জীবন যখন যেমন

02 July 2018
Author :  

|| সালমা তালুকদার ||

 

মাঝে মাঝে রং চা টা খেতে ভালোই লাগে। ট্রান্সপারেন্ট মগে চায়ের রং টা দারুণ লাগে দেখতে। আজ এলাচ,দারচিনি,লং সব দিয়েছি। সাথে একটু লেবুর রস।বাহ্! স্বাদটাও চমৎকার হয়েছে। ভেবেছিলাম গরম চা খেতে খেতে রাস্তার গাড়ি দেখতে ভালোই লাগবে। বারান্দায় বসে হারিয়েও গিয়েছিলাম রাস্তার ব্যস্ততা দেখতে দেখতে। 

চোখের সামনের সবকিছু ঝাপসা হয়ে উঠে। যখন তৃতীয় চোখটা প্রাণ পেল; তখনই চা এর স্বাদটা তেতো হয়ে গেলো। চোখের সামনে তখন হাস্যোজ্জ্বল দুটো মুখ স্পষ্ট হয়ে উঠলো। দু'জনই ভীষন হাসি খুশি।খুনশুটি করছে আর হাসতে হাসতে একজন আরেকজনের গায়ে গড়িয়ে পরছে। দৃশ্যটা ধানমন্ডির একটা রেস্টুরেন্টের।

অফিসের একটা কাজে আজ একটু ধানমন্ডি যেতে হয়েছিলো। দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য ঢুকে যেই না কোনার দিকের একটা টেবিলে বসতে যাব! অমনি রিনিঝিনি হাসির শব্দ লক্ষ্য করে তাকাতেই চোখে পরলো নুপূর আর রিয়াদ। চোখে পরার পর রিনিঝিনি হাসিটা ডাইনীর হাসির শব্দের মত মনে হলো। ভাবলাম উঠে যাই। তারপর ভাবলাম উঠবো কেন! আমার টাকায় আমি খেতে এসেছি।পেটে ক্ষিদে চোঁ চোঁ করছে। তাহলে কেন বেইমান দুটো মানুষের জন্য উঠে যাব! আমি একটু জোড়েই ওয়েটারকে ডাকলাম। পরিচিত কন্ঠ কানে যাওয়া মাত্র দু'জনের মাথা একসাথে ঘুরলো।

আমি অবশ্য তাকাইনি। চোখের কোন দিয়ে খেয়াল করলাম তাড়াহুড়ো করে উঠে যাচ্ছে দু'জনে। টেবিলে পরে রইলো ফ্রাইড রাইস,বিফ সিজলিং,চিকেন কারীর আধা খাওয়া অংশ। কোল ড্রিঙ্কস তো ছুঁয়েই দেখেনি। আহারে !মায়াই লেগেছিলো তখন। রিয়াদের টাকার তো সবসময়ই সমস্যা। গত পাঁচ বছরে ওর মুখে নাই নাই আর নাই ছাড়া কিছু কখনো শুনেছি বলে মনে পরে না। তার মধ্যে এত গুলো খাবার নষ্ট।

চা এর তেতো ভাবটা সরাতে আরো এক চামচ চিনি দিলাম। এখন হয়ে গেলো গরম শরবত। ধূর চা--ই খাবো না। বেসিনের পানির সাথে চা টা ভাসিয়ে দিলাম। কলিংবেল তার স্বরে বেজে উঠলো। দরজা খুলতেই তামিম হুরমুর করে ঘরে ঢুকলো। সোজা বেড রুমে ঢুকে হাতের মোবাইল,ল্যাপটপের ব্যাগ সব ছুঁড়ে ফেললো খাটে। তারপর তার চিরাচরিত স্বভাব বশত সটান হয়ে শুয়ে পরলো বিছানায়। আমি কিছুই বললাম না। কি আর বলবো! তামিমের এই অত্যাচার টুকু সহ্য না করলে যে বাঁচাটাই মুস্কিল হয়ে যেত। ওর মাথার কাছে বসে কপালে মুখে হাত বুলাতে বুলাতে বললাম,

 "একটু হাত মুখটা অন্তত ধুয়ে এসো।"

 যেন গরম কড়াইয়ের তেলে একটু পানির ছিটা পরলো। এমন করে গলায় ঝাঁঝ ঢেলে তামিমের উত্তর, "কেন?আমি কি বাসে চড়ে,ঘামে ভিজে তোমার বিছানায় এসে উঠেছি নীল?"

"না,তা তো বলিনি?"

"থাক তোমার আর বলতে হবে না। জানো কত জরুরী মিটিং ছিল। তাড়াহুড়ো করে শেষ করে তোমার কাছে ছুটে এসেছি।”

 "জানি গো জানি। কিন্তু আমার যে তোমাকে না ডেকে উপায় ছিল না। মনটা ভীষন রকম খারাপ।"

 তামিম চট করে উঠে বসলো। দুই হাতের তালুতে আমার মুখটি ধরে উঁচু করে গভীর কন্ঠে বললো,

 "কি হয়েছে আমার সোনা বউটার? তুমি জানো না তোমার মন খারাপ আমার ভালো লাগে না।"

এই হচ্ছে তামিম। রিয়াদের সাথে বিচ্ছেদের ঠিক এক বছর পর তামিমের সাথে পরিচয় একটা পিকনিকে। রিয়াদ যখন নূপুরের সাথে জমিয়ে প্রেম করছে আমি তখন রাতের পর রাত একা বিছানায় ছটফট করেছি আর চোখের জলে বালিশ ভিজিয়েছি। দিনগুলো খারাপ কাটতো না। অফিসের কলিকদের সাথে আড্ডা দিয়ে,কাজ করে সময় গুলো যেন উড়ে যেত।

