ছোট গল্প

ছোট গল্প (6)

 

-তারিক সামিন

 

আশ্বিন মাস থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। এই রোদ্দুর, এই বৃষ্টি। মেঘ আর সূর্যের লুকোচুরি। চারিদিকে যত দুর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। এই বন্যায় খুব কষ্ট করে দিনপাত করছে দিলারা। ঘরের ভিতর হাটু পর্যন্ত পানি। টিনের ঘর, তার মধ্য মাচা পেতে কোন রকমে বেঁচে আছে ওরা। দিলারার সদ্য প্রসুত শিশুটির বয়স আঠারো দিন। এখনো নাম রাখা হয়নি।  মা’র কাছে শুনেছিল, গরীবের জীবন এমনই জিনিস হাজার কষ্টেও টিকে থাকে’।

দিলারার স্বামী হারিস। অলস প্রকৃতির মানুষ। মাঝে মধ্যে কখনো কখনো কিছু কাজ করে সে। সব কিছুতেই ভাবলেশহীন। সুঠাম শরীর, বেটে-খাটো মানুষ। মাথায় চুল নেই প্রায়। সারাদিন একটার পর একটা সিগারেট ফুঁকে। দু'টো গাভী আর দু'টো বাছুর আছে তার। এখন উচু রাস্তার উপরে বাধা থাকে ওগুলো। গ্রামের সবার গৃহ পালিত পশু-পাখির আশ্রয় এখন রাস্তা বা ব্রিজের উপর। মানুষের চেয়ে কিছুটা ভাল আছে ওরা।

প্রতিদিন দুই গাভী যতটুকু দুধ দেয়। তার থেকে সামান্য সন্তানের জন্য রেখে বেশির ভাগই বিক্রি করে দেয় হারিস।

‘দুধ বিক্রি কইরা, চাল, আলু আর ডিম কিনে আনবা’। স্বামীকে মনে করিয়ে দিল দিলারা।

‘আচ্ছা আনমু’ বলে হারিস নৌকা নিয়ে চললো বাজারের দিকে।

কোথাও কোথাও পানির নিচের আবাদী জমি দেখা যায়। সেখানে মাছেরা ছুটোছুটি করে। বক আর মাছরাঙা টুপটাপ ধরে নিচ্ছে মাছ। একটু দুরে লাল আর সাদা শাপলা ফুটে আছে। এসব দৃশ্য; খুব একটা মন কারে না হারিসের। তার মাথা ঝিম ঝিম করছে, শরীরে অস্বস্তি হচ্ছে। সকাল থেকে একটা সিগারেট খাওয়া হয়নি তার। কাল রাতে আধ প্যাকেট সিগারেট মাচা থেকে কখন যে পানিতে পরে গেছে টের পায়নি সে।

বাজারের বেশীরভাগ অংশেই পানি উঠেছে। এ্যালুমিনিয়ামর জগ, বালতি আর কলস ভরে দুধ নিয়ে বসে আছে চারজন দুধবিক্রেতা।

‘কাকা আজ দাম কত উঠছে?’ এসেই রহিম মাঝিকে জিজ্ঞাসা করে হারিস।

‘চল্লিশ টাকা লিটার,  উত্তর দিল রহিম মাঝি।

আধ ঘন্টা বসে থেকে চার লিটার দুধ ১৬০ টাকায় বিক্রি করলো হারিস। এখন সে যাচ্ছে মুদি দোকানীর কাছে। মুদি দোকানে  জিনিসপত্রের অভাব। বন্যার কারনে সরবরাহ নেই অনেক মালামালের। এই সুযোগে দাম অনেকটা বাড়তি রাখছে দোকানদার রিয়াজ।

‘রিয়াজ ভাই এক প্যাকেট সিগারেট দাও।’

দোকানী এক প্যাকেট সিগারেট এগিয়ে দিল হারিসকে। এসেই দুইটা কিনেছিল, শেষ হয়ে গেছে সেগুলো।

আর কি? প্রশ্ন করলো দোকানী রিয়াজ।

‘এক কেজি চাল, আধা কেজি আলু দাও।’

চাল, আলু মেপে আলাদা পলিথিন ব্যাগে দিল দোকানী।

কত হইছে?

‘চাল - ৪০, আলু- ১৫, সিগারেট ৯০ মোট ১৪৫।’

১৫০ টাকা দিল হারিস ফেরত পেল ৫ টাকা।

সিগারেট ফুকতে ফুকতে শান্ত মনে বাড়ীর পথে রওনা হলো সে।

হারিসের পুরো সংসারের খাবার খরচ ৫৫ টাকা আর তার প্রতিদিন সিগারেট লাগে প্রায় একশত টাকার। হারিস কখনো ভেবে দেখেনি সেটা।

Better World Books Good Reading

  -মোহাম্মদ কামরুজ্জামান।

সাবুর বাবা উপজেলা মুন্সেফ আর হারুণের বাবা টিএন্ডটি অফিসের টেলিফোন অপারেটর কি না, সে কথা কখনও মাথায় আসত না তখন। সাবু কেমন গোল আটকাতে পারত, হারুন কেমন বল কাটাতে পারত, খেলতে ডাকলেই কাকে যখন-তখন মাঠে পেতাম, সেগুলোই ছিল সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার জন্য একমাত্র বিবেচনার বিষয়। তখন আমাদের ভাবের বেশ আদান-প্রদান হতো। ভাব ছিল, থানার কোয়ার্টারের রনি-রকি-হফুজদের ফুটবলে কতবার হারিয়েছি, তা-ই নিয়ে। থানার কোয়ার্টারের রনি-রকিদের হারাতে উপজেলা মুন্সেফের ছেলে হওয়া লাগত না, বৃষ্টি ভিজে ঘাসের মাঠের উপরে যে ছপ-ছপ করে বল নিয়ে ছুটতে পারত, কাদার ভিতরে যে বল লাথি দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারত, সেই হারুনকে লাগতো। ও ছিল উপজেলা টিএন্ডটি অফিসের টেলিফোন অপারেটার হাকিম কাকার ছেলে। হারুণের লিকলিকে দুটো পায়ে, তালের আঁটির মতো উঁচু হয়ে থাকা হাঁটুর মালা দুটো, আজও আমার কাছে শক্তিমত্তা এবং কৌশলের প্রতীক।

উপজেলা পরিষদের কলোনির সাথে থানার কোয়ার্টারের ফুটবল ম্যাচ হতো। ওরা হলুদ গেঞ্জি পরে আসত, আর আমরা নীল-সাদা; আমাদের কারোরটা নেভি ব্লু, কারোরটা আকাশী, কারোরটা ফ্যাকাসে; কারোরটা কলারঅলা শার্ট, কারোরটা হাতাছাড়া স্যান্ডো গেঞ্জি; কারোরটা ছেঁড়া, কারোরটা জোড়া। একটা কিছু নীল-সাদা হলেই হলো, পরে মাঠে নেমে যেতাম। ঝুম বৃষ্টিতে খেলা হতো। এ পাশের গোল রক্ষক ঘাড় গুঁজে দাঁড়িয়ে, ওপাশের গোল রক্ষককে আবছা দেখতে পেত। কপাল বেয়ে পানির ধারা নেমে চোখ ঝাঁপসা হয়ে আসত। বৃষ্টিতে ভিজে চামড়ার বল ফুলে উঠত, লাথি দিলে পুচ-পুচ করে আওয়াজ তুলে কদ্দুর গড়িয়েই থেমে যেত, গড়গড় করে ছুটে যেত না। শুধু হারুন লাথি দিলে বল বো-বো করে উড়ে যেত,  সোজা প্রতিপক্ষের গোলপোস্ট ভেদ করে পেছনের পাট ক্ষেতে ঢুকে পড়ত।

