দগ্ধ চিঠি

26 June 2018
Author :  

|| তারিক সামিন ||

 

এই গল্পের চরিত্র ও ঘটনা প্রবাহ কাল্পনিক। নির্দিষ্ট কোন দলের পক্ষে বা বিপক্ষে আমার কোন বক্তব্য নেই। কারণ বাংলাদেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের হাতেই লেগে রয়েছে সাধারণ মানুষের রক্ত। এটি এদেশের নিপীড়িত ও লাঞ্ছিত মানুষের সকরুণ আর্তনাদের একটি গল্প। - লেখক।

 

বার্ন ইউনিটে স্বামীর লাশের পাশে বসে আছে মিতু। লাশের সারা শরীর এখনো ব্যান্ডেজ মোড়ানো। মুখটা রক্তশূন্য, ফ্যাকাসে।  গত একুশটা দিন তীব্র কষ্টে, অমানুষিক যন্ত্রণা পোহাতে পোহাতে আজ ভোরে মৃত্যু হয়েছে তার স্বামী শাহরিয়ার হকের।

মিতু বসে আছে। নিঃশব্দে কেঁদে চলছে সে। তার গর্ভবতী ভারী শরীর কেঁপে উঠছে একটু পর পর।  একটা ছোট ডায়েরী, তাতে জীবনের শেষ কথাগুলো অলৈাকিক ভাবে লিখে গিয়েছে শাহরিয়ার। মিতু পড়ে চলছে, সমস্ত শোক ভুলে, যেন চিঠির মধ্যে হারিয়ে গেছে সে। শাহরিয়ার লিখেছে...

 

১০ই ডিসেম্বর ২০১৩ ইং

 

প্রিয় মিতু,

আমার মনে হয় সময় ঘনিয়ে আসছে। আগামীকাল হয়তো আমাদের আর দেখা হবেনা। মৃত্যুকে এত কাছাকাছি  দেখবো কখনো ভাবিনি। গত বিশটা দিন হাসপাতালে পুড়ে যাওয়া মানুষগুলোর তীব্র আর্তনাদ, ফিনাইল আর ডেটলের গন্ধ, স্বাদহ্নীন তরল খাবার, ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, চিকিৎসায় প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা খরচের দুঃচিন্তা, এসবের মধ্যেও; এখানে এসে বুঝলাম মানুষ মানুষের কত আপন। একজন অসুস্থ, রোগাক্রান্ত আর অসহায় মানুষের দুঃখ অপর একজন অসহায় মানুষই ভাল বোঝে। তাই মনেহয় মানুষে মানুষে ভাতৃত্ববোধ হাসপাতালেই বেশী।

এখানে আমাদের ওয়ার্ডের নার্স রিক্তা আপা। ভারী মিষ্টি তার ব্যবহার। অত্যন্ত নিবেদিত ভাবে প্রত্যেক রোগীর সেবা করে সে ।  তার শ্যামবর্ণ, অতি সাধারণ মুখমণ্ডল, দেখতেও খুব সাদাসিধে। তবুও এই মানুষটির মধ্যে আমি একজন দেবীর দেখা পেয়েছি। নার্সরা আমাদের সমাজের সবচাইতে মহান পেশার মানুষ। রিক্তা আপা বিবাহিত, ওনার চার বছরের একটি ছেলে আছে। স্বামী-সন্তান ছেড়ে মাঝে-মাঝেই নাইট ডিউটি করতে হয় ওনাকে।

গত পরশু আমার প্রচণ্ড জ্বর ছিল। আমার পাশের বেডের দেলোয়ার ভাইয়ের ড্রেসিং পড়ানো হচ্ছিল। তার কাতরানো আর গোঙ্গানির শব্দে দর্শনার্থী দুইজন সুস্থ-স্বাস্থ্যবান যুবক জ্ঞান হারিয়ে ধপাস করে পড়ে গেল। এমনিতে ডাক্তাররা কাউকে বার্ন ইউনিটে ঢুকতে দেয়না। এখন লোকে-লোকারণ্য। দেলোয়ার ভাইয়েরও আমার মত শরীরের ৪০% এর বেশী পুড়ে গেছে। প্রথম যখন এসেছিল, সারা শরীর কালো পোড়া; ফোস্কার ভেতর পানি জমতে শুরু করেছে। ওনার শরীরে স্যালাইন দেবার জন্য রগ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলোনা।  ডাক্তার আর নার্সরা অনেক ধৈর্য ধরে ঔষধ দিল, মলম দিল, তারপর ব্যান্ডেজ করলো। আমার ঘা-গুলো শুকিয়ে আসছে, কোথাও কোথাও হলুদ পদার্থ জমেছে, গভীর ক্ষত গুলো থেকে রক্ত বের হয় মাঝে মাঝে।

হায়! আমরাতো কত কিছুই চোখের সামনে পুড়তে দেখি। কারো ঘর পুড়ে, কারো কপাল পুড়ে কিন্তু যাত্রীবাহী বাসের ভেতর দগ্ধ মানুষগুলোর পোড়া শরীর যেন আমাদের কারো দেখতে না হয়!