সেদিন ছিলো পিকনিক। অফিস থেকে আয়োজন করেছিলো। গেস্ট আনার অনুমতি ছিলো। সেই সুবাদে সুব্রত ওর বন্ধু তামিমকে নিয়ে এসেছিল। সুব্রত আমার কলিগ। আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে সুব্রত লিনার সাথে ভেগেছিল। খুব ভাব হয়েছিল সুব্রত আর লিনার। ভালোবাসা আসলে ধর্মও মানে না। তামিম একটা প্রানোচ্ছল ছেলে। অল্পক্ষনের মধ্যেই খুব ভাব হয়ে গেলো ।ভাব থেকে টেলিফোন নাম্বার আদান প্রদান। দুঃখ শেয়ার। অবশেষে একসাথে থাকা। আমার আর তামিমের ছোট সংসার। বিয়ে ছাড়া টোনাটুনির সংসার। ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কেউ কাউকে বিস্তারিত কিছু বলার প্রয়োজন মনে করিনি কখনো। দু'জন দু'জনের সাথে কথা বলছি। একাকিত্ব দূর হচ্ছে; এটাই বা কম কিসে! তবে রিয়াদের সাথে ব্রেকআপের কথাটা হালকা স্বরে বলেছি একদিন। এতে তামিমের কোনো প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করলাম না। কিছু জানতেও চায়নি। আবার আমি যখন ওর সম্পর্কে কিছু জানতে চেয়েছিলাম। ও এরিয়ে গেছে। আমিও আর কথা বাড়াইনি।

রিয়াদের প্রতারণায় আমার পৃথিবী যখন ওলট পালট; তখন বিয়ে নামক সামাজিক বন্ধনে একটা ঘেন্না ধরে গিয়েছিল। তামিম সেখান থেকে আমাকে উঠিয়ে এনেছে। তাই তামিমই এখন আমার সব। মানুষ আসলে একটা অবলম্বন চায়। অবলম্বন ছাড়া মানুষ বড় অসহায়।

 তামিমের রোমশ বুকে হাত বুলাতে বুলাতে প্রশ্ন করি, "ভালোবাসো?"

তামিম তার সর্বশক্তি দিয়ে জড়িয়ে ধরে বলে,"বাসি গো বাসি।"

 "কতটা বাসো?"

 তামিমের মৃদু হাসি, "এই এক প্রশ্ন ছাড়া তোমার কোনো প্রশ্ন নেই?"

 আমার কপট রাগ, "না নেই।"

 তামিম এবার ওর পুরো শরীরের ভার আমার উপর দিয়ে আমার ঠোঁট দুটো ওর মুখে পুরে নিল।যেন কমলা লেবু চুষছে। এমন করে চুষতে থাকলো। তারপর মুহূর্তে আমার শরীরের বাহ্যিক আভরণ সব অভ্যস্থ হাতে খুলে ফেললো। আমি বাঁধা দিলাম না। নিজের মনকে বোঝালাম।

 "আমি কি এজন্যই ডাকিনি তামিমকে?"

ছোট রুমের চার দেয়ালের মাঝে নর-নারীর আদিম সুখে ভাসতে ভাসতে ভাবলাম,"এটাই হয়তো জীবন। কিসের ভালোবাসা? ভালোবাসা আবার আছে নাকি? ভালোবেসে যে ঘর বেঁধেছিলাম সে ঘর যখন টিকলো না,। তবে এ জীবনে, আর; ও মুখো হওয়ার দরকার কি?"

আমিও তামিমকে ভালোবাসার রঙে ভেজাতে ভেজাতে; মনে মনে বললাম, তামিম তুমি স্বীকার না করলে কি হবে! আমি তো জানি, তুমি যেমন আমার; তেমনি অন্য কারোও। বিশ্বাস করো তামিম, তাতে আমার বিন্দুমাত্র অসুবিধা নেই। আমার ডাকে সাড়া দিয়ে এসে ভালোবাসি বলে, যেটুকু দাও; সেটুকুই আমি চাই। এর বেশি তোমাকে আমার প্রয়োজন নেই। সম্পর্কের নামে অধিকার, প্রয়োজন, দায়িত্ববোধ আর ভালোবাসা গুলিয়ে ফেলে; রিয়াদের মত তোমাকে হাড়াতে চাই না। জীবন থেকে শিখেছি, ভালোবাসাটাই আমাদের জীবনে বড় বেশি প্রয়োজন!" বেইমানের মতো, বড্ড অসময়ে চোখের কোনটা ভিজে উঠলো।

 

Better World Books Good Reading

533 Views
Literary Editor

লেখা পাঠাবার নিয়ম

মৌলিক লেখা হতে হবে।

নির্ভুল বানান ও ইউনিকোড বাংলায় টাইপকৃত হতে হবে।

অনুবাদ এর ক্ষেত্রে মুল লেখকের নাম ও সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি দিতে হবে।

আরো দিতে পারেন

লেখকের ছবি।

সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি।

বিষয় বস্তুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অঙ্কন চিত্র বা ছবি। 

সম্পাদক | Editor

তারিক সামিন

Tareq Samin

This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

 

লেখা পাঠাবার জন্য

ইমেইল:

This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

 

We use cookies to improve our website. Cookies used for the essential operation of this site have already been set. For more information visit our Cookie policy. I accept cookies from this site. Agree