হারুনের খুব সাহস ছিল। খেলার জন্য ওর বাবা ওকে চুলোর লাকড়ি দিয়ে পিটাত। দুপুরে মার খেয়ে বিকেলে আবার যা তাই। ওর বাবা যখন দুপুরের খাবার খেতে ঘরে এসে শুনত, ও আবারও খেলতে গিয়েছিল, হারুনকে ডাক দিত, ‘হারুন, এদিকে আসো তো, বাবা।’আমরা জাম্বুরা গাছে উঠে জানালা দিয়ে দেখতাম, হারুন হাউমাউ করে কাঁদছে, আর ওর বাবার পা জড়িয়ে ধরতে চাচ্ছে। কিন্ত ওর বাবার মারার বিরাম নেই। ক্লান্ত হয়ে গেলে দাঁড়িয়ে একবার করে দম নিয়ে নিচ্ছে, ফোঁস-ফোঁস করে হাঁপাচ্ছে, আর গড়গড় করে ভবিষ্যদ্বাণী করছে, ‘খাবি তো রিস্কা চালাইয়া, কুলিগিরি কইরা, পড়াল্যাহা করবি ক্যান্‌, খবিশের বাচ্চা খবিশ!’ তখন হারুন আমাদের হাত ইশারা করে সরে যেতে ইঙ্গিত করত। ওর বাবা লুঙ্গির কোঁচাটা শক্ত করে বেঁধে নিয়ে আবার শুরু করত। মারধোর হয়ে গেলে ওর বাবা গালাগাল করতে করতে কলের পাড়ে হাতমুখ ধুতে যেত। খকখক করে কেশে গলা পরিষ্কার করত। পানি দিয়ে উঁচুস্বরে গড়গড়া করত। আমরা জাম্বুরা গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে হতাশ বদনে হারুনের দিকে হাত ইশারা করতাম, সাবু মুখ নাড়িয়ে ফিসফিস করত, ‘তাহলে কি আমরা আজ হারব?’ হারুন হাতের চেটোর উল্টো পিঠ দিয়ে ঠোঁটের রক্ত মুছতে মুছতে বলত, ‘তোরা যা!’ আমরা ধুপ্‌-ধুপ্‌ করে গাছ থেকে নেমে, হৈ-হৈ করে মাঠের দিকে ছুটতাম। সাবুর হাতে নেটের ব্যাগের ভেতরে আমাদের ফুটবল-আমাদের আনন্দ। সুমন পা তুলে লাথি মারতে চাইত, সাবু এক ঝটকায় সরিয়ে নিত। সুমন ভর সামলাতে না পেরে চিৎপটাং। সবাই হেসে উঠত। সুমনও হাসত, চিৎ হয়ে শুয়ে চার হাত-পা ছুড়ে হাসত। কারণ আমরা আজও জিতব-হারুন আসছে! 

দুপুরে খেতে এসে ওর বাবা যখন সুড়-ৎ-সুড়-ৎ করে নাক ডেকে বিকেলটা পার করত, হারুন এক ফাঁকে টিউবওয়েলের উপর পাড়া দিয়ে দেয়াল টপকে বাসার পেছন দিয়ে পগার পার। আমরা মাঠের কোনায় বসে দূর থেকে দেখতাম, হাফপ্যান্ট পরে নীল রঙের একমাত্র শার্টটির সবগুলো বোতাম খুলে হেঁটে হেঁটে আসছে হারুন। এসেই সুমনকে ঢ্যাপ্‌-ঢ্যাপ্‌ করে কিল। মার খাওয়ার সময় সুমনের জাম্বুরা গাছে ওঠা বারণ। অনেক বার বারণ করেছে ও। সুমন শোনে না। হারুন পোলাপানের সামনে মার খেতে পছন্দ করত না। তাই সুমনের কানপাটায় আচ্ছা করে ডলা দিত। হারুনকে ওর বাবা কখন মার শুরু করেছে, সেই সুসংবাদটা সুমনই প্রতিবার নিয়ে আসত। আর প্রতিবারই সাবু ওকে ধমক দিত, ‘তোকে তা দেখতে যেতে কে বলেছে?’

পা মচকে সন্ধ্যায় যখন ঘরে ফিরত হারুন, তখন আবার মার শুরু হতো; চুলের মুঠি ধরে চুলোর লাকড়ি দিয়ে দুই পায়ে পিটাত। হারুনের বাবা জানত না, থানা-কোয়ার্টারের ছেলেপেলেদের কাছে বিগত চার বছর ধরে উপজেলা কলোনির ছেলেপেলে ও বড়ভাইদের মুখ রক্ষা করে চলেছে ওই লিকলিকে পা দুটো। ওই পা দুটোর মালিক উপজেলা কলোনির সবার কাছে ম্যাকগাইভারের মতো বিশাল নায়ক। কতবার হারতে হারতে শেষ গোলে জিতে গেছি ওর জন্য। রেফারি শাহ আলম ভাইয়ের শেষ বাঁশি বাজার আগে, হারুন কর্নার থেকে কিক করেছে, বল ঘূর্ণি বাতাসের মতো ঘুরতে ঘুরতে গোল-কিপারের মাথার উপর দিয়ে সোজা গোল-পোস্ট ভেদ করে পেছনের পাটের ক্ষেতে। 

বাবার বদলির সুবাদে পঁচিশ বছর আগেকার ছেলেবেলার সেই মফঃস্বল শহর ছেড়ে ঢাকায় চলে এলাম। ঢাকায় এসে আর ফুটবল খেলা তেমন হতো না। মাঠ কোথায়, যে খেলব? ফুটবল খেলা দেখতে শুরু করলাম। রাত জেগে ফুটবল খেলা দেখা এক প্রকার নেশার মতো হয়ে দাঁড়াল।

এখনও ফুটবল খেলা দেখার সে নেশা আছে। এ ব্যাপারে সামিনার কাছে কম কথা শুনতে হয় না। কোপা আমেরিকা অথবা ইউরোপা লিগ শুরু হলেই, সামিনার মেজাজ খিঁচে যায়। সকালে ওর অফিস থাকে। বাসায় রাত জেগে কেউ টিভি দেখলে, ওর নাকি ঘুম হয় না। সকালে উঠে মনে হয়, ও নাকি রাতে ঘুমোয়নি। বাসার সবাই বাতি বন্ধ করে একসাথে ঘুমিয়ে পড়লেই কেবল ও ভাবতে পারে, রাতটা যথারীতি ঘুমিয়ে কাটিয়েছে। নয়তো ওর মনে হয়, সারারাত ও জেগেই ছিল। তাই ফুটবল ওর আজম্ম শক্র, আর বিশ্বকাপ ওর জন্য নরক।

সেই সামিনাকে আজ দেখলাম, রিক্সাঅলার সাথে গুটুর গুটুর করে আসন্ন বিশ্বকাপের গল্প করছে। বিশ্বকাপ এগিয়ে এলে অফিসের সবচেয়ে খেলা-বিদ্বেষী, পরলোকঅন্তপ্রাণ, গম্ভীর মানুষটিও হঠাৎ আলাপী হয়ে ওঠে, ‘পোলাপাইনের কাম দেখছেন, বিদেশীগো পতাকা কিন্যা নিজেগো ছাদ ভরতাছে? এইগুলার কুনো মানে অয়? আমার পোলারে দিছি সেইদিন থাপ্পড়। একশ ট্যাকায় নাকি পতাকা হয় না। দুইশো ট্যাকা লাগব। আমি কানে ডলা দিয়া কই, আমারে শিখাস্‌, পতাকা কিনতে কত ট্যাকা লাগে? আমি জানি না মনে করছস্‌? পোলায় কী কয় জানেন, পতাকা নাকি দুইডা লাগব? আমি জিগাই, দুইডা লাগব ক্যান্‌? একটা মাথায় দিবি আর একটা খাবি নিকি? পোলায় কী কয় জানেন, একটা ছাদে উড়াইব আর একটা রাস্তায় পুড়াইবো? দেখছেননি কারবার-ডা? হা-হা-হা-হা! নে পুড়া-দিলাম দুইডা...।’

বিশ্বকাপ আসছে দেখে, সবার ভাব সামিনাকেও বোধহয় পেয়ে বসেছে। সামিনা রিক্সাঅলার সাথে সে ভাব বিনিময় করছে। ভাব আমিও বিনিময় করি। তবে ভাব আমার পাল্টেছে। অদরকারি বিষয় নিয়ে অদরকারি লোকের সাথে ভাব বিনিময় করি না। এখন সচ্ছলতা, আর প্রতিষ্ঠা; আর সামাজিক সম্মান, আর প্রতিপত্তি নিয়ে ভাবি; আর ভেবে ভেবে ক্লান্ত হই। এসব নিয়ে ভাবতে গিয়ে অনেক নিরানন্দের দিকে নজর গিয়েছে। সেদিকে নজর দিতে গিয়ে অনেক আনন্দ হারিয়েছি, কিন্তু সাফল্য অর্জিত হয়েছে, তাতে সুখ মেলে। এখন আর সুখ অর্জন করে চলি না, সুখ রক্ষা করে চলি; অর্জনে পাওয়ার আনন্দ, আর রক্ষায় হারাবার ভয়। আমি ভয় নিয়ে বেঁচে আছি। বুক ভরে বাতাস টেনে নিয়ে ‘গো-ও-ল’ বলে বের করে দিতে পারি না। দূরে বসে খেলা দেখি, হাততালি দিই। তাই পাশে বসে সামিনাদের কথা শুনছিলাম। দালানের ছাদে ছাদে লাল-নীল-সবুজ-হলুদ পতাকা দেখছিলাম, লক্ষ করিনি, কে আগে গল্পটা শুরু করেছিল। বোধ হয় সামিনা, অথবা রিক্সাঅলাটাও হতে পারে।