দেখ-দেখি কি বলতে কি বলছি। কোথায় সিস্টার রিক্তা আপার কথা বলাবো, তা-না-বলে বারবার তোমার মন খারাপ করে দিচ্ছি। আমার হাতদুটো অলৈাকিকভাবে খুব সামান্য পুড়েছে, তাই সারাদিন এসব হাবিজাবি লিখি। আগুনের প্রচণ্ড তাপ নিঃশ্বাসের সাথে গ্রহণ করার কারণে আমার শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, কথা বলাতে কষ্ট হয়, তবুও বলি। যতক্ষন ব্যথা কম থাকে, মাঝে মাঝে আলাপ জুড়ে দেই সিস্টার রিক্তার সাথে। সেদিন আমাকে তোমার কথা জিজ্ঞাসা করলো। আমি বললাম আর কয়েক সপ্তাহ পরই আমাদের সন্তান ভূমিষ্ঠ হবে। শুনে উনি খুব খুশি হল। আবার একটু  পর মনে হল, চোখের কোনে সামান্য পানি। সিস্টারকে আমার জীবনের স্বপ্নের কথা, তোমার কথা, আমার ব্যবসা আর জীবন সংগ্রামের অভিজ্ঞতার কথা বলি। শুনে সিস্টার  দুঃখ করে বলে, ইস্ আপনার মত এত বুদ্ধিমান, এত ভাল আর সৎ মানুষের জীবনে এমন কেন হলো!

চলন্ত বাসে যারা পেট্রোল বোমা মারে, ওরাতো মানুষকে মারে না; ওরা মারে ঘুণে ধরা, পচে যাওয়া সমাজ ব্যবস্থার উপর। যে রাষ্ট্র, সমাজ ব্যবস্থা ওদের অমানুষ বানিয়েছে, হয়তো তাদের লক্ষ করে। কপাল দোষে পুড়ে মরে কর্মঠ মানুষ। সন্তানের চিকিৎসা করতে আসা মা আর তার দুই বছরের অবুঝ শিশু, এমন আরো কত নিরীহ মানুষ।

আমি প্রতিনিয়ত আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানাই, দয়াময় আমাকে আবার সুস্থ-সবল করে দাও।  আমি যেন আমার স্ত্রী-সন্তানের সাথে আর ক’টা বছর সুখে জীবন-যাপন করতে পারি। আমার অনাগত সন্তান, যে এখনো তোমার গর্ভে, তার জন্যও খুব কষ্ট হয়। হায়! এই দেশে তাকেও জন্মাতে হবে। অনাচার আর অবিচারের স্বর্গরাজ্যে এই দেশে,  পদে পদে দুঃখ-কষ্টে কাটবে তার জীবন্।

এই যা! ফের দুঃখের কথা বলছি। শোন, তুমি আগামীকাল যখন হাসপাতালে আসবে, সুন্দর করে সেজে আসবে।  আমার মনটা ভীষণ খুশি হয় তোমাকে দেখলে। আমার বাবুটা কেমন আছে? দুষ্টুমি করে? এখনো কি হঠাৎ পেটের ভেতর থেকে লাথি মারে? দেখে নিও অনেক দুষ্ট হবে। তোমার বমিটা কমেছে?  মা কি এখনো অনেক কান্না-কাটি করে?

শিমুলকে বলো, ও যেন মাঝে মাঝে ব্যবসাটার দেখাশোনা করে। বাজারে অনেক টাকা বাকি পড়ে আছে। টাকাগুলো তুলতে হবে। এদিকে আমার পেছনে-তো লক্ষ-লক্ষ টাকা খরচ হচ্ছে। একবারে মরে গেলেও বেঁচে যেতাম।  এই আট-দশ লক্ষ টাকা দিয়ে আমাদের সন্তানটির ভবিষ্যৎ খরচ চলতো। হাসপাতালের সবাই রিক্তা আপার মত নিবেদিতপ্রাণ মানুষ নয়। এখানে সবাই পরিশ্রম করে, তবে টাকাটাই মুখ্য অনেকের কাছে।  মানুষের কষ্ট আর যন্ত্রণা থেকে লাভবান হবার একটা লালসা দেখি এদের মধ্যে। ঠিক আমাদের রাজনীতিবিদের মতো।  

