো দিকে প্যাডেল ঘুরাচ্ছে। লুঙ্গি উঠে যাচ্ছে হাঁটুর উপরে। তালের আঁটির মতো শক্ত হাঁটুর মালা তার। ওর দুই কান-পাটার ভেতর দিয়ে দরদর করে ঘাম বেরিয়ে ট্যান-পড়া দুই চোয়াল ভাসিয়ে দিচ্ছে। মনে হলো আমার শুকনো আতিথেয়তা ওকে আহত করেছে। হঠাৎ হাত তুলে তর্জনী নিক্ষেপ করে ও আমাদের বাসার গেট দেখালো। আমি লজ্জা পেলাম, দুই কান গরম হয়ে উঠল। মনে হলো, ও চেঁচিয়ে উঠল, ‘তোরা যা!’ আমি চমকে উঠলাম, ওর ঘামে ভেজা সারা মুখে বৃষ্টি-ভেজা জল-ছপছপ মাঠ দেখতে পেলাম, সেই মফঃস্বল শহরের ফুটবল মাঠ। সামিনা গেটের ভেতর থেকে ডাকছে, ‘কই, আসো।’আমি বললাম ‘আসছি।’

187 Views
Literary Editor

লেখা পাঠাবার নিয়ম

মৌলিক লেখা হতে হবে।

নির্ভুল বানান ও ইউনিকোড বাংলায় টাইপকৃত হতে হবে।

অনুবাদ এর ক্ষেত্রে মুল লেখকের নাম ও সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি দিতে হবে।

আরো দিতে পারেন

লেখকের ছবি।

সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি।

বিষয় বস্তুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অঙ্কন চিত্র বা ছবি। 

সম্পাদক | Editor

তারিক সামিন

Tareq Samin

This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

 

লেখা পাঠাবার জন্য

ইমেইল:

This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

 

We use cookies to improve our website. Cookies used for the essential operation of this site have already been set. For more information visit our Cookie policy. I accept cookies from this site. Agree