রিক্সাঅলা মাঝে মাঝে পেছনের দিকে তাকাচ্ছিল। সামিনার গায়ে আকাশি নীল রঙের কামিজের ওপরে সাদা রঙের ওড়না। তা দেখেই হয়তো রিক্সাঅলা তার ফেভারিট টিমের আলাপ শুরু করে দিয়েছিল। রিক্সাঅলার গায়েও পুরনো নীল-সাদা গেঞ্জি, ঘামে জবজবে হয়ে ওর পোক্ত পিঠের উপর টানটান হয়ে লেপ্টে আছে। অনেক দিন পরতে পরতে জায়গায় জায়গায় সুতো খুলতে শুরু করেছে। পিঠের মাঝখানে একটা-দুটো জায়গায় ফুটো হয়ে গেছে।

সামিনা প্রশ্ন করলে রিক্সাঅলা পেছনে ফিরে দ্রুত জবাব দিয়ে, আবার সামনে ঘুরছে, টুংটাং করে বেল বাজিয়ে সিটে নিতম্ব ঠেকিয়ে ক্যাঁচক্যাঁচ করে প্যাডেল মারছে। প্রশ্নের উত্তর বিবরণ-ধর্মী হলে, এক হাতে হ্যান্ডেল ধরে আমাদের দিকে ঘুরে হড়বড় করে জবাব দিয়ে যাচ্ছে। তার উৎসাহ দেখার মতো। তার চেয়ে দেখার মতো তার রিক্সা চালানোর কায়দাটা। রিক্সা আপনা-আপনি চলছে, ডানে-বাঁয়ে বাঁক নিচ্ছে না, সামনে গোত্তা খাচ্ছে না। সামিনা ব্যাপার গুলো লক্ষ করছে। আমি লক্ষ করছি, আসন্ন বিশ্বকাপ উপলক্ষে ঢাকার আকাশ কেমন লাল-নীল-সবুজ-হলুদ পতাকায় ছেয়ে গেছে। কেমন আনন্দ আনন্দ লাগে। ক্ষণে ক্ষণে নানান কল্পনার পুলক জেগে ওঠে। কিন্তু পুলক আমাকে ভাসিয়ে নেয় না-সেই ছেলেবেলায় যেমন ভাসাত।

ভাই, এবার বিশ্বকাপ কোন দেশ নেবে বলে আপনার মনে হয়?’ সামিনা টিভি রিপোর্টারের মতো প্রশ্ন করল।

রিক্সাঅলা টকশোর বিজ্ঞ উত্তরদাতার মতো বলল, ‘যারা পুরা টুর্নামেন্ট এ্যাটাকিং ফুটবল খেলব।’

সামিনা গম্ভীর হয়ে গেল। তারপর হাসতে হাসতে জিজ্ঞাসা করল, ‘ফাইনাল ম্যাচেও কী এটাকিং ফুটবল খেলতে হবে?’

‘হয়, ফাইনাল ম্যাচেও।’

সামিনা আবারও গম্ভীর হয়ে গেলো, কথা খুঁজছে। আসলে বিশ্বকাপ সম্পর্কে রিক্সাঅলার আগ্রহ সামিনার ভালো লাগেনি, ভালো লেগেছে ওর বিশ্লেষণাত্মক জ্ঞান, সামিনা বিজনেস স্টাডিজের স্টুডেন্ট। সামিনা প্রশ্ন পেয়েছে, ‘তা কেন? গোল খেয়ে বসলে তো আর শোধ দিতে পারবে না। ঘর সামলে খেলতে হবে না?’ রিক্সাঅলা একটু থেমে সামনের দিকে তাকিয়েই জবাব দিল, ‘ফুটবল ঘরে বইসা খ্যালে না, মাঠে নাইমা খ্যালে।’

সামিনা একটু থেমে, জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনার ফেভারিট টিম কি বিশ্বকাপ পাবে?’

‘না।’

‘না কেন?’

‘তাগো টিম-ওয়ার্ক ভালো না।’

‘তাহলে সাপোর্ট করছেন কেন?’

রিক্সাঅলা এ প্রশ্নের কোনো জবাব দিল না। টুংটাং করে বেল বাজিয়ে জোরে জোরে রিক্সা টানতে শুরু করল।

এবার ওরা প্রসঙ্গ পাল্টাল; টিমের প্রসঙ্গ ছেড়ে ভেন্যুর প্রসঙ্গ শুরু করল। গলির মোড়ে গড়ানে রিক্সা ছেড়ে দিয়ে এক পা ভাঁজ করে রিক্সাঅলা বলতে লাগল, ‘...ওই দ্যাশে কুনো বেকার নাই, ম্যালা কাম, কিছু না পারলেও ফাস্টফুডের একটা দোকান দিয়া রাজার হালে চলতে পারবেন। ভিসা নিয়া একবার যাইলেই হইছে, থাইকা যাওন যায়...।’

‘ভিসা পাইলে আপনি যাবেন?’ সামিনা হাসছে।

রিক্সাঅলা হাসছে না। ও গম্ভীর গলায় বলল, ‘দ্যাশ ছাইড়া কই যামু?’

তারপর কিছুক্ষণ নীরব থেকে রিক্সাঅলা ক্যাঁচক্যাঁচ করে প্যাডেল মারতে মারতে স্বগত-স্বরে বলতে লাগল, ‘...কই যামু? পৃথিবী ফুটবলের লাহান গোল। পুব দিক দিয়া হাঁটা ধরলে, একদিন দেখবেন যেইহান থিকা হাঁটন শুরু করছিলেন, সেইহানে পৌঁছাইয়া গ্যাছেন। পশ্চিম দিক দিয়া হাঁটন শুরু করলেও তা-ই হয়। উত্তর ও দক্ষিণের বেলায়ও তা-ই...।’ কথা শেষে একবার পিছন ফিরে তাকাল।

ওদের আলাপ শুনতে শুনতে, কোন জগতে যেন চলে গিয়েছিলাম, কখন যে আমাদের মহল্লায় ঢুকে পড়েছি, টের পাইনি। সামিনা এর মধ্যেই খবর নিয়ে ফেলেছে, ও আমাদের মহল্লারই রিক্সাঅলা। রোজ সকালে ওকে অফিসে নিয়ে যাবার জন্য মাসিক চুক্তির প্রস্তাবও দিয়ে ফেলেছে। রিক্সাঅলা রাজি হয়নি। বোধ হয় সামিনার ভাড়ায় ওর পোষায়নি। সামিনার ভাড়ায় অত সহজে কারোর পোষায় না। কিন্তু আমি জানি, ওই ভাড়াতেই রিক্সাঅলার সাথে ও চুক্তি করে ফেলবে। রিক্সাঅলাও ‘পারলে একটু বাড়ায়য়া দিয়েন’ বলে আনন্দ চিত্তে তা গ্রহণ করবে। সামিনার এত কথা বলবার কারণ বুঝতে পারলাম। সকাল বেলায় ও প্রায়ই অফিসের বাস ফেল করে। বাস মেইন রোডে থামে। মহল্লার রিক্সা-স্ট্যান্ড থেকে ১৫ মিনিটের রিক্সা-দূরত্ব। বেরুতে বেরুতে ওর রোজই দেরি হয়। প্রতিদিনই ও একটা-না-একটা কিছু বাসায় ফেলে রেখে ঘর থেকে বেরুবে, তারপর আবার তালা খুলে ঘরে ঢুকবে, রান্না ঘরে গিয়ে গ্যাসের চুলোর নব ধরে একবার পরখ করবে, নয়তো বেডরুমে ঢুকে এসির দিকে একবার নজর বুলাবে। প্রায় প্রতিদিনই ও বাস মিস করে-অফিসে লেট হয়। তবে ভালো রিক্সাঅলা পেলে সাত-আট মিনিট হাতে নিয়ে বেরলেও বাস ধরতে পারে। ও কাজের মানুষ চেনে। সিটের উপর উঠে বসার কায়দা দেখেই ও বুঝতে পারে রিক্সাঅলাটা কতটুকু কাজের।