ইদানীং তোমার কথা খুব মনে পড়ে। তোমার সুন্দর মুখ, স্নিগ্ধ হাসি, সিল্কের মত মসৃণ চুল, চোখের সামনে ভেসে উঠে। শোনো তুমি ভাল থেক, নিজের প্রতি যত্ন নিও। বেশি করে খাওয়া-দাওয়া কর। আমাদের সন্তানটা যেন সুস্থ-সবল হয়। এই নরক রাজ্যে, যেখানে জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি, সীমাহ্নীন অসৎ প্রতিযোগিতা। জেনে রেখো, সেখানে দুর্বলের কোন স্থান নেই।  এদেশে মানুষের দুঃসময়ে সবাই বাড়তি কিছু আয়ের চিন্তা করে।

বাবা যেভাবে আমার সেবা করছে, তাতে আমার শৈশব স্মৃতি মনে পড়ছে। তুমিতো জানো, বাবা বরাবরই রাগী মানুষ। কিন্তু ছোটবেলায় আমাকে খুব আদর করতো। বাজারে গেলে আমি সবচেয়ে বড় মাছটা পছন্দ করতাম। মাঝে মাঝে টাকা থাকতো না। তবুও বাবা আমার জন্য সবচেয়ে বড় মাছটা কিনতো। শুধু মাছ নিয়ে বাসায় ফিরলে মা খুব রাগারাগি করতো। বলতো, চাল-ডাল, তরু-তরকারী কোথায়? শুধু বড় মাছ খেয়েই কি পেট ভরবে? কিন্তু বাবা  আমার আনন্দটাকেই বড় মনে করতো। আমি বড়ই স্মৃতি-ভোলা মানুষ। বাবার ভাল গুন গুলো মনে না রেখে; শুধু রাগ গুলোই মনে রাখতাম।

আজ রিক্তা আপার মেজাজ একটু খিটখিটে। বাসায় ছেলেটার জ্বর। কিছু দিন হলো ওনার স্বামীর চাকুরী চলে গেছে। বাসায় বসে থাকে, তবুও নাকি ছেলেটার যত্ন নেয় না। আয়াকে বকা দিল, আমার প্রস্রাবের থলেটা পাল্টে দেয়নি বলে। তারপর আমাকে ঔষধ খাইয়ে দিল। সাক্ষাত যেন কোন মায়াময়ী দেবী। একটু আগেও ডাক্তার এসেছিল। বললো, আমার পায়ে গ্যাং-গ্রিন হচ্ছে, সেই জন্যই প্রচণ্ড  দুর্গন্ধ।

এই ইন্টারনেটের যুগে কেউ কি আর চিঠি লেখে বলো?  তবুও আমার লিখতে ভীষণ ভাল-লাগে। আমি মরে গেলে তুমি পড়ো, তারপর রেখে দিও আমার অনাগত সন্তানের জন্য। তাকে বলো, আমাকে নির্মম পাশবিক রাজনীতির বলি হতে হয়েছে। এমন দুঃসময়ে তাকে পৃথিবীতে নিয়ে আসার জন্য; বাবা হিসাবে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।

আমার সকল ভুলের জন্য আমি তোমার মাধ্যমে সকলের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। দোয়াকরো আমার মত হতভাগ্য, এ পৃথিবীতে আর যেন জন্ম না নেয়। তুমিও  আমার ভুল-ক্রটি গুলো ভুলে যেও।

 

ইতি,

তোমার স্বামী

শাহরিয়ার।  

154 Views
Literary Editor

লেখা পাঠাবার নিয়ম

মৌলিক লেখা হতে হবে।

নির্ভুল বানান ও ইউনিকোড বাংলায় টাইপকৃত হতে হবে।

অনুবাদ এর ক্ষেত্রে মুল লেখকের নাম ও সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি দিতে হবে।

আরো দিতে পারেন

লেখকের ছবি।

সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি।

বিষয় বস্তুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অঙ্কন চিত্র বা ছবি। 

সম্পাদক | Editor

তারিক সামিন

Tareq Samin

This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

 

লেখা পাঠাবার জন্য

ইমেইল:

This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

 

We use cookies to improve our website. Cookies used for the essential operation of this site have already been set. For more information visit our Cookie policy. I accept cookies from this site. Agree