‘আমাদের সাথে একদিন বিশ্বকাপের একটি খেলা দেখবেন। আপনার দাওয়াত।’ সামিনা রিক্সা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে দেবার সময় বলল। আমি এবার কিছু না বললে ভালো দেখায় না। শুকনো মুখে সামিনার কথাগুলোই বললাম, ‘আপনার দাওয়াত।’ জুনের গরমে রিক্সাঅলার মুখ ঘেমে জবজবে হয়ে গেছে। সিটে বসে উল্টো দিকে প্যাডেল ঘুরাচ্ছে। লুঙ্গি উঠে যাচ্ছে হাঁটুর উপরে। তালের আঁটির মতো শক্ত হাঁটুর মালা তার। ওর দুই কান-পাটার ভেতর দিয়ে দরদর করে ঘাম বেরিয়ে ট্যান-পড়া দুই চোয়াল ভাসিয়ে দিচ্ছে। মনে হলো আমার শুকনো আতিথেয়তা ওকে আহত করেছে। হঠাৎ হাত তুলে তর্জনী নিক্ষেপ করে ও আমাদের বাসার গেট দেখালো। আমি লজ্জা পেলাম, দুই কান গরম হয়ে উঠল। মনে হলো, ও চেঁচিয়ে উঠল, ‘তোরা যা!’ আমি চমকে উঠলাম, ওর ঘামে ভেজা সারা মুখে বৃষ্টি-ভেজা জল-ছপছপ মাঠ দেখতে পেলাম, সেই মফঃস্বল শহরের ফুটবল মাঠ। সামিনা গেটের ভেতর থেকে ডাকছে, ‘কই, আসো।’আমি বললাম ‘আসছি।’

|| সালমা তালুকদার ||

 

মাঝে মাঝে রং চা টা খেতে ভালোই লাগে। ট্রান্সপারেন্ট মগে চায়ের রং টা দারুণ লাগে দেখতে। আজ এলাচ,দারচিনি,লং সব দিয়েছি। সাথে একটু লেবুর রস।বাহ্! স্বাদটাও চমৎকার হয়েছে। ভেবেছিলাম গরম চা খেতে খেতে রাস্তার গাড়ি দেখতে ভালোই লাগবে। বারান্দায় বসে হারিয়েও গিয়েছিলাম রাস্তার ব্যস্ততা দেখতে দেখতে। 

চোখের সামনের সবকিছু ঝাপসা হয়ে উঠে। যখন তৃতীয় চোখটা প্রাণ পেল; তখনই চা এর স্বাদটা তেতো হয়ে গেলো। চোখের সামনে তখন হাস্যোজ্জ্বল দুটো মুখ স্পষ্ট হয়ে উঠলো। দু'জনই ভীষন হাসি খুশি।খুনশুটি করছে আর হাসতে হাসতে একজন আরেকজনের গায়ে গড়িয়ে পরছে। দৃশ্যটা ধানমন্ডির একটা রেস্টুরেন্টের।

অফিসের একটা কাজে আজ একটু ধানমন্ডি যেতে হয়েছিলো। দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য ঢুকে যেই না কোনার দিকের একটা টেবিলে বসতে যাব! অমনি রিনিঝিনি হাসির শব্দ লক্ষ্য করে তাকাতেই চোখে পরলো নুপূর আর রিয়াদ। চোখে পরার পর রিনিঝিনি হাসিটা ডাইনীর হাসির শব্দের মত মনে হলো। ভাবলাম উঠে যাই। তারপর ভাবলাম উঠবো কেন! আমার টাকায় আমি খেতে এসেছি।পেটে ক্ষিদে চোঁ চোঁ করছে। তাহলে কেন বেইমান দুটো মানুষের জন্য উঠে যাব! আমি একটু জোড়েই ওয়েটারকে ডাকলাম। পরিচিত কন্ঠ কানে যাওয়া মাত্র দু'জনের মাথা একসাথে ঘুরলো।

আমি অবশ্য তাকাইনি। চোখের কোন দিয়ে খেয়াল করলাম তাড়াহুড়ো করে উঠে যাচ্ছে দু'জনে। টেবিলে পরে রইলো ফ্রাইড রাইস,বিফ সিজলিং,চিকেন কারীর আধা খাওয়া অংশ। কোল ড্রিঙ্কস তো ছুঁয়েই দেখেনি। আহারে !মায়াই লেগেছিলো তখন। রিয়াদের টাকার তো সবসময়ই সমস্যা। গত পাঁচ বছরে ওর মুখে নাই নাই আর নাই ছাড়া কিছু কখনো শুনেছি বলে মনে পরে না। তার মধ্যে এত গুলো খাবার নষ্ট।

চা এর তেতো ভাবটা সরাতে আরো এক চামচ চিনি দিলাম। এখন হয়ে গেলো গরম শরবত। ধূর চা--ই খাবো না। বেসিনের পানির সাথে চা টা ভাসিয়ে দিলাম। কলিংবেল তার স্বরে বেজে উঠলো। দরজা খুলতেই তামিম হুরমুর করে ঘরে ঢুকলো। সোজা বেড রুমে ঢুকে হাতের মোবাইল,ল্যাপটপের ব্যাগ সব ছুঁড়ে ফেললো খাটে। তারপর তার চিরাচরিত স্বভাব বশত সটান হয়ে শুয়ে পরলো বিছানায়। আমি কিছুই বললাম না। কি আর বলবো! তামিমের এই অত্যাচার টুকু সহ্য না করলে যে বাঁচাটাই মুস্কিল হয়ে যেত। ওর মাথার কাছে বসে কপালে মুখে হাত বুলাতে বুলাতে বললাম,

 "একটু হাত মুখটা অন্তত ধুয়ে এসো।"

 যেন গরম কড়াইয়ের তেলে একটু পানির ছিটা পরলো। এমন করে গলায় ঝাঁঝ ঢেলে তামিমের উত্তর, "কেন?আমি কি বাসে চড়ে,ঘামে ভিজে তোমার বিছানায় এসে উঠেছি নীল?"

"না,তা তো বলিনি?"

"থাক তোমার আর বলতে হবে না। জানো কত জরুরী মিটিং ছিল। তাড়াহুড়ো করে শেষ করে তোমার কাছে ছুটে এসেছি।”

 "জানি গো জানি। কিন্তু আমার যে তোমাকে না ডেকে উপায় ছিল না। মনটা ভীষন রকম খারাপ।"

 তামিম চট করে উঠে বসলো। দুই হাতের তালুতে আমার মুখটি ধরে উঁচু করে গভীর কন্ঠে বললো,

 "কি হয়েছে আমার সোনা বউটার? তুমি জানো না তোমার মন খারাপ আমার ভালো লাগে না।"

এই হচ্ছে তামিম। রিয়াদের সাথে বিচ্ছেদের ঠিক এক বছর পর তামিমের সাথে পরিচয় একটা পিকনিকে। রিয়াদ যখন নূপুরের সাথে জমিয়ে প্রেম করছে আমি তখন রাতের পর রাত একা বিছানায় ছটফট করেছি আর চোখের জলে বালিশ ভিজিয়েছি। দিনগুলো খারাপ কাটতো না। অফিসের কলিকদের সাথে আড্ডা দিয়ে,কাজ করে সময় গুলো যেন উড়ে যেত।

সেদিন ছিলো পিকনিক। অফিস থেকে আয়োজন করেছিলো। গেস্ট আনার অনুমতি ছিলো। সেই সুবাদে সুব্রত ওর বন্ধু তামিমকে নিয়ে এসেছিল। সুব্রত আমার কলিগ। আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে সুব্রত লিনার সাথে ভেগেছিল। খুব ভাব হয়েছিল সুব্রত আর লিনার। ভালোবাসা আসলে ধর্মও মানে না। তামিম একটা প্রানোচ্ছল ছেলে। অল্পক্ষনের মধ্যেই খুব ভাব হয়ে গেলো ।ভাব থেকে টেলিফোন নাম্বার আদান প্রদান। দুঃখ শেয়ার। অবশেষে একসাথে থাকা। আমার আর তামিমের ছোট সংসার। বিয়ে ছাড়া টোনাটুনির সংসার। ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কেউ কাউকে বিস্তারিত কিছু বলার প্রয়োজন মনে করিনি কখনো। দু'জন দু'জনের সাথে কথা বলছি। একাকিত্ব দূর হচ্ছে; এটাই বা কম কিসে! তবে রিয়াদের সাথে ব্রেকআপের কথাটা হালকা স্বরে বলেছি একদিন। এতে তামিমের কোনো প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করলাম না। কিছু জানতেও চায়নি। আবার আমি যখন ওর সম্পর্কে কিছু জানতে চেয়েছিলাম। ও এরিয়ে গেছে। আমিও আর কথা বাড়াইনি।

রিয়াদের প্রতারণায় আমার পৃথিবী যখন ওলট পালট; তখন বিয়ে নামক সামাজিক বন্ধনে একটা ঘেন্না ধরে গিয়েছিল। তামিম সেখান থেকে আমাকে উঠিয়ে এনেছে। তাই তামিমই এখন আমার সব। মানুষ আসলে একটা অবলম্বন চায়। অবলম্বন ছাড়া মানুষ বড় অসহায়।

 তামিমের রোমশ বুকে হাত বুলাতে বুলাতে প্রশ্ন করি, "ভালোবাসো?"

তামিম তার সর্বশক্তি দিয়ে জড়িয়ে ধরে বলে,"বাসি গো বাসি।"

 "কতটা বাসো?"

 তামিমের মৃদু হাসি, "এই এক প্রশ্ন ছাড়া তোমার কোনো প্রশ্ন নেই?"

 আমার কপট রাগ, "না নেই।"

 তামিম এবার ওর পুরো শরীরের ভার আমার উপর দিয়ে আমার ঠোঁট দুটো ওর মুখে পুরে নিল।যেন কমলা লেবু চুষছে। এমন করে চুষতে থাকলো। তারপর মুহূর্তে আমার শরীরের বাহ্যিক আভরণ সব অভ্যস্থ হাতে খুলে ফেললো। আমি বাঁধা দিলাম না। নিজের মনকে বোঝালাম।

 "আমি কি এজন্যই ডাকিনি তামিমকে?"

ছোট রুমের চার দেয়ালের মাঝে নর-নারীর আদিম সুখে ভাসতে ভাসতে ভাবলাম,"এটাই হয়তো জীবন। কিসের ভালোবাসা? ভালোবাসা আবার আছে নাকি? ভালোবেসে যে ঘর বেঁধেছিলাম সে ঘর যখন টিকলো না,। তবে এ জীবনে, আর; ও মুখো হওয়ার দরকার কি?"

আমিও তামিমকে ভালোবাসার রঙে ভেজাতে ভেজাতে; মনে মনে বললাম, তামিম তুমি স্বীকার না করলে কি হবে! আমি তো জানি, তুমি যেমন আমার; তেমনি অন্য কারোও। বিশ্বাস করো তামিম, তাতে আমার বিন্দুমাত্র অসুবিধা নেই। আমার ডাকে সাড়া দিয়ে এসে ভালোবাসি বলে, যেটুকু দাও; সেটুকুই আমি চাই। এর বেশি তোমাকে আমার প্রয়োজন নেই। সম্পর্কের নামে অধিকার, প্রয়োজন, দায়িত্ববোধ আর ভালোবাসা গুলিয়ে ফেলে; রিয়াদের মত তোমাকে হাড়াতে চাই না। জীবন থেকে শিখেছি, ভালোবাসাটাই আমাদের জীবনে বড় বেশি প্রয়োজন!" বেইমানের মতো, বড্ড অসময়ে চোখের কোনটা ভিজে উঠলো।

 

Better World Books Good Reading

|| তারিক সামিন ||

 

এই গল্পের চরিত্র ও ঘটনা প্রবাহ কাল্পনিক। নির্দিষ্ট কোন দলের পক্ষে বা বিপক্ষে আমার কোন বক্তব্য নেই। কারণ বাংলাদেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের হাতেই লেগে রয়েছে সাধারণ মানুষের রক্ত। এটি এদেশের নিপীড়িত ও লাঞ্ছিত মানুষের সকরুণ আর্তনাদের একটি গল্প। - লেখক।

 

বার্ন ইউনিটে স্বামীর লাশের পাশে বসে আছে মিতু। লাশের সারা শরীর এখনো ব্যান্ডেজ মোড়ানো। মুখটা রক্তশূন্য, ফ্যাকাসে।  গত একুশটা দিন তীব্র কষ্টে, অমানুষিক যন্ত্রণা পোহাতে পোহাতে আজ ভোরে মৃত্যু হয়েছে তার স্বামী শাহরিয়ার হকের।

মিতু বসে আছে। নিঃশব্দে কেঁদে চলছে সে। তার গর্ভবতী ভারী শরীর কেঁপে উঠছে একটু পর পর।  একটা ছোট ডায়েরী, তাতে জীবনের শেষ কথাগুলো অলৈাকিক ভাবে লিখে গিয়েছে শাহরিয়ার। মিতু পড়ে চলছে, সমস্ত শোক ভুলে, যেন চিঠির মধ্যে হারিয়ে গেছে সে। শাহরিয়ার লিখেছে...

 

১০ই ডিসেম্বর ২০১৩ ইং

 

প্রিয় মিতু,

আমার মনে হয় সময় ঘনিয়ে আসছে। আগামীকাল হয়তো আমাদের আর দেখা হবেনা। মৃত্যুকে এত কাছাকাছি  দেখবো কখনো ভাবিনি। গত বিশটা দিন হাসপাতালে পুড়ে যাওয়া মানুষগুলোর তীব্র আর্তনাদ, ফিনাইল আর ডেটলের গন্ধ, স্বাদহ্নীন তরল খাবার, ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, চিকিৎসায় প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা খরচের দুঃচিন্তা, এসবের মধ্যেও; এখানে এসে বুঝলাম মানুষ মানুষের কত আপন। একজন অসুস্থ, রোগাক্রান্ত আর অসহায় মানুষের দুঃখ অপর একজন অসহায় মানুষই ভাল বোঝে। তাই মনেহয় মানুষে মানুষে ভাতৃত্ববোধ হাসপাতালেই বেশী।

এখানে আমাদের ওয়ার্ডের নার্স রিক্তা আপা। ভারী মিষ্টি তার ব্যবহার। অত্যন্ত নিবেদিত ভাবে প্রত্যেক রোগীর সেবা করে সে ।  তার শ্যামবর্ণ, অতি সাধারণ মুখমণ্ডল, দেখতেও খুব সাদাসিধে। তবুও এই মানুষটির মধ্যে আমি একজন দেবীর দেখা পেয়েছি। নার্সরা আমাদের সমাজের সবচাইতে মহান পেশার মানুষ। রিক্তা আপা বিবাহিত, ওনার চার বছরের একটি ছেলে আছে। স্বামী-সন্তান ছেড়ে মাঝে-মাঝেই নাইট ডিউটি করতে হয় ওনাকে।

গত পরশু আমার প্রচণ্ড জ্বর ছিল। আমার পাশের বেডের দেলোয়ার ভাইয়ের ড্রেসিং পড়ানো হচ্ছিল। তার কাতরানো আর গোঙ্গানির শব্দে দর্শনার্থী দুইজন সুস্থ-স্বাস্থ্যবান যুবক জ্ঞান হারিয়ে ধপাস করে পড়ে গেল। এমনিতে ডাক্তাররা কাউকে বার্ন ইউনিটে ঢুকতে দেয়না। এখন লোকে-লোকারণ্য। দেলোয়ার ভাইয়েরও আমার মত শরীরের ৪০% এর বেশী পুড়ে গেছে। প্রথম যখন এসেছিল, সারা শরীর কালো পোড়া; ফোস্কার ভেতর পানি জমতে শুরু করেছে। ওনার শরীরে স্যালাইন দেবার জন্য রগ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলোনা।  ডাক্তার আর নার্সরা অনেক ধৈর্য ধরে ঔষধ দিল, মলম দিল, তারপর ব্যান্ডেজ করলো। আমার ঘা-গুলো শুকিয়ে আসছে, কোথাও কোথাও হলুদ পদার্থ জমেছে, গভীর ক্ষত গুলো থেকে রক্ত বের হয় মাঝে মাঝে।

হায়! আমরাতো কত কিছুই চোখের সামনে পুড়তে দেখি। কারো ঘর পুড়ে, কারো কপাল পুড়ে কিন্তু যাত্রীবাহী বাসের ভেতর দগ্ধ মানুষগুলোর পোড়া শরীর যেন আমাদের কারো দেখতে না হয়!

দেখ-দেখি কি বলতে কি বলছি। কোথায় সিস্টার রিক্তা আপার কথা বলাবো, তা-না-বলে বারবার তোমার মন খারাপ করে দিচ্ছি। আমার হাতদুটো অলৈাকিকভাবে খুব সামান্য পুড়েছে, তাই সারাদিন এসব হাবিজাবি লিখি। আগুনের প্রচণ্ড তাপ নিঃশ্বাসের সাথে গ্রহণ করার কারণে আমার শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, কথা বলাতে কষ্ট হয়, তবুও বলি। যতক্ষন ব্যথা কম থাকে, মাঝে মাঝে আলাপ জুড়ে দেই সিস্টার রিক্তার সাথে। সেদিন আমাকে তোমার কথা জিজ্ঞাসা করলো। আমি বললাম আর কয়েক সপ্তাহ পরই আমাদের সন্তান ভূমিষ্ঠ হবে। শুনে উনি খুব খুশি হল। আবার একটু  পর মনে হল, চোখের কোনে সামান্য পানি। সিস্টারকে আমার জীবনের স্বপ্নের কথা, তোমার কথা, আমার ব্যবসা আর জীবন সংগ্রামের অভিজ্ঞতার কথা বলি। শুনে সিস্টার  দুঃখ করে বলে, ইস্ আপনার মত এত বুদ্ধিমান, এত ভাল আর সৎ মানুষের জীবনে এমন কেন হলো!

চলন্ত বাসে যারা পেট্রোল বোমা মারে, ওরাতো মানুষকে মারে না; ওরা মারে ঘুণে ধরা, পচে যাওয়া সমাজ ব্যবস্থার উপর। যে রাষ্ট্র, সমাজ ব্যবস্থা ওদের অমানুষ বানিয়েছে, হয়তো তাদের লক্ষ করে। কপাল দোষে পুড়ে মরে কর্মঠ মানুষ। সন্তানের চিকিৎসা করতে আসা মা আর তার দুই বছরের অবুঝ শিশু, এমন আরো কত নিরীহ মানুষ।

আমি প্রতিনিয়ত আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানাই, দয়াময় আমাকে আবার সুস্থ-সবল করে দাও।  আমি যেন আমার স্ত্রী-সন্তানের সাথে আর ক’টা বছর সুখে জীবন-যাপন করতে পারি। আমার অনাগত সন্তান, যে এখনো তোমার গর্ভে, তার জন্যও খুব কষ্ট হয়। হায়! এই দেশে তাকেও জন্মাতে হবে। অনাচার আর অবিচারের স্বর্গরাজ্যে এই দেশে,  পদে পদে দুঃখ-কষ্টে কাটবে তার জীবন্।

এই যা! ফের দুঃখের কথা বলছি। শোন, তুমি আগামীকাল যখন হাসপাতালে আসবে, সুন্দর করে সেজে আসবে।  আমার মনটা ভীষণ খুশি হয় তোমাকে দেখলে। আমার বাবুটা কেমন আছে? দুষ্টুমি করে? এখনো কি হঠাৎ পেটের ভেতর থেকে লাথি মারে? দেখে নিও অনেক দুষ্ট হবে। তোমার বমিটা কমেছে?  মা কি এখনো অনেক কান্না-কাটি করে?

শিমুলকে বলো, ও যেন মাঝে মাঝে ব্যবসাটার দেখাশোনা করে। বাজারে অনেক টাকা বাকি পড়ে আছে। টাকাগুলো তুলতে হবে। এদিকে আমার পেছনে-তো লক্ষ-লক্ষ টাকা খরচ হচ্ছে। একবারে মরে গেলেও বেঁচে যেতাম।  এই আট-দশ লক্ষ টাকা দিয়ে আমাদের সন্তানটির ভবিষ্যৎ খরচ চলতো। হাসপাতালের সবাই রিক্তা আপার মত নিবেদিতপ্রাণ মানুষ নয়। এখানে সবাই পরিশ্রম করে, তবে টাকাটাই মুখ্য অনেকের কাছে।  মানুষের কষ্ট আর যন্ত্রণা থেকে লাভবান হবার একটা লালসা দেখি এদের মধ্যে। ঠিক আমাদের রাজনীতিবিদের মতো।  

ইদানীং তোমার কথা খুব মনে পড়ে। তোমার সুন্দর মুখ, স্নিগ্ধ হাসি, সিল্কের মত মসৃণ চুল, চোখের সামনে ভেসে উঠে। শোনো তুমি ভাল থেক, নিজের প্রতি যত্ন নিও। বেশি করে খাওয়া-দাওয়া কর। আমাদের সন্তানটা যেন সুস্থ-সবল হয়। এই নরক রাজ্যে, যেখানে জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি, সীমাহ্নীন অসৎ প্রতিযোগিতা। জেনে রেখো, সেখানে দুর্বলের কোন স্থান নেই।  এদেশে মানুষের দুঃসময়ে সবাই বাড়তি কিছু আয়ের চিন্তা করে।

বাবা যেভাবে আমার সেবা করছে, তাতে আমার শৈশব স্মৃতি মনে পড়ছে। তুমিতো জানো, বাবা বরাবরই রাগী মানুষ। কিন্তু ছোটবেলায় আমাকে খুব আদর করতো। বাজারে গেলে আমি সবচেয়ে বড় মাছটা পছন্দ করতাম। মাঝে মাঝে টাকা থাকতো না। তবুও বাবা আমার জন্য সবচেয়ে বড় মাছটা কিনতো। শুধু মাছ নিয়ে বাসায় ফিরলে মা খুব রাগারাগি করতো। বলতো, চাল-ডাল, তরু-তরকারী কোথায়? শুধু বড় মাছ খেয়েই কি পেট ভরবে? কিন্তু বাবা  আমার আনন্দটাকেই বড় মনে করতো। আমি বড়ই স্মৃতি-ভোলা মানুষ। বাবার ভাল গুন গুলো মনে না রেখে; শুধু রাগ গুলোই মনে রাখতাম।

আজ রিক্তা আপার মেজাজ একটু খিটখিটে। বাসায় ছেলেটার জ্বর। কিছু দিন হলো ওনার স্বামীর চাকুরী চলে গেছে। বাসায় বসে থাকে, তবুও নাকি ছেলেটার যত্ন নেয় না। আয়াকে বকা দিল, আমার প্রস্রাবের থলেটা পাল্টে দেয়নি বলে। তারপর আমাকে ঔষধ খাইয়ে দিল। সাক্ষাত যেন কোন মায়াময়ী দেবী। একটু আগেও ডাক্তার এসেছিল। বললো, আমার পায়ে গ্যাং-গ্রিন হচ্ছে, সেই জন্যই প্রচণ্ড  দুর্গন্ধ।

এই ইন্টারনেটের যুগে কেউ কি আর চিঠি লেখে বলো?  তবুও আমার লিখতে ভীষণ ভাল-লাগে। আমি মরে গেলে তুমি পড়ো, তারপর রেখে দিও আমার অনাগত সন্তানের জন্য। তাকে বলো, আমাকে নির্মম পাশবিক রাজনীতির বলি হতে হয়েছে। এমন দুঃসময়ে তাকে পৃথিবীতে নিয়ে আসার জন্য; বাবা হিসাবে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।

আমার সকল ভুলের জন্য আমি তোমার মাধ্যমে সকলের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। দোয়াকরো আমার মত হতভাগ্য, এ পৃথিবীতে আর যেন জন্ম না নেয়। তুমিও  আমার ভুল-ক্রটি গুলো ভুলে যেও।

 

ইতি,

তোমার স্বামী

শাহরিয়ার।  

-কাদের পলাশ।

 

বিষণ্ণ মন। ভাবছি কিছু সময়ের জন্যে নগর জীবন ছেড়ে শীতলতায় গা ভাসিয়ে দিই। ছুটে যাই সবুজ অরণ্যে, কাঁদা মাটি জড়িয়ে রাখা ঘাসের বিছানায়। আম কিংবা কাঁঠাল বাগানের ভিড়ে। যেখানে উচ্ছল শৈশব কাটিয়েছি মহানন্দে। মোটরসাইকেলে চড়ে খুব দ্রুত সময়ে মায়ের কাছে পৌঁছে যাই। বাড়িতে মা নেই। মাকে খুঁজছি। তবে ডাক দিচ্ছি না। চমকে দেবো বলে। বাড়ির আঙিনা মাড়িয়ে ঘরে ঢুকি। সিটকানি খুলে ঘরে ঢুকে কাঁধের ব্যাগ রাখতে রাখতে, মাকে নিচু গলায় ডাকলাম। মায়ের কোনো সাড়া শব্দ নেই। বাড়িতে খাঁ খাঁ নীরবতা। গ্রামের সেই কোলাহল এখন শহরে পাড়ি জমিয়েছে। হঠাৎ একটা পাখি ডেকে উঠলো। চেনা সুর। না দেখে নাম বলা মুশকিল। বিকেলের বুকে এতো মধুর সুরে গান গায় কোন পাখি? যে গানের সুরে হারিয়ে যাই দেড় যুগের অতীতে। কিশোর জীবনে।

আমি দ্রুত ছুটে আসি। ঘরের আগ দরজা ডিঙিয়ে উঠোনে নজর যেতেই আমি চমকে উঠি। স্তম্ভিত হই। কি করবো কিংবা কি বলবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। পনের বছর আগের পছন্দের পাখি ছানা নিয়ে আমার আঙিনা দাঁড়িয়ে। বুকের মাঝ বরাবর হাত দিয়ে দেখি; কোনো সাড়া শব্দ নেই। ভয় নেই, ধড়পড় কিংবা কোনো কম্পন নেই।

আমি ফিরে দেখি ফেলে আসা স্মৃতির ক্যানভাসে। যেখানে মান-অভিমান আরো কত কী ছুটোছুটি করতো। দমের ঘনত্ব, ধড়পড়, শরীরের কাঁপন বেড়ে যেতো তার উপস্থিতিতে। কত দিন, কত রাত ওকে ভেবে পার করেছি। রাস্তার মোড়ে অপেক্ষায় ছিলাম দিনের পর দিন। যার চলন, আমায় আন্দোলিত করে। যার সরল মুখ, আমায় পথ বাতলে দেয়। আমি হাঁটি স্বপ্নের রাজ্যে। পিছু পিছু ঘুরি। যার চোখে, খুঁজে পাই মর্ত্যের সীমাহীন মুগ্ধতা। যার পায়ে ভর করে হাঁটি হাজার বছরের কাঁচা মাটির পথ। যার হাত ছুঁয়ে দেখি ফুলেদের শরীর। নাকে নিই মহুয়া ঘ্রাণ।

আমায় দেখে তার অবুঝ হয়ে যাওয়া অভিনয় ছিলো মাত্র। ওর ভণিতা আমি বুঝতাম। আমার অপেক্ষা; তথা রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকার কষ্ট তাকে ভালবাসতে প্রেরণা দিতো বলে; আজো বোধকরি পুলকিত হয় সে। আমার অব্যক্ত করুণ আর্তি দেখে আমোদিত হতো। ঠোঁটে মিহি কাঁপন উঠতো। বুঝতো না; কিংবা বুঝেও না বুঝার ভান করতো। আমি উপভোগ করতাম মধুর কষ্ট। আমার দীর্ঘশ্বাসে উড়তো তোমার, চুল, ওড়না এমনকি মন! বুকের বাম পাশে চিনচিন ব্যথা হতো। বুঝাতে পারতাম না। আজও পারি না।

বেশ কিছু সময় গত হওয়ার পর, তার মুখে কেমন আছি? জানতে চাওয়ার জবাব দিতে আমি ভুলে যাই। যদিও আমার চোখে মুখের মুগ্ধতার আভা আড়াল করতে পারিনি। ভালো বা মন্দ; কোনো উত্তর না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন ছুড়ি কেমন আছিস?

-ভালো। তুই কেমন?

ওর কথাগুলোই এমন। অল্প কথায় হাজার কথার জবাব। মনে মনে ভাবি, তুই বলতে থাক। এ মুহূর্তে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে মনোযোগী শ্রোতা।

-কিরে কিছু বলবি না?

আমি হুশ ফিরে পাই। ভালো না থাকার উপায় কী বল? এমন প্রশ্নের জবাবে; মানুষ জেনে শুনে কিংবা মনের অগোচরে মিথ্যে উত্তর দেয়। কারণ মানুষের ভালো থাকা হয়ে উঠে না। ভালো না থাকার কোটি কারণের মধ্যে একটা না একটা কারণ  থাকেই। যাহোকে, আমিতো এ প্রিয় মুখের কথা শুনতেই যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী অপেক্ষার প্রহর গুনেছি। পৃথিবীর সব মানুষ অপেক্ষায় থাকে, বুঝে না বুঝে; দুভাবেই। দুর্বোধ্য বা অস্পষ্ট সে অপেক্ষা। পৃথিবীর প্রতিটি প্রেমিক পুরুষ অপেক্ষায় থাকে, হৃদয় গহীনে প্রথম বসত করা নারীটির মুখোমুখি হবার। কারো হয়ে উঠে, কারো নয়। যে ক্ষেত্রে আমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন।

বারবার অজানায় আমার হারিয়ে যাওয়া দেখে, ও বলে উঠে,

-ও আমার মেয়ে। নাম সৌমিতা। হঠাৎ করে ইচ্ছে হলো; তাই রিক্সা থেকে নেমে তোদের বাড়িতে ঢুকে পড়লাম।

-কিউট! ভারি মিষ্টি হয়েছে তোর মেয়ে। মনের অজান্তেই ছোট মেয়েটির মুখে ফের নাম জানতে চাই।

 মেয়েটি নাম না বললেও তার মা বলে সৌমিতা। আমি শুনেছি কি শুনিনি; বুঝতে পারিনি।

এর ফাঁকেই মা ও বাবা এসে হাজির বাড়ির আঙিনায়। দুইজনেই জানতে চাইলেন ওরা কারা? আমি মেয়েটির মাকে দেখিয়ে বললাম, আমরা একসাথে পড়েছি। এরচেয়ে খুব ভালো পরিচয় দেয়ার সুযোগ হতে পারতো। কিংবা পরিচয় না দিলেও চলতো। কিন্তু সে পরিস্থিতি তৈরি করতে দেয়নি বাস্তবতা। সময় এমনই। সময় মানুষের পরিচয় ভুলিয়ে দেয়। পরিচয় করিয়ে দেয়। এ সময়ই মানুষকে মনে রাখতে দেয় না। আবার সময়ই মানুষকে মনে রাখে। তাইতো আমরা এ সময়ের সাথেই থাকি, চলি। সময়ের কাছেই হার মানি।

মা বললেন, পোলা আমার পাইক্কা গেছে। বড় দার্শনিক হইয়া গ্যাছে মনে অইতেছে। কতা কম কও। ওদের ঘরে নিয়ে বসতে দাও। বাবা বললেন, এমএ পাস কইরা ভদ্রতা ভুইলা গ্যাছো বেটা? যাও; মা তোমরা ঘরে গিয়ে বসো। তোমার খালাম্মা নাস্তা দিচ্ছে।

-না! না! খালাম্মা। রাস্তায় রিক্সা রেখে এসেছি। মা ঘর থেকে খুব দ্রুত দু’টা কমলা এনে মেয়ের হাতে গুজে দেয়। মেয়েটি নিতে চায় না। মা-মেয়েদুজন, বিদায় নিয়ে রিক্সার দিকে এগোয় । সাথে আমিও। আমি কেন হাঁটছি জানি না। কোনো সৌজন্যতার প্রয়োজন আছে কী না! তাও জানি না। আমার পা এগোই না।  মনে হয়, পেছন থেকে কেউ একজন আমার পায়ের কদম বাড়িয়ে দেয়।

ওরা আঙিনা পার হয়। সাথে আমিও। আমি কী হাঁটছি, না ভাসছি? বুঝতে পারছি না। রিক্সায় উঠে বসার পর একটা মিহি হাসি ঠোঁটে লেপ্টে ছিলো ওর মুখে। এ হাসি খুব চেনা-পরিচিত। খুব ভালোলাগার। এতদিনে কত কিছুই ভুলে গেছি! ধূলিময় স্মৃতির ডায়েরিটা সোনালী আলো ছড়িয়ে দিলো এক নিমিষেই। ওই আলো আমায় স্তব্ধ করে দেয়। অন্ধ করে দেয়, ভুলিয়ে দেয় আমার রহস্যময় বর্তমান।

বুকের ভেতর অন্যরকম অনুভূতি। এ মুখ আমায় প্রশস্তি দেয়। একসময় খুব ভালবাসতাম। এখন বাসি না। প্রয়োজন মনে করি না। তবে ওর কাছে আমি চির-ঋণী। ওকে দেখেই স্বপ্ন-বাজ হতে শিখেছি। বড় হতে শিখেছি। অপেক্ষা করতে শিখেছি। নীরবে কিভাবে ভালবাসতে হয়, তার কৌশল ওর কাছেই শেখা। এটি অতি গোপন রহস্য। পৃথিবীর আর কেউ জানবে না। জানানো হবেও না। এ প্রাপ্তি, আমি আমার আত্মার কাছে গোপন রাখতে পারিনি।

রিক্সায় উঠতেই চালক প্যাডেলে চাপ দেয়। আমি পেছনে পড়ে যাই। ভালো থাকিস, বলে আমিও উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করি। পেছন থেকে ও বলছিলো, আমি ফেসবুক ব্যবহার করি না, তবে ইমো চলাই।

আমি অবচেতনে বললাম, আচ্ছা ঠিক আছে। রিক্সার গতি বাড়তে থাকে। রিক্সা আমার পৈত্রিক বাড়ীর সীমানা পার হয়। আমি বাড়ি ফিরে আসি। বাড়িতে ভালো লাগছিলো না। উঠোনে বিষণ্ণতা খেলা করছে। কিছুক্ষণ পর আনমনে রাস্তায় ফিরে আসি। একটু আগে যেখান থেকে রিক্সাটি ছেড়ে গিয়েছিলো, ঠিক সেখানে হুক উঠানো অবিকল আরেকটি রিক্সাটি দাঁড়িয়ে আছে। কাছে ভিড়তেই আমি আবারও চমকে উঠি। স্তম্ভিত হই!

 

 

|| তারিক সামিন ||

 

যে শাড়ীটা পড়ে এতক্ষন রান্না-বান্না করছিলেন, সেটা পরেই তাড়াহুড়া করে ছোট বোনের বাসার দিকে ছুটলেন নিলুফার পারভীন।

নিলুফার পারভীনের বয়স ৪৮ বৎসর। এক ছেলে, এক মেয়ে আর স্বামী। এই চারজনের সংসার। তবুও অভাব অনটন লেগেই আছে। স্বামী সগীর আহম্মদ। চাকুরী থেকে অবসর গ্রহন করে; মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং এর প্রতারনায় এখন প্রায় সর্বশান্ত।

এ যুগে অমন সরল মানুষের পক্ষে টিকে থাকা দায়। সরকারী চাকুরী জীবনে অসৎ আয়-উপার্জন করেননি। কখনো কারো ক্ষতি করেছেন এমনও শোনা যায়নি।

 

নিলুফার পারভীন এর মেয়ে শুভ্রা, তার প্রথম সন্তান। এবার এসএস.সি পরীক্ষা দেবে। খুব ভাল ছাত্রী। একা একা পড়াশোনা করে। তবুও তার রেজাল্ট ভাল। খুব লাজুক আর প্রচন্ড হ্নীন্যমনতায় ভুগে মেয়েটি।

এক ছেলে শুভ্র। ক্লাস সিক্সে পড়ে। দুরন্ত-ডানপিটে স্বভাবের, বাবা-মা কারো কথা শুনতে চায় না। সারাদিন বাইরে বাইরে খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকে।

নিলুফার পারভীনরা চার বোন, এক ভাই। তার ছোট বোন ইয়াসমিনের এর বাসা পাশের লাইনে। সেখানেই ছুটছেন তিনি।

এই মহল্লার বাড়ী গুলো সব আড়াই কাঠা জমির উপর তৈরী। দশ বছর আগে প্রাইভেট হাউজিং কোম্পানীর কাছ থেকে একটা প্লট কিনে টিনশেড বাড়ী করে তার স্বামী। বছর দুই পর তার ছোটবোন ইয়াসমীন একদিন খুব করে ধরলো।

- আপা তোদের বাসার সাথে একটা প্লট কিনে দে।

- সে কিরে, এখনতো দাম অনেক বাড়তি! বিস্ময় প্রকাশ করলো নিলুফার।

- ‘তো!’। ঠোট উল্টে বললো ইয়াসমিন।

- এত দাম দিয়ে মোজ্জামেল বাড়ী কিনবে?

- কিনবে। না কিনতে পারলে যে ব্যাটা কিনতে পারবে তার সাথে গিয়ে ঘর করবো।

- ছিঃ!

- এমন একটা বিয়ে দিয়েছ। বলেই কান্না শুরু করলো ইয়াসমিন।

 

সেই সময় অনেক খোজাখুজি করে জানা গেল, ঠিক পাশের লাইনে একটা প্লট বিক্রি হবে। দাম বিশ লক্ষ টাকা। দালালেল খরচ, নামজারী এসব মিলিয়ে আরো ত্রিশ- পয়ত্রিশ হাজারের মত লাগবে।

বিশ লাখ টাকা দুলা ভাইয়ের হাতে দিয়ে, ইয়াসমিন বললো,

- দুলা ভাই, আর কোন টাকা দিতে পারবো না। আপনি দামা-দামি করে এক-দুই লাখ টাকা কমান।

- আচ্ছা, চেষ্টা করে দেখি। তুমি কোন চিন্তা করো না। এই টাকায় হয়ে যাবে।

বাকী পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা নিজের পকেট থেকে দিয়েছিলেন তার স্বামী, নিলুফার কখনো ছোট বোনকে বলেনি সে কথা। জায়গাটা কেনার পর পরই ইয়াসমিনের স্বামী মোজাম্মেল গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীতে সাপ্লাই এর ব্যবসাটা বন্ধ করে, নিজেই একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী চালু করে। এখন ওদের অনেক অর্থ-সম্পদ। বাড়ীটা সাত তলা করেছে পাঁচ বছর হলো। সাভারে নিজস্ব মার্কেট আছে, গ্রামে অনেক জমি আছে। আরো কত কি! বোনের সুখে অনেক ভাল লাগে নিলুফার পারভীনের।

 

ইয়াসমিনদের গেটে তালা মারা, কলিং বেল চাপতে দারোয়ান গেট খুলে দিল। ইয়াসমিনের দুই ছেলে আরিফ আর মারুফ। ক্রিকেট খেলছিল। বড় খালাকে দেখে ইদানিং আর খুশি হয়ে উঠে না আগের মত।

তিন তলার দরজা খোলাই ছিল। ভীতরে ঢুকলো নিলুফার পারভীন । ড্রইং রুমে বসে পাঁচ তলার ভাড়াটিয়া মহিলার সাথে গল্প করছিল ইয়াসমীন।

- আসসালামু-আলাইকুম, কেমন আছেন আপা? জিজ্ঞাসা করলো ভাড়াটিয়া অল্প বয়সী মহিলাটি।

- ওয়ালাইকুম সালাম, ভাল।

- তোমার কি খবর ?

- এই তো ভাল।

- শবনম আপা পরে কথা বললো। ঘাড় নেড়ে বললো ইয়াসমিন।

- জী আপা আসি। বলে চলে গেল শবনম।

সুন্দর একটা থ্রি-পিছ পরে আছে ইয়াসমিন। দিন দিন ওর স্বাস্থ্যটা ভারী হচ্ছে। বাসায় তেমন কোন কাজ নাই। সব কাজ বুয়ারাই করে। ঘুম, শপিং আর টেলিভিশন নিয়ে কাটে ওর সময়। নিলুফার এর থেকে দশ বছরের ছোট ইয়াসমিন। লম্বা, শ্যামলা আর ভারী শরীর। গোল মুখ, ছোট নাক, গলায় উপর, চিবুকের নিচে মাংস ঝুলে আছে অতিরিক্ত মেদ বহুল স্বাস্থ্যের কারনে।

 ইয়াসমিন হেসে বললো, ‘আপা আসছো ভাল হইছে।’

- ক্যানোরে?

- বসো, তোমারে একটা জিনিস দেখাই। লাল গহনার বাক্সটা খুলে চকচকে সোনার হারটা দেখালো বোনকে।

- দ্যাখো আপা, নতুন বানালাম।

- বাহ্‌ বেশ সুন্দরতো। মিষ্টি করে হাসলেন নিলুফার।

- পুরো পাঁচ ভরি। আমিন জুয়েলার্স থেকে বানানো।

- দারুন! ভাল মানাবে তোকে।

- হুম! খুশিতে চকচক করে উঠলো ইয়াসমিনের চোখ।

- শুভ্রা এবার টেষ্ট পরীক্ষায় খুব ভাল রেজাল্ট করেছে। নিচু স্বরে বললো নিলুফার।

- হ্যাঁ শুনছি তো। খানিকটা বিরক্ত গলায় বললো ইয়াসমিন। তার চোখ এখনো গহনার দিকে।

- স্কুল থেকে বলছে। আগামী ছয় মাস স্পেশাল কোচিং করাবে। তাহলে নাকি ‘এ প্লাস’ পাবে।

- ভালতো।

- পাঁচ হাজার টাকা লাগবে। ধার দিতে পারবি। তোর দুলা ভাই এক মাস পরে দিয়ে দিবে।

 দপ করে ইয়াসমিনের মুখের চকচকে ভাব মুছে কালো হয়ে গেল ।

- আপা, আমিতো দেড় লাখ টাকা দিয়ে হার বানালাম। আরিফ-মারুফ ইংলিশ মিডিয়ামে পরে, ওদের স্কুলের বেতন মাসে চল্লিশ হাজার টাকা। বলে একটু দম নিল ইয়াসমিন।  ‘দারোয়ান-বুয়া-ড্রাইভারদের বেতন দিলাম আজকে। এখনতো বিষ খাবার টাকাও নাই। যেন অবাক হয়েছে এমন ভাবে বললো ইয়াসমিন।’

অনেক কষ্টে নিজেকে সামলালেন নিলুফার। শাড়ীর আঁচলে মুখ মুছলেন।

- ঠিক আছে। অসুবিধা নাই। তোর দুলাভাই থেকে চেয়ে নেব। নিস্পলক চেয়ে রইলেন নিজের বোনের দিকে।

- ও, ঠিক আছে।

- আচ্ছা আসিরে।

দরজা দিয়ে মাথা নিচু করে বিষন্ন মনে বোনের বাসা থেকে বেরিয়ে এলেন নিলুফার।

তার এত ধনী বোন থাকতে!(?) পাশের বাসার ভাবীর কাছ থেকে টাকাটা ধার নেবার সময়, লজ্জায় মরে যাচ্ছিন নিলুফার পারভীন ।

 

 

লেখা পাঠাবার নিয়ম

মৌলিক লেখা হতে হবে।

নির্ভুল বানান ও ইউনিকোড বাংলায় টাইপকৃত হতে হবে।

অনুবাদ এর ক্ষেত্রে মুল লেখকের নাম ও সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি দিতে হবে।

আরো দিতে পারেন

লেখকের ছবি।

সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি।

বিষয় বস্তুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অঙ্কন চিত্র বা ছবি। 

সম্পাদক | Editor

তারিক সামিন

Tareq Samin

This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

 

লেখা পাঠাবার জন্য

ইমেইল:

This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

 

We use cookies to improve our website. Cookies used for the essential operation of this site have already been set. For more information visit our Cookie policy. I accept cookies from this site. Agree